বুধবার ১৫ এপ্রিল ২০২৬ - ১৪:৩০
হরমুজ প্রণালী: ইরানের কৌশলগত ক্ষমতা রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার

ইমাম সাদিক (আ.) বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক হরমুজ প্রণালীতে “স্মার্ট ও সক্রিয় ব্যবস্থাপনা”কে ইরানের কৌশলগত শক্তি ও প্রভাব বজায় রাখার একটি নির্ভরযোগ্য উপায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের তেল ও জ্বালানি থিংক ট্যাংকের উদ্যোগে আয়োজিত “হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ কৌশল ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ” শীর্ষক বৈজ্ঞানিক আলোচনায় ড. রুহুল-আমিন সাঈদি বলেন, প্রণালীতে চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ কোনো তাৎক্ষণিক বা ক্ষণস্থায়ী প্রতিক্রিয়া নয়; বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব বিস্তার ও জাতীয় ক্ষমতা প্রদর্শনের বৃহত্তর কৌশলগত কাঠামোর অংশ। কৌশলগত ভাষায় যা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সৃষ্টির ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত।

ভূরাজনীতির পুনরুত্থান ও ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব
তিনি উল্লেখ করেন, কয়েক বছর আগেও অনেক বিশ্লেষক মনে করতেন ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূরাজনীতির ভূমিকা ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। যোগাযোগ, গণমাধ্যম, পরিবহন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে সীমান্তহীন যোগাযোগের যুগে ভূগোলের গুরুত্ব কমছে—এমন ধারণা তখন বেশ প্রচলিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি, বিশেষত সাম্প্রতিক যুদ্ধ, দেখিয়েছে যে বাস্তবতার ময়দানে এই ধারণা টেকে না।

তার মতে, আজও সম্পদ সৃষ্টির মাধ্যম বহুবিধ—শেয়ারবাজার, পুঁজি প্রবাহ, তথ্যপ্রযুক্তি থেকে শুরু করে ডিজিটাল বাজার পর্যন্ত। তবু বিশ্ব রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভূগোলের ভূমিকা আগের তুলনায় আরও স্পষ্টভাবে ফিরে এসেছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও সীমান্তবিরোধের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে ভূখণ্ড ও সীমান্ত এখনো রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের কেন্দ্রে রয়েছে। ফলে “ভূগোলের অবসান”-ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

শক্তির দ্বন্দ্বে অর্থনৈতিক কাঠামোর রূপান্তর
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় শক্তিগুলো মুক্ত বাণিজ্যের আইন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO), বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি করেছে। নিষেধাজ্ঞা আরোপ অথবা কিছু দেশকে বিশেষ সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে তারা বহু দেশের অর্থনৈতিক গতিপথও নির্ধারণ করেছে। দ্রুত অগ্রগতির পরও চীনকে এখনও জি-৭-এর মতো প্রচলিত ক্ষমতার কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, এবং তাকে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগের মাধ্যমে ইরান একটি মধ্যম শক্তি হয়েও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে লক্ষণীয় প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে—যা আগে অনেকের হিসাব-নিকাশে গুরুত্ব পায়নি।

ইরান বহু বছর কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেছে এবং অনেক দেশই তার তেল কিনতে অনিচ্ছুক ছিল। কিন্তু স্বল্প সময়ের মধ্যেই প্রণালীতে নেওয়া পদক্ষেপের প্রভাব বৈশ্বিক বাজারে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শুধু তেল নয়, সার, খাদ্যপণ্যসহ অন্যান্য বাজারেও এর প্রভাব পড়ে। ফলে হরমুজ প্রণালী যে কেবল তেলের গলদ্বার নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিস্তৃত শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত—তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে।

প্রতিপক্ষের ভুল ধারণা ও বাস্তবতা
সাঈদি বলেন, প্রতিপক্ষের একটি বড় ভুল ধারণা ছিল যে ইরানের প্রণালী বন্ধের হুমকি কেবল রাজনৈতিক ‘ব্লাফ’। কিন্তু বাস্তবে ইরান অত্যন্ত সতর্ক, নিয়ন্ত্রিত ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে, যার ফলে তেল, কনডেনসেট ও এলএনজি’র দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং শেয়ারবাজারেও তার প্রভাব পড়ে।

তিনি বলেন, কিছু পক্ষ দাবি করেছিল ইরানের ভূখণ্ডে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে এবং অনেক দেশকে আরও কঠিন পরিস্থিতির সম্ভাব্যতা বিবেচনায় নিতে বাধ্য করেছে।

জাতীয় প্রভাব রক্ষার কার্যকর উপাদান
সাঈদির মতে, কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে হরমুজ প্রণালী ইরানের একটি গুরুতর প্রভাবক হাতিয়ার। সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে এর সুফল দীর্ঘমেয়াদে দেশকে শক্তিশালী অবস্থানে রাখতে পারে। তবে সামরিক বা ভূগোলগত উপাদান ছাড়াও আইনি কাঠামো ও চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রণালীতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে চুক্তি ও লাভবণ্টনের কাঠামো থাকে। কিন্তু হরমুজের ক্ষেত্রে ইরান ও ওমানের মধ্যে এমন সুস্পষ্ট কাঠামো নেই। তাই আইনি ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতিকে কাঙ্ক্ষিত দিকে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সমুদ্রপথে চলাচল সংক্রান্ত কনভেনশন
তিনি জানান, সমুদ্রপথে চলাচল সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি আন্তর্জাতিক কনভেনশন হলো ১৯৫৮ ও ১৯৮২ সালের কনভেনশন। ইরান ১৯৫৮ সালের কনভেনশনের সদস্য হলেও ১৯৮২ সালের সদস্য নয়। ১৯৫৮ কনভেনশনের অধীনে শান্তিকালে বিদেশি জাহাজ উপকূলীয় রাষ্ট্রের ক্ষতি না করলে তার জলসীমা অতিক্রম করতে পারে এবং উপকূলীয় রাষ্ট্র অযথা বাধা দিতে পারে না।

ইরানের অবস্থান হলো—এই অধিকার কেবল সে সব দেশকে দেওয়া হবে যারা চুক্তির স্বাক্ষরকারী। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫৮ কনভেনশনের সদস্য নয়, যদিও প্রথাগত আন্তর্জাতিক নিয়মের অনেকগুলোই তারা অনুসরণ করে।

১৯৮২ কনভেনশনে উপকূলীয় রাষ্ট্র চলাচলে বাধা দিতে পারে না, তবে নিরাপত্তা ও সেবার বিনিময়ে ফি নিতে পারে। মিশর ও তুরস্ক এই সুযোগ ব্যবহার করেছে। ইরানও ভবিষ্যতে চাইলে এ ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে এসব বিধান শান্তিকালের জন্য প্রণীত—এ বিষয়টি কৌশলগত বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ।

হরমুজ: একটি কৌশলগত তাস ও সুচিন্তিত ব্যবহার
সাঈদি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরান শত্রুপক্ষের জাহাজের চলাচল সীমিত করার আইনি ভিত্তি খুঁজে পেতে পারে এবং বাস্তবে ইরান এরই মধ্যে সতর্ক ও কৌশলগতভাবে তা প্রয়োগ করেছে।

তার মতে, দুইটি বিষয় ইরানের পক্ষে কাজ করে— 
• প্রথমত, ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা 
• দ্বিতীয়ত, সময়—যা অর্থনীতিতে চাপ বাড়িয়ে দাম বৃদ্ধি করতে পারে

শেষে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালী ইরানের ক্ষমতা প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ওমানের সঙ্গে সহযোগিতা ও যথাযথ আইনি উদ্যোগের মাধ্যমে এটি শান্তিকালেও দেশের জন্য কৌশলগত সম্পদ হিসেবে কার্যকর থাকবে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha