শুক্রবার ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ১১:৩৮
উন্মুক্ত সমাজ ও ইমাম আলী (আ.)-এর রাজনৈতিক দর্শন

আজকের বিশ্বে 'ক্ষমতা' ও নৈতিকতার সম্পর্ক মানবসমাজের একটি প্রধান ভাবনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রাচীন বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের পুনর্বিচার আমাদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: সমসাময়িক রাজনৈতিক দর্শনে 'উন্মুক্ত সমাজ' একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এমন এক সমাজ, যেখানে ক্ষমতা পবিত্র নয়, শাসকরা ভুলের ঊর্ধ্বে নন, এবং সমালোচনা কোনো হুমকি নয় বরং সংস্কারের অপরিহার্য শর্ত।

ইসলামী চিন্তাধারায়, বিশেষত আমিরুল মুমিনিন ইমাম আলী (আ.)-এর জীবন ও বাণীতে, রাজনীতি সম্পর্কে এমনই এক দৃষ্টিভঙ্গির স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে। এই দৃষ্টিভঙ্গি শাসনব্যবস্থাকে কখনো পবিত্র লক্ষ্য হিসেবে দেখে না; বরং এটিকে অত্যাচার রোধ ও মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের একটি মানবিক হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করে।

শাসন: জন্মগত অধিকার নাকি শর্তসাপেক্ষ দায়িত্ব?
ইমাম আলী (আ.)-এর দৃষ্টিতে শাসনকাজ কোনো স্বতঃসিদ্ধ বা পবিত্র বিষয় নয়। তিনি বারবার জোর দিয়েছেন যে, শাসনভার গ্রহণ তখনই অর্থবহ হয় যখন জনগণ তা চায় এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাদের সমর্থন থাকে। এই দৃষ্টিভঙ্গি ক্ষমতাকে 'জন্মগত অধিকার'-এর আসন থেকে নামিয়ে এনে 'শর্তসাপেক্ষ দায়িত্ব'-এ পরিণত করে।

এই যুক্তিতে শাসক পৃথিবীতে আল্লাহর ছায়া নন, বরং তিনি একজন সাধারণ মানুষ, যার ভুল হওয়া সম্ভব এবং যিনি জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। এই ধারণাই একটি সুস্থ ও শক্তিশালী সমাজের ভিত্তি রচনা করে—এমন এক সমাজ যেখানে কেউ সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন।

ঐতিহাসিক নিয়তিবাদকে অস্বীকার ও নৈতিক পছন্দের ওপর জোর
রাজনীতির অন্যতম বড় বিপদ হলো 'ঐতিহাসিক নিয়তিবাদে' বিশ্বাস করা—এই ধারণা যে ইতিহাসের গতিপথ পূর্বনির্ধারিত এবং মানুষ নিছক একটি অনিবার্য পরিকল্পনার অনুসরণকারী। এরূপ বিশ্বাস প্রায়শই স্বৈরাচারের পক্ষে যুক্তি জোগায়, কারণ 'ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তার' নামে যেকোনো কাজই সমর্থনযোগ্য হয়ে ওঠে।

ইমাম আলী (আ.)-এর যুক্তিতে ইতিহাস হলো পরীক্ষা ও পছন্দের ক্ষেত্র, অনিবার্য নিয়তির নাট্যমঞ্চ নয়। তিনি তাঁর পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে জোর দেন যে, অতীত অধ্যয়নের উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষা গ্রহণ করা, ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করা নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের নৈতিক দায়িত্বকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দেয়।

রাজনীতিতে চূড়ান্ত সত্যের দাবির বিপদ
যখনই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেকে চূড়ান্ত সত্যের একচ্ছত্র অধিকারী বলে দাবি করে, তখনই অন্যদের বাদ দেওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, 'চূড়ান্ত সত্য বোঝার' এই দাবি ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি বিদ্বেষ এবং এমনকি সহিংসতার জন্ম দিতে পারে।

ইমাম আলী (আ.) খারিজিদের মোকাবিলায় তাদের সঙ্গে গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও, যতক্ষণ না তারা সহিংসতার পথ বেছে নেয়, ততক্ষণ তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সামাজিক উপস্থিতিতে বাধা দেননি। এই আচরণ প্রমাণ করে যে, বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বিমত—তা যত তীক্ষ্ণ ও কটুই হোক না কেন—দমন করার অজুহাত হতে পারে না। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও মানবিক বহুত্ববাদকে স্বীকার করারই লক্ষণ।

শাসকের সমালোচনা: অসম্মান নয়, বরং কর্তব্য
নাহজুল বালাগার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশগুলোর একটি হলো ইমাম আলী (আ.)-এর আত্মসমালোচনার স্পষ্ট আহ্বান। তিনি মানুষকে সত্য কথা বলতে বা ন্যায়সঙ্গত পরামর্শ দিতে সংকোচ না করার এবং শাসককে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে না করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন।

যে সমাজে শাসকের সমালোচনা অপরাধ বলে গণ্য হয়, সেখানে দুর্নীতি অনিবার্যভাবে বেড়ে ওঠে। কিন্তু যে সমাজে সমালোচনা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, সেখানে সংস্কারের সম্ভাবনা সব সময় বিরাজ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি ক্ষমতাকে পবিত্রতার আবরণ থেকে মুক্ত করে এবং তাকে জবাবদিহিতার কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে।

ন্যায়বিচার: আদর্শ মানুষের জন্য নয়, বাস্তব মানুষের জন্য
রাজনীতির আরেকটি সংকট হলো মহান আদর্শের নামে বাস্তব মানুষের ত্যাগ স্বীকার করা। কখনো কখনো সরকার একটি আদর্শ সমাজ গঠনের অজুহাতে জনগণের বাস্তব দুর্ভোগকে উপেক্ষা করে।

ইমাম আলী (আ.)-এর যুক্তিতে ন্যায়বিচার কোনো বৃহৎ স্লোগান হওয়ার আগে, তা হচ্ছে একজন নিপীড়িত ব্যক্তির অভিযোগের প্রতিকার, কোনো কর্মকর্তার অপকর্ম প্রতিরোধ এবং অভাবগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো। মালিক আশতারকে প্রদত্ত বিখ্যাত নির্দেশনায় সাধারণ স্লোগানের পরিবর্তে কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি, জনগণের অধিকার রক্ষা এবং দুর্বল ও অসহায় শ্রেণীর প্রতি মনোযোগ দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha