হাওজা নিউজ এজেন্সি: অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ইরানি কালচারাল কাউন্সেলর সৈয়দ রেজা মীরমোহাম্মদী আল্লামা। তিনি বলেন, আল্লামা ইকবালের চিন্তা ও দর্শন নিয়ে আয়োজিত এ ধরনের আলোচনা সভায় উপস্থিত হতে পেরে তিনি আনন্দিত। এ আয়োজনের জন্য আয়োজক খোমেনী ইহসান ও তার দলসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
প্রধান অতিথি বলেন, আল্লামা ইকবাল ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ব্যক্তিত্ব। তিনি একাধারে দার্শনিক, কবি ও রাজনীতিক ছিলেন এবং জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তার গভীর দক্ষতা ছিল। তিনি পাশ্চাত্যে দীর্ঘ সময় জীবনযাপন করেছেন, ফলে পশ্চিমা সমাজ ও চিন্তাধারাকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। মুসলিম সমাজের নানা সংকট তিনি উপলব্ধি করেছিলেন এবং সেখান থেকে উত্তরণের পথও তার লেখনী ও চিন্তায় তুলে ধরেছেন।
তিনি আরও বলেন, ইকবালের মাতৃভাষা উর্দু হলেও তার অধিকাংশ সাহিত্যকর্ম ফার্সি ভাষায় রচিত। তার উচ্চতর চিন্তা ও মুসলিম বিশ্বের মুক্তির প্রত্যাশা তাকে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং তার ভাবনা ছিল সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে কেন্দ্র করে।

সৈয়দ রেজা মীরমোহাম্মদী বলেন, ইকবালের কবিতা ও দর্শনের বয়স প্রায় একশ বছর হলেও তার চিন্তাধারা এখনও সময়োপযোগী। বর্তমান সময়েও তার দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, আল্লামা ইকবালের সাহিত্য ও দর্শনে কয়েকটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইসলামের প্রতি আহ্বান। ইকবাল ছিলেন ইসলামকেন্দ্রিক চিন্তার ধারক। তার রচনায় মুসলমানদের নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান রয়েছে এবং তিনি মুসলমানদের আত্মগঠন ও আত্মনির্ভরতার দিকে উৎসাহিত করেছেন।
তিনি বলেন, ইকবালের লেখনীতে ইসলামী পুনর্জাগরণের বার্তা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তার চিন্তায় মুসলমানরা এক উম্মাহ, এক জাতি—যাদের চিন্তার উৎস কুরআন। কুরআনের আলোকে মুসলিম ঐক্যের ধারণাকে তিনি তার কবিতা ও দর্শনে তুলে ধরেছেন। তিনি মুসলমানদেরকে নিজেদের পরিচয়ে দৃঢ় থাকতে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সামনে মাথা নত না করতে আহ্বান জানিয়েছেন।
ইকবালের কবিতায় আত্মপরিচয় ও আত্মবিশ্বাসের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে জাতি আল্লাহর ওপর ভরসা করে এবং নিজের শক্তি দিয়ে কাজ করে, আল্লাহ সেই জাতির ভাগ্য নিজ হাতে গ্রহণ করেন। তার মতে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদেরই উন্নতি দান করেন যারা নিজেদের জন্য নিজেরা কাজ করে।
বক্তব্যে তিনি বলেন, যারা পশ্চিমা সভ্যতাকে নিজেদের কেবলা বানিয়ে নিয়েছে, ইকবাল তাদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। পশ্চিমাদের অন্ধ অনুসরণ ও অনুকরণে যারা নিজেদের আত্মপরিচয় ভুলে যায়, তাদের প্রতি তিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন। ইকবাল তার কবিতায় ইউরোপকে ধর্মহীনতার কেন্দ্র হিসেবেও উল্লেখ করেছেন এবং পশ্চিমা বিশ্বকে এমন শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন যারা ভেড়ার চামড়া পরে হায়েনার মতো আচরণ করছে।
তিনি আরও বলেন, ইকবাল মানবজাতির অনেক সমস্যার মূল কারণ হিসেবে ধর্মহীনতা, নাস্তিকতা ও সেক্যুলারিজমকে চিহ্নিত করেছেন। তার কবিতায় মুসলমানদের উদ্দেশে বারবার জাগরণের আহ্বান রয়েছে—নিজের পায়ে দাঁড়ানো, আত্মপরিচয় সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার শিক্ষা দিয়েছেন তিনি।
প্রধান অতিথি বলেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইকবালের চিন্তা-দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। নতুন প্রজন্মকে ইকবালের চিন্তার সঙ্গে পরিচিত করানো প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আলোচনা সভায় সমসাময়িক বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, মুসলিম বিশ্বে চলমান নানা ঘটনার প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের ঐক্য ও আত্মচেতনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে আল্লামা ইকবালকে নিয়ে আরও বড় পরিসরে গবেষণা ও আলোচনা আয়োজন করা হবে এবং তার চিন্তাধারা নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
আপনার কমেন্ট