শনিবার ২৯ নভেম্বর ২০২৫ - ২১:০৮
যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক হস্তক্ষেপ তাকে বিশ্বে ক্রমশ আরও ঘৃণিত করে তুলছে: আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী

ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অযাচিত হস্তক্ষেপ, যুদ্ধ ও আক্রমণের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ঘৃণার সৃষ্টি হচ্ছে এবং ইসরায়েলের গণহত্যায় প্রকাশ্য সহযোগিতা করে নিজেই ঘৃণিত হচ্ছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি:  আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী ২৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে এক টেলিভিশন ভাষণে ইরান, অঞ্চল এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জাতির উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। বাসিজ সপ্তাহ উপলক্ষে প্রদত্ত এ ভাষণে তিনি বাসিজকে একটি জাতির শক্তি ও দিকনির্দেশনার উৎস হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, ইরানের মতো দেশ—যা বৈশ্বিক ক্ষমতাধর ও আধিপত্যবাদীদের সামনে প্রকাশ্যে ও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে—সেই দেশের জন্য বাসিজ অনন্য এবং অপরিহার্য একটি শক্তি।

প্রতিরোধের চেতনা এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী বলেন, আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর লোভ, হস্তক্ষেপ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতিগুলোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, “ইরানে জন্ম নিয়ে বিকশিত হওয়া প্রতিরোধের চেতনা এখন বিশ্বজুড়ে, এমনকি পশ্চিমা দেশগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও, ফিলিস্তিন ও গাজাকে সমর্থন জানানো স্লোগানে প্রতিফলিত হচ্ছে।”

“১২ দিনের যুদ্ধে ইরানি জাতি যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নিস্ট শাসনকে পরাজিত করেছে”
তিনি বলেন, “১২ দিনের যুদ্ধে ইরানি জাতি নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নিস্ট শাসন—উভয়কেই পরাজিত করেছে। তারা অপকর্মে লিপ্ত হয়েছিল, আঘাত পেয়েছে, এবং শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ফিরে গেছে। এটি নিখাদ পরাজয়।”

গাজায় সংঘটিত ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞকে তিনি অঞ্চলের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ মানবিক বিপর্যয় আখ্যা দিয়ে বলেন, “এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র উসুলকারী শাসনের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেও বিশ্বব্যাপী কলঙ্কিত হয়েছে। সকলেই জানে—যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া জায়নিস্ট শাসন এমন বর্বরতা চালাতে পারত না।”

২০ বছর ধরে প্রস্তুত করা যুদ্ধ ব্যর্থ হলো
জায়নিস্ট শাসনের ২০ বছরের ইরানবিরোধী যুদ্ধপরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তারা ২০ বছর ধরে পরিকল্পনা করেছিল—ইরানে যুদ্ধ শুরু করবে, জনগণকে উসকে দেবে যাতে তারা ইসলামি শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা ব্যর্থ হয়েছে। পরিস্থিতি উল্টো তাদের বিপক্ষে গেছে। এমনকি যাদের ব্যবস্থার সঙ্গে মতপার্থক্য ছিল তারাও জাতি ও রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “হ্যাঁ, আমরা ক্ষতি স্বীকার করেছি। যুদ্ধের চরিত্রই এমন। আমরা মূল্যবান প্রাণ হারিয়েছি। তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র দেখিয়েছে—এটি দৃঢ় সংকল্প ও সিদ্ধান্তের কেন্দ্র, যা ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারে। আর শত্রুর ওপর যে ক্ষতি নেমে এসেছে, তা আমাদের তুলনায় অনেক বেশি।”

“১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রও কঠোর পরাজয়ের মুখে পড়েছে”
তিনি বলেন, “এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রও গভীর ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। তারা তাদের সর্বাধুনিক যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ,সাবমেরিন, যুদ্ধবিমান, উন্নত এয়ার-ডিফেন্স ব্যবস্থা—সবই ব্যবহার করেছে। তবুও তারা তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তারা ইরানি জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল, কিন্তু ফল হয়েছে বিপরীত—জাতি আরও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা পুরোপুরি ব্যর্থ করেছে।”

জায়নিস্ট প্রধান “বিশ্বের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি”
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী বলেন, “আজ বিশ্বের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি হলো জায়নিস্ট সরকারের প্রধান এবং তাদের শাসনযন্ত্র পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণিত অপরাধী চক্র।” তিনি আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাই জায়নিস্ট শাসনের প্রতি যে ঘৃণা রয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিও ছড়িয়ে পড়ছে।”

যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক হস্তক্ষেপই ঘৃণা বৃদ্ধির প্রধান কারণ
তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র যেখানে হস্তক্ষেপ করে, সেখানেই যুদ্ধ, গণহত্যা, ধ্বংস আর মানুষের উচ্ছেদ ঘটে।”

তিনি অভিযোগ করেন যে যুক্তরাষ্ট্র তেল, গ্যাস এবং ভূগর্ভস্থ সম্পদের লোভে বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা তৈরি করছে—এমনকি লাতিন আমেরিকাতেও। তিনি বলেন, এমন সরকারের সঙ্গে ইসলামি প্রজাতন্ত্র কোনো সহযোগিতা কামনা করে না।

ইউক্রেন যুদ্ধ—যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার আরেক উদাহরণ
তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট দাবি করেছিলেন তিন দিনের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করবেন। অথচ প্রায় এক বছর পার হয়ে গেছে, এখন তিনি সেই দেশটির ওপর ২৮ দফা পরিকল্পনা চাপিয়ে দিতে চাইছেন—যে যুদ্ধের দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ই দেশটিকে ঠেলে দিয়েছিল।”

অঞ্চলের অন্যান্য আগ্রাসনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন
লেবাননে হামলা, সিরিয়ায় আগ্রাসন, পশ্চিম তীরে অপরাধ, এবং গাজার ভয়াবহ মানবিক সংকট—এসবকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থনে সংঘটিত জায়নিস্ট অপরাধ বলে উল্লেখ করেন।

ইরান যুক্তরাষ্ট্রে বার্তা পাঠিয়েছে— এমন দাবি ভুয়া
তিনি বলেন, “তারা দাবি করছে, ইরান নাকি তৃতীয় দেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে বার্তা পাঠিয়েছে। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। এমন কিছু হয়নি।”

বাসিজ: জনগণের শক্তি ও সেবার প্রতীক
বাসিজের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “সাংগঠনিকভাবে এটি আইআরজিসির একটি শাখা, যা শত্রুর মুখোমুখি দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায় এবং জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকে।”

তিনি যোগ করেন, “বাসিজের প্রকৃত শক্তি হলো এর বিস্তৃত জনভিত্তি—দেশের সর্বত্র যারা সাহসী, উদ্যমী, আশাবাদী এবং সেবামুখী, তারা যে ক্ষেত্রেই থাকুক—অর্থনীতি, শিল্প, বিজ্ঞান, শিক্ষা, হাওজা, উৎপাদন বা ব্যবসা—সবাই-ই বাসিজের প্রতিনিধিত্ব করে।”

তিনি বলেন, “বাসিজের প্রাণশক্তি ও গতিশীলতা নিপীড়িত জাতিগুলোর প্রতিরোধকে আরও শক্তিশালী করে। প্রতিরোধের উত্থানে বিশ্বের নিপীড়িত জনগণ নিজেদের সমর্থিত ও ক্ষমতাবান অনুভব করে।”

সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানান, “একজন সত্যিকারের বাসিজির মতো—বিশ্বাস, প্রেরণা ও মর্যাদাবোধ নিয়ে দায়িত্ব পালন করুন।”

জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান
শেষে তিনি জাতির উদ্দেশে কয়েকটি সুপারিশ করেন, যার প্রথমটি ছিল জাতীয় ঐক্য রক্ষা ও জোরদার করা। তিনি বলেন, “বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক মতাদর্শে মতভিন্নতা থাকতেই পারে। কিন্তু মূল বিষয় হলো—১২ দিনের যুদ্ধের মতো—শত্রুর মুখোমুখি আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকি। এই সংহতিই আমাদের জাতীয় শক্তির প্রধান উপাদান।”

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha