সোমবার ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ - ১৪:৩১
কুরআনি পথ নির্দেশিকা

হাওজা / কুরআনি পথ নির্দেশিকা : আদর্শ জীবন যাপনের সঠিক দিশা।

কুরআনি পথ নির্দেশিকা : আদর্শ জীবন যাপনের সঠিক দিশা

إِنَّ هَٰذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا كَبِيرًا
নিশ্চয়ই এই কুরআন এমন পথ প্রদর্শন করে, যা সর্বাধিক সরল এবং সৎকর্মশীল মুমিনদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।  
[ সূরা আল-ইসরা (১৭:৯) ]

মুসলমানদের জন্য কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক জীবনযাপন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কুরআন মুসলমানদের জন্য শুধু একটি ধর্মগ্রন্থই নয়, বরং এটি জীবনযাপনের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা। কুরআনের শিক্ষা ও সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করাই একজন মুসলমানের প্রধান দায়িত্ব। নিম্নে কুরআনি আদর্শে জীবনযাপনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আলোচনা করা হলো:

১. ঈমান ও তাওহিদের ভিত্তি:
কুরআনি জীবনযাপনের প্রথম ও প্রধান স্তম্ভ হলো ঈমান ও তাওহিদ। আল্লাহ তাআলা বলেন, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। (সূরা আল-ইমরান, ৩:২)

একজন মুসলমানের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাওহিদের চেতনা জাগ্রত থাকা আবশ্যক। আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখা এবং শিরক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থাকাই ঈমানের মূল ভিত্তি।

২. ইবাদতের ধারাবাহিকতা:
কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইবাদতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। নামাজ, রোজা, জাকাত ও হজ্জের মতো ফরজ ইবাদতগুলো নিয়মিত পালন করা একজন মুসলমানের কর্তব্য। আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। (সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:৪৫)

ইবাদত শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। নিয়মিত ইবাদতের মাধ্যমে মানব জীবন পরিশুদ্ধ হয় এবং আধ্যাত্মিক শান্তি লাভ করা যায়।

 ৩. নৈতিকতা ও চরিত্র গঠন:
কুরআন মুসলমানদেরকে উত্তম চরিত্র ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। 
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আমি উত্তম চরিত্রের পরিপূর্ণতা সাধনের জন্য প্রেরিত হয়েছি। (বুখারি) 

প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন: তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সর্বোত্তম। (বুখারি, মুসলিম)

কুরআনে বলা হয়েছে: মানুষের সাথে উত্তম কথা বলো।
(সূরা বাকারা: ৮৩)
কুরআনে আল্লাহ তাআলা সত্য কথা বলা, আমানত আদায় করা, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা, দানশীলতা ও ক্ষমা প্রদর্শনের মতো গুণাবলী অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। একজন মুসলমানের উচিত তার ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত জীবনে এই নৈতিক গুণাবলী বাস্তবায়ন করা।

 ৪. জ্ঞান অর্জন:
কুরআন জ্ঞান অর্জনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? (সূরা আয-যুমার, ৩৯:৯)

ইসলাম জ্ঞানচর্চাকে ঈমানের অংশ হিসেবে গণ্য করে। একজন মুসলমানের উচিত ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সমাজ ও বিশ্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া। জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজের উন্নতি সম্ভব।

৫. সামাজিক দায়িত্ব ও সম্প্রীতি:
কুরআন সামাজিক দায়িত্ব ও সম্প্রীতির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন। (সূরা আন-নাহল, ১৬:৯০)

একজন মুসলমানের উচিত সমাজের দুর্বল, অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো। পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করা, পাড়া-প্রতিবেশীর হক আদায় করা এবং সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা।

 ৬. ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল:
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখা একজন মুসলমানের অন্যতম গুণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৩)

জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখাই ঈমানের দাবি। এই গুণ অর্জনের মাধ্যমে একজন মুসলমান যেকোনো সমস্যা মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।

৭. পরকালীন জীবনের প্রস্তুতি:
কুরআন বারবার পরকালীন জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, আর তোমরা যে কর্ম কর, আল্লাহ তার দ্রষ্টা। (সূরা আল-বাকারা, ২:১১০)

একজন মুসলমানের উচিত দুনিয়ার জীবনকে পরকালের প্রস্তুতির মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা। দুনিয়ার জীবনের সব কাজই যেন পরকালীন জীবনের সাফল্যের দিকে পরিচালিত হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা আবশ্যক।

৮. পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ব:
কুরআন পরিবেশ ও প্রকৃতির সুরক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
 তিনি পৃথিবীকে তোমাদের জন্য সুবিন্যস্ত করেছেন, অতএব তোমরা এর বুকে বিচরণ কর এবং তাঁর রিজিক থেকে আহার কর। (সূরা আল-মুলক, ৬৭:১৫)

একজন মুসলমানের উচিত প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করা। পরিবেশ দূষণ রোধ, প্রাকৃতিক সম্পদের সদ্ব্যবহার এবং প্রাণী জগতের প্রতি দয়া প্রদর্শন ইসলামের শিক্ষা।

উপসংহার:
কুরআনি আদর্শে জীবন যাপন মানেই হলো আল্লাহর নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করা। এটি শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতেই সীমাবদ্ধ নয়;বরং সমাজ, পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে একটি পরিপূর্ণ জীবন গঠন করা। কুরআনের শিক্ষা ও রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহর আলোকে জীবন গড়ে তোলার মাধ্যমেই একজন মুসলমান প্রকৃত সফলতা অর্জন করতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআনি জীবনযাপনের তাওফিক দান করুন।

লেখক: কবির আলী তরফদার কুম্মি।
তারিখ: ১৬/০২/২০২৫

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha