শনিবার ২৯ নভেম্বর ২০২৫ - ১২:২৯
নবী (সা.)-এর ওফাতের পর আহলুল বাইত (আ.) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইসলামি সমাজ জাহেলিয়াতের দিকে ফিরে গেছে

ইরানের রাজধানী তেহরানে হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর শাহাদতবার্ষিকীর শোকানুষ্ঠানে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আখওয়ান বলেন, নবী (সা.)-এর ওফাতের পর সাকিফার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নেতৃত্বের বিচ্যুতি ইসলামি সমাজকে আধ্যাত্মিক পথ থেকে সরিয়ে জাহেলিয়াতের দিকে ধাবিত করে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আখওয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, আহলুল বাইত (আ.) থেকে বিচ্ছিন্নতা দীর্ঘমেয়াদে ধর্মীয় মূল্যবোধের গভীর অবক্ষয় সৃষ্টি করেছে।

“নবী (সা.)-এর গড়ে তোলা সমাজ ছিল গভীরভাবে আধ্যাত্মিক”
ইরানের তেহরানে রাসুলে আকরম (সা.) মসজিদে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে হাওজায়ে ইলমিয়ার বিশিষ্ট অধ্যাপক হুজ্জতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আব্বাস আখওয়ান বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন এক সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যার ভিত্তি ছিল রব্বানিয়্যাত, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিকতা। তিনি উল্লেখ করেন, নবী (সা.) সাহাবিদের অন্তর্দৃষ্টি, স্বপ্ন ও আধ্যাত্মিক অনুভূতি নিয়ে আলোচনা করতেন এবং বাহ্যিক ইবাদতের পাশাপাশি তাদের আত্মিক উন্নতির দিকেও দৃষ্টি দিতেন।

তার মতে, এই আধ্যাত্মিক সমাজ টিকিয়ে রাখতে নবী (সা.)-এর পর এমন নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল যারা নিজেই আধ্যাত্মিকতার শিখরে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো আধ্যাত্মিক পথকে ছাপিয়ে যায় এবং বিচ্যুতির সূচনা হয়।

সাকিফা—ইসলামি সমাজের “প্রথম বড় বিচ্যুতি”
হুজ্জাতুল ইসলাম আখওয়ান বলেন, নবী (সা.) স্পষ্টভাবেই মানুষকে আমিরুল মু’মিনিন ইমাম আলী (আ.)-এর দিকে নির্দেশ করেছিলেন। কিন্তু নবীর ইন্তেকালের পর সাকিফার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নেতৃত্ব এমন ব্যক্তিদের হাতে চলে যায় যারা গাফিলত ও নফসানিয়্যাতের প্রভাবমুক্ত ছিলেন না। এর ফলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শনকে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করে।

ইমাম আলী (আ.)-এর যুগে বাহ্যিক ইসলাম ছিল, কিন্তু অন্তরে যাহেলিয়াত প্রবল
হুজ্জাতুল ইসলাম আখওয়ান বলেন, প্রায় দুই দশক পর যখন মানুষ আবার ইমাম আলী (আ.)-কে নেতৃত্বের জন্য আহ্বান জানায়, তিনি স্পষ্ট মন্তব্য করেন—এই সমাজ আর নবী-যুগের সেই আধ্যাত্মিক পরিচিতি ধরে রাখতে পারেনি। বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা রক্ষিত থাকলেও হৃদয়ে ধীরে ধীরে যাহেলিয়াতের প্রবণতা ফিরে আসে।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, জাহেলিয়াত মানে শুধু নৈতিক অবক্ষয় নয়; আল্লাহসচেতনতা থেকে বিচ্ছিন্ন এমন জীবন, যেখানে সামাজিকতা থাকলেও আধ্যাত্মিকতা অনুপস্থিত। নবী (সা.) সমাজকে যে অন্ধকার থেকে মুক্ত করেছিলেন, আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব হারানোর ফলে সেই অন্ধকার আবার ফিরে আসে।

আহলুল বাইত (আ.) থেকে দূরত্ব— এক সামাজিক প্রবণতায় রূপান্তর
বক্তৃতায় হুজ্জাতুল ইসলাম  আখওয়ান বলেন, আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের অভাবে জনগণ প্রকৃত দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। সময়ের সাথে সাথে আহলুল বাইত (আ.)-এর প্রতি ভক্তি ও সম্মান ক্ষীণ হয়ে যায় এবং এটি একধরনের সামাজিক প্রবণতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর ভাষ্যে, হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর রাতের আঁধারে গোপন দাফনই প্রমাণ করে সমাজ নবী (সা.)-এর পথ থেকে কতটা সরে গিয়েছিল।

তাকওয়াহীন শাসনব্যবস্থায় মূল্যবোধের পতন—ইতিহাসের সাক্ষ্য
হুজ্জাতুল ইসলাম আখওয়ান আয়াতুল্লাহ মার’আশি নাজাফি, আয়াতুল্লাহ হায়েরী ও আল্লামা ফালসাফীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে— যখন শাসনব্যবস্থা তাকওয়া থেকে সরে যায়, তখন ধর্মীয় মূল্যবোধও পতনের মুখে পড়ে। প্রথম পাহলাভী যুগে কাশফে হিজাবের মতো ধর্মবিরোধী পদক্ষেপ তারই উদাহরণ।

“সাকিফার পরের বিচ্যুতিই বহু সংকটের মূল”
বক্তৃতার উপসংহারে হুজ্জাতুল ইসলাম আখওয়ান বলেন, সাকিফার পরবর্তী ঘটনাবলি শুধুই রাজনৈতিক মতবিরোধ ছিল না; বরং একটি মূলগত পরিবর্তন, যা ইসলামি সমাজকে রব্বানিয়্যাত থেকে নফসানিয়্যাতের দিকে ধাবিত করে। মুসলমানদের বহু ঐতিহাসিক সংকটের মূলও এখানে নিহিত।

তিনি বলেন, আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব হারালে সমাজ তার উজ্জ্বল মূল্যবোধ ভুলে যায়—যেমনটি নবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর দেখা গেছে, যার ফল ছিল আহলুল বাইত (আ.) থেকে দূরত্ব এবং জাহেলিয়াতের মানসিকতার বিস্তার।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha