হাওজা নিউজ এজেন্সি: ২৮ বাহমান (১৭ ফেব্রুয়ারী) সন্ধ্যায় “মার্কিন–সিয়োনিস্ট ফিতনা”য় নিহতদের চল্লিশা উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি ইমাম খোমেনি (রহ.) রওয়াক-এ, ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান, আস্তানে কুদসে রাজাভির তত্ত্বাবধায়ক আহমদ মারভি, মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রাদেশিক কর্মকর্তারা এবং শহীদ ও ইসারাগার পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
উম্মাহর ইতিহাসে ফিতনার পুনরালোচনা
হুজ্জাতুল ইসলাম রাফিয়ি বলেন, ঐশী ধর্মসমূহের ইতিহাসে ধর্মীয় সমাজ বারবার ফিতনার পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে। হযরত মূসা (আ.)-এর আন্দোলনের পর সামেরীর ঘটনা ছিল অন্যতম প্রাচীন ফিতনা। ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে, আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর খেলাফতকালে সংঘটিত জামাল ও নাহরাওয়ানের যুদ্ধও বড় ধরনের ফিতনার উদাহরণ।

ঐতিহাসিক বর্ণনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জামাল যুদ্ধে প্রায় ২০ হাজার এবং নাহরাওয়ানে প্রায় ৪ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল। এ সংখ্যা প্রমাণ করে, ফিতনা একটি সমাজকে কত গভীর ও অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
ফিতনার চার শ্রেণি: পরিকল্পনা থেকে প্রতিরোধ
সাম্প্রতিক বিশ্লেষণের আলোকে তিনি বলেন, প্রত্যেক ফিতনায় চারটি গোষ্ঠী দেখা যায়:
১. ফিতনা-সৃষ্টিকারী,
২. ফিতনায় বিভ্রান্ত বা প্রভাবিত ব্যক্তি,
৩. নিরপেক্ষ বা ফিতনা-এড়িয়ে চলা ব্যক্তি,
৪. ফিতনা-প্রতিরোধকারী।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফিতনা-সৃষ্টিকারীরা সাধারণত একটি সীমিত পরিকল্পনাকারী গোষ্ঠী, যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে— কখনও বিদেশি সমর্থনে— পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে। কিন্তু তাদের একার পক্ষে ব্যাপক সংকট তৈরি করা সম্ভব নয়; বিভ্রান্ত জনগোষ্ঠী মাঠে নামলে তবেই পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে।
তিনি উল্লেখ করেন, জামাল যুদ্ধের পর হযরত আলী (আ.) প্রতিপক্ষের নিহতদের জানাজা পড়েন, কাউকে বন্দি করেননি এবং তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেননি— কারণ তাদের অনেকেই শত্রুতা নয়, বিভ্রান্তির বশবর্তী হয়ে অংশ নিয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনায় নিহতদের প্রসঙ্গে উসকানিদাতাদের সঙ্গে অন্যদের এক কাতারে ফেলা উচিত নয়। অনেক তরুণ আবেগ বা গণমাধ্যমের প্রভাবে মাঠে নেমেছিল। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল ও পিতৃতুল্য আচরণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
পবিত্রতার মর্যাদা: ধর্মীয় সমাজের পরিচয়ের ভিত্তি
ড. রাফিয়ি বলেন, প্রতিটি সমাজেরই কিছু পবিত্র মূল্যবোধ ও লাল রেখা থাকে, যা রক্ষা করা অপরিহার্য। কুরআনে এমনকি মুশরিকদের উপাস্যদের গালমন্দ করতেও নিষেধ করা হয়েছে, যাতে তারা অজ্ঞতাবশত মুসলমানদের পবিত্র বিষয়গুলোকে অপমান না করে।
ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর একটি বর্ণনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আল্লাহ মানুষের মাঝে পাঁচটি পবিত্রতার মর্যাদা নির্ধারণ করেছেন: নবীর মর্যাদা, কুরআনের মর্যাদা, আহলে বাইতের মর্যাদা, কাবা শরিফের মর্যাদা এবং মুমিনের মর্যাদা। এসবের অবমাননা সমাজের বিশ্বাসভিত্তিকে সরাসরি আঘাত করে।
তিনি রুহুল্লাহ খোমেনির (রহ.) সালমান রুশদি-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ফতোয়ার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, নবী করিম (সা.)-এর মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন মুসলিম উম্মাহর কাছে আপসহীন নীতি।

শত্রুকে চেনা: নাহজুল বালাগার শিক্ষা
নাহজুল বালাগার ১৯৪ নম্বর খুতবার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আমিরুল মুমিনিন (আ.) সেখানে মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে সতর্ক করেছেন। শত্রুকে চেনা এবং ভণ্ডামিমূলক প্রবণতার সঙ্গে একাত্ম না হওয়াই জাতীয় নিরাপত্তা ও সংহতি রক্ষার পূর্বশর্ত।
তিনি বলেন, পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থাই শতভাগ মানুষের সমর্থন পায় না— এমনকি নবীদের যুগেও বিরোধিতা ছিল। মতপার্থক্য স্বাভাবিক; তবে তা যেন শত্রুর সঙ্গে এক কণ্ঠে কথা বলা বা রাষ্ট্রকে দুর্বল করার কারণ না হয়।
শেষে তিনি দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা অটুট রাখার আহ্বান জানান এবং শহীদদের মর্যাদা স্মরণ করে শোকাহত পরিবারগুলোর জন্য ধৈর্য ও নিহতদের জন্য উচ্চ মর্যাদা কামনা করেন।
আপনার কমেন্ট