হাওজা নিউজ এজেন্সি: আসমা বিনতে উমাইস (রা.) বর্ণনা করেন, হুসাইন ইবনে আলী (আ.)-এর জন্মের সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) শিশুটিকে নিয়ে তাঁর ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামত দেন। অতঃপর তিনি কাঁদতে শুরু করেন। কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, “আমার পর একদল জালিম এ সন্তানকে হত্যা করবে। আমি কিয়ামতের দিন তাদের জন্য সুপারিশকারী হব না।” তিনি এ খবর তখন হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-কে জানাতে নিষেধ করেন।
নামকরণ প্রসঙ্গে হযরত আলী (আ.) বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আগে নামকরণ করতে পারি না।” উত্তরে রাসূল (সা.) বললেন, “আমিও আমার রবের আগে নামকরণ করতে অগ্রগামী হব না।” তখনই জিবরাইল (আ.) উপস্থিত হয়ে আল্লাহর বার্তা পেশ করেন।
রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, “হারুনের পুত্রের নাম কী ছিল?”
জিবরাইল (আ.) উত্তর দিলেন, “শাবীর।”
রাসূল (সা.) বললেন, “কিন্তু আমার ভাষা তো আরবি।”
জিবরাইল (আ.) বললেন, “তাহলে এর আরবি প্রতিশব্দ 'হুসাইন' নামে তাঁর নামকরণ করুন।”
এভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর নাতির নাম রাখলেন হুসাইন এবং তাঁর পক্ষ থেকে একটি দুম্বা আকিকা করলেন [১]।
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জীবন থেকে কয়েকটি গভীর শিক্ষা:
১. একটি ফুলের বিনিময়ে মুক্তি: একদা এক দাসী ইমাম হুসাইন (আ.)-কে একটি ফুলের মালা উপহার দিলে তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে মুক্ত করে দেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “আল্লাহ আমাদের এমনি শিক্ষাই দিয়েছেন: 'যখন তোমাদের প্রতি কেউ অনুগ্রহ করে, তোমরাও তার উত্তম প্রতিদান দাও।'” এটি আমাদের শেখায় যে, ভালোবাসা ও সম্মানের নিদর্শনের মূল্য বস্তুগত মূল্যমান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না [২]।
২. মানবিক দায়বদ্ধতা ও ঋণমোচন: ইমাম হুসাইন (আ.) একবার উসামা ইবনে যায়েদ (রা.)-কে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে গিয়ে তার ষাট হাজার দিরহাম ঋণের ভার নিজের কাঁধে তুলে নেন। তিনি আশ্বস্ত করেন, “আমি এটি পরিশোধ না করা পর্যন্ত তোমার মৃত্যু হবে না।” পরবর্তীতে তিনি নিজেই ঋণ পরিশোধ করেন। এ থেকে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও বিপদে পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা মেলে।
৩. গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার বাস্তবিক উপায়: এক পাপাক্রান্ত ব্যক্তির অনুরোধে ইমাম হুসাইন (আ.) তাকে পাঁচটি শর্ত দিয়ে বলেন,
১. আল্লাহর রিযিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে যত ইচ্ছে গুনাহ করো।
২. আল্লাহর সৃষ্টি জগৎ থেকে বের হয়ে গুনাহ করো।
৩. এমন স্থানে গুনাহ করো যেখানে আল্লাহ তোমাকে দেখবেন না।
৪. মালাকুল মাউতকে তোমার প্রাণ নিতে বাধা দাও, তারপর গুনাহ করো।
৫. জাহান্নামের ফেরেশতাকে প্রতিহত করে জাহান্নামে প্রবেশ এড়াও, তারপর গুনাহ করো [৩]।
এই বাক্যগুলো আসলে গভীর তাওহিদী চেতনার প্রকাশ—এগুলো বাস্তবায়ন করা অসম্ভব জেনেই মানুষ আল্লাহর আনুগত্যের দিকে ফিরে আসে।
৪. নামাযের প্রতি অঙ্গীকার: জীবনের সর্বোচ্চ মুহূর্তেও: ইমাম হুসাইন (আ.)-এর প্রথম উচ্চারিত শব্দ ছিল “আল্লাহু আকবার”। আশুরার দিন দুপুরে, রণক্ষেত্রের মাঝখানেও তিনি যোহরের নামাযের প্রথম ওয়াক্ত ত্যাগ করেননি। যখন আবু সামমাহ আস-সায়েদী বললেন, “আপনার ইমামতিতে একবার নামায আদায় করে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষা করি,” তিনি উত্তরে বলেন, “তুমি নামাযের স্মরণ করিয়েছ, আল্লাহ তোমাকে নামাযীদের দলভুক্ত করুন।”
এটি আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক জীবনের সকল পরিস্থিতির ঊর্ধ্বে—এমনকি মৃত্যু মুখোমুখি দাঁড়িয়েও।
তথ্যসূত্র:
[১] মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, ৪৩/২৩৯
[২] প্রাগুক্ত, ৪৪/১৯৫
[৩] প্রাগুক্ত, ১৭/১৫১
আপনার কমেন্ট