সোমবার ১৩ এপ্রিল ২০২৬ - ১৬:২০
হরমুজ প্রণালী অবরোধ: ওয়াশিংটনের ব্যয়বহুল জুয়া

ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালী অবরোধের পরিকল্পনা ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে বটে, কিন্তু তা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে— যা শেষমেষ একটি ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপে পরিণত হবে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিকভাবে হরমুজ প্রণালী অবরোধের ঘোষণা আসলে সেই ব্যয়বহুল ও ব্যর্থ ধারারই ধারাবাহিকতা, যা শুরু হয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্রে, আলোচনার টেবিলে এসে অচলাবস্থায় থেমে গিয়েছিল, এবং এখন এসে পড়েছে যুদ্ধ-শান্তির মাঝামাঝি এক অনিশ্চিত পর্যায়ে। এটি না পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ, না অস্ত্রবিরতি—বরং এক ধরনের “নিয়ন্ত্রিত চাপ”, যার ঝুঁকি কিন্তু নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে।

শুরুটা হয়েছিল তখন, যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রয়োগের ধারাবাহিক উদ্যোগ একের পর এক ব্যর্থ হয়। প্রথম ধাপে সীমিত সামরিক চাপ ও সংঘর্ষ ওয়াশিংটনের ঘোষিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়। দ্বিতীয় ধাপে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা—বিশেষ করে ইসলামাবাদ আলোচনা—কোনো বাস্তব ফল দেয়নি। এখন মনে হচ্ছে ওয়াশিংটনের সামনে তৃতীয় বিকল্প হিসেবে এসেছে নৌ অবরোধ, এবং হরমুজ প্রণালীকে ইরানের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা।

প্রথম দৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্ত কৌশলগত বলে মনে হতে পারে—কারণ হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট; এখানে যেকোনো বিঘ্ন বৈশ্বিক বাজারে তাৎক্ষণিক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু মূল সমস্যা এখানেই—এই হাতিয়ার যেমন ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে, তেমনই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধেও তা সহজেই বুমেরাং হয়ে ফিরে আসতে পারে।

নৌ অবরোধ কোনোভাবেই সীমিত ব্যয়ের সামরিক পদক্ষেপ নয়। এমন সংবেদনশীল জলসীমা নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি, বিপুল সম্পদ এবং দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনা বজায় রাখার প্রয়োজন। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক অনিশ্চিত ও জটিল পরিস্থিতিতে প্রবেশ করতে হবে, যার শেষ কোথায় তা অনুমান করা কঠিন। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, পারস্য উপসাগরের মতো জটিল অঞ্চলে এমন পদক্ষেপ সাধারণত দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সংঘাতে রূপ নেয়।

অন্যদিকে, এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য তেল পরিবহন এই প্রণালী দিয়ে হয়, এবং যেকোনো শঙ্কা বা বিঘ্ন দাম বাড়িয়ে দেবে। এই মূল্যবৃদ্ধি চীন, জাপান ও ইউরোপের মতো বড় ভোক্তা অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রেও এর প্রতিকূল প্রভাব পড়বে। ফলে ওয়াশিংটন নিজেই নিজের মিত্রদের জন্য অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করবে—যারা আবার এই পথে তাকে সহযোগিতা করার কথা।

এই কৌশলের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এর নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট দিক। হরমুজ প্রণালীতে নৌ অবরোধ দ্রুতই জাহাজ আটক, বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ বা সীমিত সশস্ত্র মুখোমুখি পরিস্থিতিতে রূপ নিতে পারে। এতে উত্তেজনা বাড়বে এবং বৃহত্তর সংঘাতের সম্ভাবনাও তৈরি হবে। অর্থাৎ হরমুজ প্রণালী একটি অর্থনৈতিক করিডোর থেকে স্থায়ী উত্তেজনাপূর্ণ সংকটবিন্দুতে পরিণত হতে পারে, যেখানে ছোট ঘটনাও বড় সঙ্কটে রূপ নেবে।

অন্যদিকে, ইরানও নিশ্চুপ থাকবে না। অভিজ্ঞতা বলে, চাপের মুখে তেহরান সবসময়ই পাল্টা ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করে। এই প্রতিক্রিয়া হতে পারে সীমিত নৌ প্রতিরোধ, কিংবা আঞ্চলিক অন্যান্য সংবেদনশীল রুটে উত্তেজনা ছড়িয়ে দেওয়া। ফলে হরমুজকে কেন্দ্র করে বাড়তি চাপ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিন্দুকেও সংকটে ফেলতে পারে।

এছাড়া আছে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির জটিলতা। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবস্থাপনায় নতুন কোনো নজির তৈরি করার চেষ্টা আন্তর্জাতিক বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলো এ ধরনের পরিবর্তনে প্রতিক্রিয়া দেখাবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইরানের সঙ্গে নয়, আরও বহু আন্তর্জাতিক পক্ষের সঙ্গে চ্যালেঞ্জে জড়িয়ে পড়বে।

শেষ পর্যন্ত, এই কৌশলের মূল দুর্বলতা হলো এর নিজস্ব দ্বন্দ্ব। যুক্তরাষ্ট্র চাপ বাড়িয়ে ইরানকে আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য করতে চাইছে, কিন্তু এই চাপই এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে যা আর কোনো পক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। অর্থাৎ সংকট ব্যবস্থাপনার হাতিয়ারই হয়ে উঠতে পারে সংকট আরো বৃদ্ধি করার উপাদান।

ধরা হয়, আলোচনা হলো যুদ্ধেরই আরেক রূপ। তবে শর্ত হলো—সংঘর্ষের ময়দানে নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে আলোচনা তার কার্যকারিতা হারায়। ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালী অবরোধের ঘোষণা ঠিক এমনই এক সীমারেখায় এসে দাঁড়িয়েছে—যেখানে অতিরিক্ত চাপ ছাড় আদায় দূরে থাক, পুরো পরিস্থিতিকেই অচল করে দিতে পারে।

এই কারণে পদক্ষেপটি শক্তি প্রদর্শনের চেয়ে বরং এক ধরনের অচলাবস্থার ইঙ্গিত। এমন একটি পথ যার ব্যয় সম্ভাব্য লাভের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে হরমুজ প্রণালী অবরোধ ইরানের ওপর চাপ না সৃষ্টি করে বরং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপরই অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে—একটি পথ যার শুরু ওয়াশিংটনের হাতে, কিন্তু সমাপ্তি তার নিয়ন্ত্রণে থাকে না।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha