নেতৃত্ব দেওয়া ও সংকটের সম্মুখভাগে থেকে দায়িত্ব পালনের অসাধারণ যোগ্যতা ছিল হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর মধ্যে। তবে কারবালার ঘটনায় তাঁর এই গুণাবলি পূর্ণতা লাভ করে। তিনি আহলে বাইতের কাফেলার নারীদের এমন দৃঢ়তা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে পরিচালনা করেছিলেন, যাতে কারবালার বীরত্বগাথা কেবল শোক ও মাতমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। একই সঙ্গে তিনি নিশ্চিত করতে সচেষ্ট ছিলেন, যেন আশুরার মহান বার্তা প্রচার ও সংরক্ষণের বিষয়টি আড়ালে পড়ে না যায় এবং কারবালার ঘটনা একটি সাময়িক যুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হয়ে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে না যায়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: হযরত জয়নাব (সা.আ.) ছিলেন হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর কন্যা। মায়ের কাছ থেকেই তিনি মানুষের প্রতি ভালোবাসা, বিপদগ্রস্তদের আশ্রয় দেওয়া এবং জনকল্যাণে আত্মনিয়োগের শিক্ষা পেয়েছিলেন। তিনি স্মরণ করতেন, কীভাবে তাঁদের ঘর মদিনার নারীদের জন্য আশ্রয় ও আশার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। তাঁর মা ছিলেন নারীদের পথপ্রদর্শক, পরামর্শদাতা ও শিক্ষিকা। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা নিতে নারীরা তাঁর কাছে আসতেন।

শৈশব থেকেই হযরত জয়নাব (সা.আ.) ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও মনোযোগী। মায়ের কাছে আসা নারীদের সন্তানদের সঙ্গে খেলাধুলা করলেও তিনি মায়ের কথা ও কাজ গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করতেন। মনে হতো, তিনি যেন এমন এক শিক্ষালয়ে পাঠ নিচ্ছেন, যেখানে একদিন তাঁকে অর্জিত জ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগের পরীক্ষা দিতে হবে।

কখনো কোনো প্রতিবেশী নারী মায়ের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলে চলে গেলে এবং মাকে ক্লান্ত মনে হলে, ছোট্ট জয়নাব মায়ের কোলে গিয়ে আদর করতেন। নিজের স্নেহময় উপস্থিতি দিয়ে মায়ের ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করতেন। শৈশবেই তিনি বুঝতে শিখেছিলেন, কীভাবে ভালোবাসা ও মমতা দিয়ে প্রিয়জনের মন ভালো রাখা যায়।

তবে হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর শৈশব কেবল খেলাধুলা ও আনন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে সেবার মানসিকতা গড়ে উঠেছিল। তিনি মানুষের শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিক বেদনাও অনুভব করতে শিখেছিলেন। মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করা এবং সময়ের নির্মম আঘাতে ক্ষতবিক্ষত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় পরিপক্ব হয়ে ওঠেন। তরুণীদের তাফসির শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি জীবনের প্রতিকূলতা ও সংকট কীভাবে মোকাবিলা করতে হয়, সে শিক্ষাও দিতেন। কারণ, তাঁর সামনে অপেক্ষা করছিল এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব—কারবালার বিপর্যয়ের পর আহলে বাইতের বার্তা সংরক্ষণ এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, তাঁর কাঁধে এক মহান দায়িত্ব অর্পিত হতে যাচ্ছে। মায়ের মুখে তিনি শুনেছিলেন, তাঁকে বড় বড় ঘটনা ও কঠিন পরিস্থিতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। ভবিষ্যতে তিনি ও ইমাম হুসাইন (আ.) এমন কিছু ঘটনার মুখোমুখি হবেন, যা ইতিহাসের পাতায় যুগ যুগ ধরে আলোচিত হবে।

কারবালার ঘটনা ছিল তেমনই এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। কেউ এর শোকগাথা গেয়েছেন, কেউ এর তাৎপর্য বিশ্লেষণ করেছেন, আবার কেউ ভালোবাসা ও আবেগের সঙ্গে এর স্মৃতি বহন করেছেন। কিন্তু এই ঘটনার প্রকৃত শিক্ষা ও বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর ভূমিকা ছিল অনন্য।

কারবালায় তাঁর নেতৃত্বের অসাধারণ গুণাবলি পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়। তিনি আহলে বাইতের নারী ও শিশুদের দেখাশোনা এবং কাফেলার সদস্যদের মনোবল ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, কারবালার বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম যেন কেবল শোক ও মাতমের ঘটনায় পরিণত না হয়; বরং এর ন্যায়, সত্য ও আত্মত্যাগের বার্তা যেন মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

তিনি কারবালার বিপ্লবের গভীর তাৎপর্য তুলে ধরার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গিয়ে মানুষের সামনে ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেন, যাতে সত্য চাপা পড়ে না যায় এবং ইতিহাসে সংরক্ষিত থাকে কারবালায় কী ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল এবং এর শিক্ষা কী।

হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর এই ঐতিহাসিক ভূমিকা আজও নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, সংকটের সময় নারীরা শুধু ধৈর্য ধারণই করেন না; বরং নেতৃত্ব, সচেতনতা, সাহস ও সত্য প্রকাশের মাধ্যমেও ইতিহাসের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

এই আদর্শ অনুসরণ করে বর্তমান সময়ের নারীদেরও লেখনী, বক্তব্য ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে মুসলমানদের ওপর ঘটে যাওয়া অন্যায়-অবিচারের চিত্র তুলে ধরতে হবে। বিশেষ করে মুসলিম সমাজের ওপর সংঘটিত সহিংসতা, নিরপরাধ মানুষের দুর্ভোগ এবং শিশুদের ওপর নিষ্ঠুরতার ঘটনাগুলো বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা জরুরি।

প্রতিবেদনটিতে ইরানের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছে, ইতিহাস যেন আবারও ফিরে এসেছে। সেখানে সংঘাতের মধ্যে শিশুদেরও রেহাই দেওয়া হয়নি; এমনকি নিহতদের তালিকায় তিন দিন ও বিশ দিন বয়সী নবজাতকের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। মানবাধিকারের দাবিদার আন্তর্জাতিক মহলের নিষ্ক্রিয়তারও সমালোচনা করা হয়েছে।

লেখাটির বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানেও হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত নারীরা নিজেদের দায়িত্ব পালনে এগিয়ে এসেছেন। তাঁরা তাঁদের মহীয়সী আদর্শের পথ অনুসরণ করে সত্য তুলে ধরা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির দায়িত্ব পালন করছেন।

ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ জীবনব্যবস্থা নয়। নতুন প্রজন্মের বিকাশ, ন্যায় ও সত্যের পক্ষে অবিচল অবস্থান এবং হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত নারীদের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে এর শিক্ষা ও মূল্যবোধ নতুনভাবে প্রকাশিত হয়।

হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে নারীরা সংকটময় পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব দিতে পারেন এবং অন্যদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। তাঁদের সাহসী ভূমিকা বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষকে জাগ্রত করতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে এবং আধিপত্যবাদী শক্তির মোকাবিলায় সচেতনতা গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে।

হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত নারীরাই ন্যায় ও সত্যের পক্ষে সংগ্রামের অগ্রসেনা।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha