বৃহস্পতিবার ৩০ এপ্রিল ২০২৬ - ১৪:১৭
সংস্কার ও স্থিতিশীলতা: উলামা ও চিন্তাবিদদের সংলাপের প্রয়োজনীয়তা

ঐতিহ্যের ভিত আর আধুনিকতার দরজা-দুইয়ের মিলনেই জন্ম নেয় টেকসই সমাধান। ইসলামী সমাজে ‘সংস্কার’ বলতে গেলে যেমন চরমপন্থার আশঙ্কা, তেমনি ‘স্থিতিশীলতা’ বললে স্থবিরতার শঙ্কা। এই জটিল দ্বান্দ্বিকতা থেকে উত্তরণের পথ কোথায়? সম্প্রতি ‘সংস্কার ও স্থিতিশীলতা: উলামা ও চিন্তাবিদদের সংলাপের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক এক সাক্ষাৎকারে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা সাবির রেজা খোলাখুলি কথা বলেছেন হাসান রেজার সঙ্গে। জেনে নিন, কেন ইসলামের মৌলনীতি অক্ষুণ্ণ রেখেই যুগোপযোগী সংস্কার সম্ভব, কেন চরমপন্থা ও স্থবিরতা—উভয়ই এড়ানোর একমাত্র পন্থা ধর্মীয় ও বুদ্ধিজীবী নেতৃত্বের নিয়মিত সংলাপ এবং এই সংলাপ বাস্তবায়নে কাদের কী কী বাধা পেরোতে হবে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: আসসালামু আলাইকুম, হুজুর। আমাদের সময়ের একটি জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আপনাকে সাক্ষাৎকারে পাওয়ায় আনন্দিত। প্রথমেই জানতে চাই, ‘সংস্কার’ ও ‘স্থিতিশীলতা’-এই দুই ধারণা কি পরস্পরবিরোধী? নাকি ইসলামের আলোকে এদের মধ্যে সমন্বয় সম্ভব?

মাওলানা সাবির রেজা: ওয়ালাইকুম আসসালাম। খুব ভালো প্রশ্ন করেছেন। সংস্কার ও স্থিতিশীলতা কখনোই পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরিপূরক। ইসলামের মূলনীতি হলো পরিবর্তন ও ধারাবাহিকতার মধ্যে ভারসাম্য। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে” (সূরা আর-রাদ, ১১)। এই আয়াত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠা করে। আবার অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম” (সূরা আল-মায়িদা, ৩)। অর্থাৎ মৌলিক নীতিগুলো চিরস্থায়ী; সংস্কার হবে সেগুলোর কাঠামোর মধ্যেই, বাইরে নয়। তাই সংস্কার ছাড়া স্থিতিশীলতা স্থবিরতা, আর স্থিতিশীলতা ছাড়া সংস্কার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: উলামা ও চিন্তাবিদদের মধ্যে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা কেন এত বেশি জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

মাওলানা সাবির রেজা: দেখুন, উলামা-ই-কেরাম কুরআন-সুন্নাহর রক্ষক ও ব্যাখ্যাকার। তাদের কাছে রয়েছে নবী-রাসূলের উত্তরাধিকার। অন্যদিকে চিন্তাবিদ, গবেষক ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী ব্যক্তিরা সমাজের বাস্তব চাহিদা, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি ও বিজ্ঞানের গতিপ্রকাহ বুঝতে পারেন। ইসলামের সার্বজনীন শিক্ষাকে যদি যুগোপযোগী কাঠামোতে উপস্থাপন করতে হয়-যেখানে মূলনীতি অক্ষুণ্ণ থাকে, কিন্তু প্রয়োগের পদ্ধতি আধুনিক হয়-সেখানে উভয় পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি। একা উলামা আধুনিক জটিলতা পুরোপুরি ধরা দিতে পারেন না, আবার একা চিন্তাবিদদের ইসলামের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ভিত্তি সম্পর্কে গভীর দৃষ্টি থাকে না। সংলাপের মাধ্যমেই গড়ে উঠবে গ্রহণযোগ্য সমাধান।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বলতে পারেন, কোথায় এই সংলাপের অভাব সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে?

মাওলানা সাবির রেজা: অভাবের অনেক উদাহরণ আছে। যেমন: ব্যাংকিং সুদ বা আধুনিক অর্থনীতির জটিল লেনদেন নিয়ে অনেক ফতওয়া দেখা যায়, যেখানে শরিয়তের গভীর বিশ্লেষণ বা বাস্তব অর্থনীতির চাহিদা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে হয় অতিরিক্ত কঠোরতা, না হয় প্রশ্রয়। অথবা শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্ম ও বিজ্ঞানকে আলাদা করে দেওয়ার প্রবণতা-ফলে একদিকে দ্বীনদার কিন্তু বিজ্ঞানমুখী নয়, অন্যদিকে বিজ্ঞানজ্ঞ কিন্তু ধর্মবিমুখ প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে। আবার রাষ্ট্রনীতিতে ইসলামি বিধান বাস্তবায়নের দাবি করা হলেও তার জন্য প্রয়োজনীয় আইন, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থার সংস্কার পরিকল্পনা প্রায় অনুপস্থিত। এই ফাঁকগুলো পূরণ করতে পারে শুধু উলামা ও চিন্তাবিদদের নিয়মিত, নিষ্ঠাবান সংলাপ।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: এই সংলাপ সফল করতে কী কী বাধা রয়েছে?

মাওলানা সাবির রেজা: বাধা অনেক। প্রথমত, অনেক উলামার মধ্যে আধুনিক জ্ঞান ও ভাষায় অনাগ্রহ বা অদক্ষতা; আবার অনেক চিন্তাবিদের মধ্যে ধর্মীয় মূলনীতি সম্পর্কে সীমিত জ্ঞান ও কিছুটা ঔদ্ধত্য। দ্বিতীয়ত, ভুল বোঝাবুঝি-কেউ মনে করেন সংস্কার মানেই প্রথাবিরোধী পরিবর্তন, আবার কেউ মনে করেন স্থিতিশীলতা মানেই কোনো পরিবর্তন নয়। তৃতীয়ত, অনেকে নিজ দল, মাদরাসা বা আইডিওলজিকে আঁকড়ে ধরে সংলাপ এড়িয়ে চলেন। চতুর্থত, মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতিরঞ্জিত বক্তৃতা সংলাপের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবও বাধা সৃষ্টি করে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: তাহলে এই সংলাপ বাস্তবায়নে করণীয় কী হতে পারে?

মাওলানা সাবির রেজা: কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি।

১. যৌথ ফোরাম গঠন: স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উলামা ও চিন্তাবিদদের নিয়ে নিয়মিত সংগঠন ও সম্মেলন।

২. উন্মুক্ত ও সম্মানজনক আলোচনার সংস্কৃতি: কোনো পক্ষ যেন অন্যের মতকে অগ্রাহ্য না করে, বরং দলিল ও যুক্তির ভিত্তিতে আলোচনা করে।

৩. শিক্ষায় সমন্বয়: মাদরাসার পাঠ্যসূচিতে আধুনিক বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান যুক্ত করা এবং সাধারণ শিক্ষায় সঠিক ইসলামি জ্ঞান ও নৈতিকতা সংযোজন।

৪. গবেষণা কেন্দ্র: সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ‘ইসলাম এন্ড কনটেম্পরারি স্টাডিজ’ জাতীয় কেন্দ্র স্থাপন।

৫. মিডিয়ায় সংলাপ-ভিত্তিক অনুষ্ঠান: বিতর্কের বদলে যেখানে উভয় পক্ষ সমাধান খোঁজে, সেভাবে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: শেষ প্রশ্ন-আপনার এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়িত হলে সমাজে কী ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করেন?

মাওলানা সাবির রেজা: আল্লাহ চাইলে, এটি সমাজে তিনটি বড় পরিবর্তন আনবে:

১. চরমপন্থার পতন: কেউ বলতে পারবে না যে ইসলাম পরিবর্তনহীন স্থবিরতা চায়, আবার কেউ ইসলামকে লঙ্ঘন করে ‘সংস্কার’-এর নামে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারবে না।

২. জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব: সমাজের ধর্মীয় ও বুদ্ধিজীবী নেতৃত্ব একসঙ্গে কাজ করায় সিদ্ধান্ত হবে যুক্তিপূর্ণ, কার্যকর ও গণগ্রহণযোগ্য।

৩. সমকালীন সমস্যার ইসলামি সমাধান: টেকসই উন্নয়ন, ন্যায়বিচার, নারী-শিশুর অধিকার, পরিবেশ রক্ষা-এসব ক্ষেত্রে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে মিলে বাস্তব সমাধান দেবে।

সংক্ষেপে, এটি মুসলিম উম্মাহর জন্য শান্তি, অগ্রগতি ও আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ খুলে দেবে। সংলাপের মাধ্যমে আমরা দেখাতে পারব ইসলাম কখনোই বিবেক ও জ্ঞানের বিরুদ্ধে নয়, বরং তারই পূর্ণতর প্রকাশ।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: হুজুর, সময় দিয়ে এত সুন্দর ও বিশ্লেষণধর্মী আলোচনার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।

মাওলানা সাবির রেজা: আপনাকেও ধন্যবাদ। এই সংলাপ কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং একটি উম্মাহর চাহিদা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দিন। আমিন।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: হাসান রেজা

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha