শুক্রবার ২ অক্টোবর ২০২৬ - ১১:১৬
পারমাণবিক অস্ত্র: হুমকি, নাকি যুদ্ধ ঠেকানোর কৌশল?

হাওজা নিউজ এজেন্সি—আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় ভারসাম্য, যুদ্ধ, শান্তি ইত্যাদির পাশাপাশি ‘প্রতিরোধ’ (Deterrence) একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। গত কয়েক দশকে বিভিন্ন দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণাটির গুরুত্বও বেড়েছে।

প্রতিরোধ বলতে মূলত এমন একটি কৌশল বোঝায়, যার মাধ্যমে কোনো শত্রু বা প্রতিপক্ষকে সম্ভাব্য আক্রমণ বা ক্ষতিকর পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখা হয়। পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে এই ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিপুল ধ্বংসক্ষমতা সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে এবং তাকে আক্রমণ থেকে বিরত রাখতে পারে।

যদিও ‘প্রতিরোধ’ ধারণাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বে বিশেষ গুরুত্ব পায়, এর মূল ধারণা ইতিহাসে আরও আগে থেকেই দেখা যায়। একজন ব্যক্তি বা একটি রাষ্ট্র যখন নিজের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার জন্য সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেয়, তখন সেটিও এক অর্থে প্রতিরোধের অংশ।

রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি বড় হুমকি হলো স্বার্থের সংঘাত এবং এমন শত্রুর আক্রমণ, যা দীর্ঘদিনের অর্জন ও সম্পদ ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায়—যেখানে অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক কৌশলেরও বড় ভূমিকা রয়েছে—নিজেকে রক্ষা করার জন্য শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই কেউ কেউ মনে করেন, আধুনিকতম অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তিতে শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। এর উদ্দেশ্য অস্ত্র ব্যবহার করা নয়; বরং সম্ভাব্য আগ্রাসীকে এমন আক্রমণ থেকে বিরত রাখা, যাতে সে বুঝতে পারে যে আক্রমণের জবাব দেওয়ার সক্ষমতা অপর পক্ষের রয়েছে।

বাস্তববাদ ও প্রতিরোধের ধারণা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসের পর বিশ্বে এমন একটি ধারণা শক্তিশালী হয়েছিল যে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ করা সম্ভব। এরই ধারাবাহিকতায় ‘লীগ অব নেশনস’-এর মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখিয়ে দেয় যে শুধু আন্তর্জাতিক চুক্তি ও প্রতিষ্ঠান থাকলেই যুদ্ধ বন্ধ রাখা সম্ভব নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ব্যাপক ধ্বংস ও প্রাণহানির পর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাস্তববাদী (Realist) চিন্তাধারা আরও শক্তিশালী হয়। বাস্তববাদীদের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রতিটি রাষ্ট্রকে নিজের নিরাপত্তা ও টিকে থাকার জন্য শক্তিশালী হতে হয়।

আদর্শবাদীরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক চুক্তি, নৈতিক মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তববাদীরা মনে করেন, শুধু নৈতিক শিক্ষা বা চুক্তির ওপর নির্ভর করলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা পুরোপুরি বোঝা যায় না। কারণ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে স্বার্থের সংঘাত রয়েছে এবং ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় শক্তি ব্যবহার করতে পারে।

এই কারণে বাস্তবাদীদের মতে, একটি রাষ্ট্র যত বেশি আত্মরক্ষায় সক্ষম হবে, অন্য রাষ্ট্রের পক্ষে তাকে আক্রমণ করার ঝুঁকিও তত বেশি হবে। কারণ আক্রমণকারীকে পাল্টা আঘাতের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে হবে। এভাবেই শক্তি আক্রমণ ঠেকানোর একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে।

এই ধারণাই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রতিরোধ তত্ত্বের অন্যতম ভিত্তি।

প্রতিরোধ কী?
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিরোধ কৌশল ও কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সহজভাবে বললে, প্রতিরোধ হলো হুমকি বা সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কা দেখিয়ে অন্য পক্ষকে কোনো ক্ষতিকর পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা।

অক্সফোর্ডের রাজনৈতিক অভিধানে প্রতিরোধকে অন্য পক্ষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য হুমকি ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

অর্থাৎ, প্রতিরোধের লক্ষ্য হলো শত্রু আক্রমণ করার আগেই তাকে বোঝানো যে, আক্রমণ করলে তাকে গুরুতর পাল্টা জবাবের মুখোমুখি হতে হবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সামরিক কৌশলের আলোচনায় ‘প্রতিরোধ’ শব্দটি খুব বেশি ব্যবহৃত হতো না। পারমাণবিক অস্ত্র আবিষ্কারের পর এই ধারণাটি বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।

অনেক গবেষক মনে করেন, স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কারণে উভয় পক্ষ সরাসরি পারমাণবিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়িয়ে চলেছিল। কারণ উভয় পক্ষই জানত, পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হলে উভয়েরই বিপুল ক্ষতি হতে পারে। ফলে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি তারা পরস্পরকে আক্রমণ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করত।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিরোধ
ইসলামও শত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবিলায় শক্তিশালী ও প্রস্তুত থাকার ওপর গুরুত্ব দেয়। এ প্রসঙ্গে তিনি কুরআনের সূরা আল-আনফালের ৬০ নম্বর আয়াত উল্লেখ করেছেন:

وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ ۚ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ.

“আর তাদের মোকাবিলার জন্য তোমরা তোমাদের সাধ্য অনুযায়ী শক্তি ও প্রস্তুত ঘোড়া প্রস্তুত রাখো, যার মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর শত্রু, তোমাদের শত্রু এবং তাদের ছাড়া অন্যদের—যাদের তোমরা জানো না, কিন্তু আল্লাহ জানেন—ভীতসন্ত্রস্ত করতে পারবে। আর আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদের দেওয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না।” [সূরা আল-আনফাল, ৮:৬০]

মুসলমানদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক শক্তি ও প্রস্তুতি রাখতে হবে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে যুদ্ধের উপকরণও পরিবর্তিত হয়। তাই প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি অর্জনের বিষয়টিও এই প্রস্তুতির অন্তর্ভুক্ত বলে লেখক মনে করেন।

নবী করীম হযরত মুহাম্মদ (সা.) যখন জানতে পারেন যে ইয়েমেনে নতুন ধরনের একটি অস্ত্র তৈরি হয়েছে, তখন তিনি তা সংগ্রহের জন্য একজন ব্যক্তিকে সেখানে পাঠিয়েছিলেন।

এ আয়াত থেকে ছয়টি বিষয় লক্ষণীয়:

প্রথমত, মুসলমানদের সামরিক সরঞ্জাম, জনবল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতার দিক থেকে যথেষ্ট প্রস্তুত থাকতে হবে, যাতে শত্রুর আক্রমণ বা বিশ্বাসঘাতকতার মোকাবিলা করা যায়।

وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ


দ্বিতীয়ত, সামরিক শক্তি অর্জনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রকে রক্ষা করা; অন্যের সম্পদ লুট করা বা অন্য দেশ দখল করা নয়।

তৃতীয়ত, রাষ্ট্রকে নিজের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য তার সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অর্থ ও সম্পদ ব্যয় করতে হবে।

مَا اسْتَطَعْتُمْ


চতুর্থত, মুসলমানদের শত্রুর সম্ভাব্য ষড়যন্ত্র ও আক্রমণের মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে।

পঞ্চমত, সব সমস্যার সমাধান শুধু আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে হয় না; কিছু পরিস্থিতিতে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতাও প্রয়োজন হতে পারে।

ষষ্ঠত, প্রতিটি যুগের প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিক ও কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এর মধ্যে সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির পাশাপাশি যোগাযোগ, সরবরাহ ও অন্যান্য সহায়ক ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত।

مِنْ قُوَّةٍ.


উপরের যুক্তিগুলোর ভিত্তিতে— শত্রুর হুমকি প্রতিরোধের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সময়, স্থান ও পরিস্থিতি এবং ইসলামী ফিকহের আলোকে আধুনিক অস্ত্রের পাশাপাশি পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত।

সুতরাং NPT (Nuclear Non-Proliferation Treaty বা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি) থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়টিও টেবিলে রাখা জরুরী।

যুক্তরাষ্ট্রের একজন ‘যুদ্ধপ্রবণ ও দাম্ভিক’ নেতা বলেছেন—ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত থাকত, তাহলে তিনি ইরানের সামনে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতেন।

তবে হ্যাঁ, সামরিক শক্তির চেয়েও মুসলমানদের প্রধান শক্তি হলো ঈমান, ইখলাস, জনগণের ঐক্য এবং তৎকালীন ওয়ালি-ই-ফকিহের প্রতি আনুগত্য ও অনুসরণ। তিনি ওয়ালি-ই-ফকিহকে মহান নেতা ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

লিখেছেন— হাসান খোররামি আরানি
সিনিয়র শিক্ষক, হাওজায়ে ইলমিয়া কোম এবং অধ্যাপক, বিশ্ববিদ্যালয়

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha