রবিবার ২৬ এপ্রিল ২০২৬ - ১২:৩৭
মুসলিম উম্মাহর কর্তব্য-ইরানের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর উপায়

ইরানের জনগণের ওপর নিষেধাজ্ঞা, নানা চাপ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র যখন চরমে, তখন মুসলিম উম্মাহর জন্য কর্তব্যবোধ আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। শুধু মৌখিক সমর্থন নয়, বাস্তব পদক্ষেপ-তথ্য প্রচার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, কূটনৈতিক সচেতনতা এবং আন্তরিক দোয়ার মাধ্যমেই সম্ভব ইরানের সাধারণ মানুষকে পাশে দাঁড়ানো। ‘হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা সাবির রেজা’-এর সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে হাওজা নিউজ এজেন্সি জানতে চেয়েছেন, কীভাবে প্রতিটি মুসলিম তাঁর অবস্থান থেকে এই কর্তব্য পালন করতে পারেন। জেনে নিন ইসলামী ভ্রাতৃত্বের প্রকৃত দায়িত্ব ও তার বাস্তবায়নের পাঁচটি কার্যকর পথ।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: আসসালামু আলাইকুম, মাওলানা সাহেব। আমাদের সময় দিয়ে সাক্ষাৎকারের আয়োজন করার জন্য আপনাকে অসংখ্য শুকরিয়া। আজ ইরানের জনগণের প্রতি মুসলিম উম্মাহর কর্তব্য নিয়ে কথা বলতে চাই। প্রথমেই জানতে চাই, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরানের জনগণের অবস্থান আমাদের কাছে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

মাওলানা সাবির রেজা: ওয়ালাইকুম আসসালাম, হাসান ভাই। প্রথমেই বলব, ইরান শুধু একটি ভৌগোলিক রাষ্ট্র নয়; এটি ইসলামী বিপ্লবের মাতৃভূমি, যেখানে আন্দোলনটি ছিল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর পতাকা তলে। ইরানের জনগণ বহু বছর ধরে নানা ষড়যন্ত্র, নিষেধাজ্ঞা ও বাহ্যিক চাপের মুখে রয়েছে। অথচ তারা তাদের স্বাধীনতা, আকিদা ও মর্যাদার পথে অটুট। ইসলাম ভ্রাতৃত্বের বাণী দেয়। যখন কোনো মুসলিম দেশ বা জনগোষ্ঠী জুলুমের শিকার হয়, তখন অন্যান্য মুসলমানের ওপর তাকে সাহায্য করা ফরজে কিফায়া হয়ে যায়। ইরানের জনসংখ্যা মূলতঃ মুসলিম, বিশেষ করে হযরত আলী (আ.)-এর অনুসারী—তাদের প্রতি সহানুভূতি শুধু মানবিক দিক থেকে নয়, ধর্মীয় দিক থেকেও জরুরি।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: মুসলিম উম্মাহর ব্যবহারিক কর্তব্য কী কী? শুধু মানসিক সমর্থন কি যথেষ্ট?

মাওলানা সাবির রেজা: না, শুধু মানসিক সমর্থন যথেষ্ট নয়। কর্তব্য বহুমাত্রিক। নিচে কয়েকটি বাস্তব উপায় তুলে ধরছি:

১. সঠিক তথ্য প্রচার: আজ মিডিয়া যুদ্ধ চলছে। ইরানকে নিয়ে অনেক ভুল তথ্য, এমনকি মিথ্যাচার ছড়ানো হয়। মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব হলো নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করে সামাজিক মাধ্যমে, মসজিদের বয়ানে, আলোচনায় ইরানের জনগণের প্রকৃত অবস্থা ও সংগ্রামের ন্যায্যতা তুলে ধরা।

২. অর্থনৈতিক সহযোগিতা: নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের সাধারণ মানুষ ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় পণ্যের অভাবে ভুগছে। বৈধ ও ইসলামী চ্যানেলের মাধ্যমে ত্রাণ, চিকিৎসা সহায়তা ও অর্থনৈতিক চাপ উপশমের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অনলাইন তহবিল সংগ্রহ কিংবা আন্তর্জাতিক এনজিওর মাধ্যমে এ কাজ করা সম্ভব।

৩. রাজনৈতিক পদক্ষেপ: মুসলিম দেশগুলোর সরকারগুলোর উচিত ইরানের বিরুদ্ধে অন্যায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে কণ্ঠস্বর তোলা, কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়া। জনসাধারণও গণস্বাক্ষর অভিযান, প্রতিবাদ সমাবেশ বা নিজ নিজ দেশের সংসদ সদস্যদের চিঠি লিখে এ ব্যাপারে চাপ বজায় রাখতে পারে।

৪. দোয়া ও আধ্যাত্মিক সমর্থন: অবহেলা করবেন না দোয়াকে। রাতে শেষ প্রহরে, নামাজের পর ইরানের মুসলিম ভাই-বোনদের জন্য সজল দোয়া করা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত। দোয়া শক্তি হ্রাস পায় না।

৫. জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধি: উম্মাহর আলেম ও শিক্ষার্থীরা ইরানের ইতিহাস, ইসলামী বিপ্লবের আদর্শ, শহীদ সোলাইমানির মতো ব্যক্তিত্বের ত্যাগ সম্যক জানবে এবং অন্যদের জানাবে। ভুল বুঝাবুঝি দূর করতে ইন্টারনেট, সেমিনার, কিতাব বিতরণের মাধ্যমে জ্ঞানের বিনিময় জরুরি।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: কিছু লোক বলে-‘আমরা নিজেদের দেশের সমস্যায় জর্জরিত, অন্যদের কীসের সাহায্য?’ আপনার কী মত?

মাওলানা সাবির রেজা: এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। ইসলাম একইসঙ্গে নিজের পরিবার ও প্রতিবেশীর দায়িত্ব নিতে বলে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে দূরের মুসলিম ভাইয়ের কষ্ট আমাদের উদাসীন থাকবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন: “মুসলিমরা একে অপরের ভাই; সুতরাং তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মিল স্থাপন করো” (সূরা হুজুরাত, আয়াত ১০)। নিজ দেশ ও উম্মাহর অন্যান্য অংশের মধ্যে ভারসাম্য রাখা সম্ভব। একটি ডালে পানি দিলে পুরো গাছ সজীব হয়। ইরানের অবস্থানের সঙ্গে আমাদের দেশের স্বার্থ পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একতা অর্জন করলে বিশ্ব মঞ্চে মুসলিম শক্তির ওজন বাড়ে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: অবশেষে, সাধারণ মানুষ কীভাবে আজই থেকে শুরু করতে পারে?

মাওলানা সাবির রেজা: আজ বৈঠক শেষে অন্তত একটি সত্য পোস্ট সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুন, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো মিথ্যা প্রচারণার প্রতিবাদে একটি টুইট করুন। নিজের মসজিদে ইমাম সাহেবকে বিষয়টি উত্থাপনের অনুরোধ জানান। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ইরানের জনগণের মর্যাদা রক্ষার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা করুন। আর সবচেয়ে সহজ কাজ হলো দুই রাকাত নামাজ পড়ে দোয়া করা-যেন আল্লাহ ইরানের জনগণকে ধৈর্য দেন এবং মুসলিম উম্মাহকে অন্ধ বিভাজন থেকে বাঁচান।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: মাওলানা সাহেব, আপনার মূল্যবান সময় ও জ্ঞানবান উপদেশের জন্য বহু শুকরিয়া। ইরানের জন্য উম্মাহর এই কর্তব্যবোধ যেন কাগজের বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বাস্তবে রূপ নেয়-আমরা সে দোয়াই করি।

মাওলানা সাবির রেজা: আপনাকেও ধন্যবাদ হাসান ভাই। শেষ বাণী: ইরানের জনগণ শুধু ইরানের নয়, গোটি মুসলিম বিশ্বের অহংকার। তাদের একলা ছেড়ে দিয়ে নিজেদের ইহলৌকিক লাভের কথা ভাবলে কিয়ামতে জবাব দিতে হবে। আসুন, সত্যিকার ইসলামী ভ্রাতৃত্বের পরিচয় দিই। আসসালামু আলাইকুম।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

শেষ টীকা: এই সাক্ষাৎকারটি উম্মাহর সচেতন ও দায়িত্বশীল অংশের কাজে লাগবে বলে আশা রাখি। ইরানের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিটি উপায়-ছোট হলেও-মাপের বাইরে বরকতধারী।

সাক্ষাত্কার গ্রহণ: হাসান রেজা

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha