হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ২৭তম নাইরোবি আন্তর্জাতিক বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কেনিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আলী গোলামপুর, ইরানের সাংস্কৃতিক কাউন্সেলর মেহদি বেইকি, তুরস্কের রাষ্ট্রদূত এবং কেনিয়ার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব।
গোলামপুর তাঁর বক্তব্যে বইমেলার মূল প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে পাঠ, চিন্তাভাবনা ও বইয়ের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সমাজকে ক্ষমতায়ন এবং বিভিন্ন জাতির মধ্যে যোগাযোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কেনিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত ফারসি সাহিত্যের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব-ফিরদৌসি, সাদি, হাফেজ ও মাওলানা-সম্পর্কে পরিচিতি তুলে ধরে সাংস্কৃতিক সংলাপ সম্প্রসারণ এবং জাতিগুলোর মধ্যে শান্তি ও বন্ধুত্ব জোরদারে ইরানের সাহিত্যিক ও সভ্যতাগত সক্ষমতার কথা ব্যাখ্যা করেন।

বই: জাতিগুলোর মধ্যে যোগাযোগের সেতু ও চিন্তার ভিত্তি
এরপর তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনেয়ী-এর জীবন ও চিন্তায় বইয়ের অবস্থান সম্পর্কে বলেন, তাঁর জীবনে বই ও বইপাঠের বিশেষ গুরুত্ব ছিল।
গোলামপুর উল্লেখ করেন, শৈশব-কৈশোর ও যৌবন থেকেই ইতিহাস, সাহিত্য, কবিতা ও উপন্যাসসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর ব্যাপক অধ্যয়ন ছিল। তিনি মানুষের চিন্তার বিকাশ, এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তর এবং জাতির সাংস্কৃতিক বিকাশে বইয়ের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কেনিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, বই কেবল একটি শিক্ষামাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সংস্কৃতি ও প্রজন্মগুলোর মধ্যে একটি সেতু হয়ে উঠতে পারে। তিনি বইয়ের স্থায়িত্ব ও প্রভাব সম্পর্কে শহীদ নেতার দৃষ্টিভঙ্গির কথা উল্লেখ করে বলেন, বইমেলার প্রতিপাদ্যের সঙ্গে এই দৃষ্টিভঙ্গির সংযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে চিন্তা, সংস্কৃতি এবং জাতিগুলোর মধ্যে সংলাপ গঠনে বইয়ের ভূমিকা তুলে ধরা সম্ভব।
ইরান ও কেনিয়ার মধ্যে সাংস্কৃতিক সহযোগিতার প্রস্তাব
দুই দেশের বিদ্যমান সক্ষমতার কথা বিবেচনা করে গোলামপুর কয়েকটি ক্ষেত্রে সহযোগিতার প্রস্তাব দেন। এর মধ্যে রয়েছে:
- ফারসি ভাষা শিক্ষার প্রসার;
- লেখক ও সাহিত্যকর্মের পারস্পরিক বিনিময়;
- প্রকাশনা অধিকার ও কপিরাইট-সংক্রান্ত সহযোগিতা সহজ করা;
- শিশু ও কিশোর সাহিত্যের যৌথ অনুবাদ;
- তেহরান আন্তর্জাতিক বইমেলায় কেনিয়ার প্রকাশকদের অংশগ্রহণ।
তিনি বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ইরানের সাহিত্যিক ও সভ্যতাগত সক্ষমতা তুলে ধরার পাশাপাশি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের শহীদ নেতার জীবন, কর্মপদ্ধতি, চিন্তাধারা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-সম্পর্কিত গ্রন্থসমূহ কেনিয়ার পাঠকদের কাছে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গবেষক এবং ইরান ও ইসলামবিষয়ক অধ্যয়নে আগ্রহীদের কাছে পরিচিত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
উল্লেখ্য, ইরানের স্টলে কেনিয়ায় নিযুক্ত ইরান ও তুরস্কের রাষ্ট্রদূত এবং কেনিয়ার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা বিভিন্ন গ্রন্থ পরিদর্শন করেন এবং ইরানের প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সক্ষমতার সঙ্গে পরিচিত হন। এ সময় স্টলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়।
এর একটি হলো ‘মমতাময় পিতা’-যার উপশিরোনাম ‘শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনেয়ীর জীবন থেকে সংক্ষিপ্ত কিছু বর্ণনা’। তাঁর জীবন, সীরাত ও ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে রচিত এই বর্ণনামূলক গ্রন্থটি ২০২৬ সালে গ্রিন পাম প্রকাশনী থেকে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয় এবং অনুষ্ঠানে এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
অন্য গ্রন্থটি হলো ‘বাবা’। পিতা ও পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের আবেগঘন সম্পর্ককে কেন্দ্র করে সোয়াহিলি ভাষায় প্রকাশিত এই বইটিও কেনিয়ার পাঠক ও বইশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানের প্রান্তিক আলোচনায় অন্যান্য দেশের, বিশেষ করে তুরস্কের অংশগ্রহণের মডেল পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা যায়, বিদেশি বাজারে গ্রন্থ অনুবাদ ও প্রকাশনার জন্য সরকারি সহায়তার পরিকল্পিত ব্যবহার প্রকাশকদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ এবং প্রকাশনা-স্বত্ব বিনিময়ের ক্ষেত্র সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে।

মিনাবের শহীদ শিক্ষার্থীদের স্মরণে আয়োজন; এক হাজারের বেশি বার্তা ও চিত্রাঙ্কন
ইরানের এই বইমেলা অংশগ্রহণের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল মিনাবের শহীদ শিক্ষার্থীদের স্মরণে স্টলে একটি বিশেষ পরিসর নির্ধারণ করা এবং কেনিয়ার শিক্ষার্থীদের সেখানে বার্তা লেখার মাধ্যমে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া।
নাইরোবি বইমেলায় ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের স্টলে মিনাবের শহীদ শিক্ষার্থীদের স্মরণে একটি অংশ রাখা হয়। এর মাধ্যমে আফ্রিকান দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এই অংশে কেনিয়ার শিক্ষার্থীরা নিজেদের বার্তা লিখে এসব শহীদের স্মৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা প্রকাশ করে।
এই উদ্যোগটি ইরানের স্টল ও কিশোর-কিশোরী দর্শনার্থীদের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। কেনিয়ার শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এক হাজারেরও বেশি বার্তা, অনুভূতিপূর্ণ লেখা ও চিত্রাঙ্কন এতে সংরক্ষিত হয়।
আপনার কমেন্ট