শুক্রবার ১ মে ২০২৬ - ০৭:৩৯
বেলায়াতে ফকিহর দলিল  
(নাকলি বা দালিলিক প্রমাণ – ২য় খণ্ড)

ফকীহের অভিভাবকত্ব (ولاية الفقيه) প্রমাণের জন্য ফকীহগণ যে বর্ণনাগুলোর উপর নির্ভর করেছেন, তার মধ্যে একটি হলো উমর ইবনে হানযালাহ (عمر بن حنظلة) বর্ণিত একটি রেওয়ায়েত।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইমাম মাহদী (আ.ফা.) সম্পর্কিত শিক্ষা ও জ্ঞান প্রচারের উদ্দেশ্যে “আদর্শ সমাজের দিকে” শিরোনামে ইমাম মাহদীবিষয়ক ধারাবাহিক আলোচনা উপস্থাপন করা হচ্ছে।

বেলায়াতে ফকিহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলো বিভিন্ন রেওয়ায়েত। আগের পর্বে ইমাম আসর (আ.)-এর একটি তাওকী‘ (توقیع) উল্লেখ করা হয়েছিল। এই পর্বে আরেকটি নাকলি (বর্ণনাভিত্তিক) দলিল আলোচনা করা হচ্ছে।

মাকবুলা-এ উমর ইবনে হানযালাহ
বেলায়াতে ফকিহ প্রমাণের জন্য যে রেওয়ায়েতগুলো উদ্ধৃত করা হয়, তার মধ্যে একটি হলো উমর ইবনে হানযালাহ বর্ণিত এই হাদীস।

তিনি বলেন, আমি ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-কে জিজ্ঞেস করলাম: “যদি দুইজন শিয়া ব্যক্তি ঋণ বা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে, তবে কি তারা তাদের বিরোধ মীমাংসার জন্য কোনো [অন্যায়কারী] শাসক বা তার নিযুক্ত বিচারকের কাছে যেতে পারবে?”

ইমাম সাদিক (আ.) বললেন, “যে ব্যক্তি বিচার পাওয়ার জন্য তাদের কাছে যায়, সে মূলত তাগূতের কাছে বিচার চেয়েছে এবং তাকে বিচারক হিসেবে গ্রহণ করেছে। আর তার (সেই শাসক বা বিচারকের) দেওয়া রায় অনুযায়ী যা গ্রহণ করা হয় তা হারাম—যদিও প্রকৃতপক্ষে অধিকার তারই হয়ে থাকে। কারণ সে তা গ্রহণ করেছে তাগূতের রায়ের মাধ্যমে; অর্থাৎ সেই ব্যক্তির মাধ্যমে, যার প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশ করার নির্দেশ আল্লাহ দিয়েছেন। যেমন পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে—

یُرِیدُونَ أَنْ یتَحَاکَمُوا إِلَی الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ یَکْفُرُوا بِهِ.

(সূরা নিসা- ৬০)

[কিছু লোক] তাদের বিষয়সমূহের বিচার তাগূতের কাছে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা তাগূতকে অস্বীকার করে।”

উমর ইবনে হানযালাহ বলেন, যখন দেখলাম ইমাম এত কঠোরভাবে শিয়াদের তাগূতের শাসক ও তার বিচারকের কাছে যাওয়াকে নিন্দা ও নিষিদ্ধ করলেন, তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তাহলে শিয়ারা এমন পরিস্থিতিতে কী করবে?”

ইমাম (আ.) বললেন,

یَنْظُرَانِ إِلَی مَنْ کَانَ مِنْکُمْ مِمَّنْ قَدْ رَوَی حَدِیثَنَا وَ نَظَرَ فِی حَلَالِنَا وَ حَرَامِنَا وَ عَرَفَ أَحْکَامَنَا فَلْیَرْضَوْا بِهِ حَکَماً فَإِنِّی قَدْ جَعَلْتُهُ عَلَیْکُمْ حَاکِماً فَإِذَا حَکَمَ بِحُکْمِنَا فَلَمْ یَقْبَلْهُ مِنْهُ فَإِنَّمَا اسْتَخَفَّ بِحُکْمِ اللَّهِ وَ عَلَیْنَا رَدَّ وَ الرَّادُّ عَلَیْنَا الرَّادُّ عَلَی اللَّهِ وَ هُوَ عَلَی حَدِّ الشِّرْکِ بِاللَّهِ.

(আল-কাফি، খন্ড- ১، পৃষ্ঠা- ৬৭)

[যখন দুই শিয়া কোনো বিষয়ে মতবিরোধে লিপ্ত হয়] তখন তারা দেখবে—তোমাদের মধ্য থেকে সেই ব্যক্তিকে, যে আমাদের হাদীস বর্ণনা করে, আমাদের হালাল-হারাম বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখে এবং আমাদের (আহলে বাইত)-এর বিধানসমূহকে চেনে—তাকে তারা নিজেদের মধ্যে বিচারক হিসেবে গ্রহণ করবে। কেননা আমি তাকে তোমাদের উপর “হাকিম” হিসেবে নিযুক্ত করেছি। অতএব যখন সে আমাদের বিধান অনুযায়ী রায় দেয় এবং তা গ্রহণ করা না হয়, তবে তা আল্লাহর বিধানকে তুচ্ছজ্ঞান করা এবং আমাদের রায় প্রত্যাখ্যান করার শামিল। আর যে আমাদের রায় প্রত্যাখ্যান করে, সে আল্লাহর রায়ই প্রত্যাখ্যান করে—এবং তা আল্লাহর সাথে শরিক করার পর্যায়ের সমতুল্য।

এই মর্যাদাপূর্ণ রেওয়ায়েতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখিত হয়েছে—

১. বিরোধ বা বিবাদের ক্ষেত্রে তাগূতের শাসক বা তার নিযুক্ত বিচারকের কাছে যাওয়া বৈধ নয়; কারণ কুরআন ও সুন্নাহ তা হারাম ঘোষণা করেছে।

২. ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন: এমন ক্ষেত্রে তাদের উচিত এমন ব্যক্তির কাছে যাওয়া, যে আমাদের হাদীস বর্ণনা করে এবং আমাদের বিধান সম্পর্কে অবগত। স্পষ্টতই ফকীহ ও মুজতাহিদ ছাড়া আর কেউ আহলে বাইতের বর্ণিত বিধানসমূহ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান রাখে না।

৩. এই রেওয়ায়েতে প্রশ্ন ছিল দুই পক্ষের মধ্যকার বিরোধ সম্পর্কে; কিন্তু ইমাম সাদিক (আ.) শেষাংশে একটি সার্বজনীন নীতি ঘোষণা করেন— 

فَإِنِّی قَدْ جَعَلْتُهُ عَلَیْکُمْ حَاکِماً

অর্থাৎ তিনি ফকীহকে শিয়াদের উপর “হাকিম” হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। “হাকিম” বলতে বোঝায় এমন ব্যক্তি, যার শাসন ও কর্তৃত্ব রয়েছে এবং যিনি তাদের বিষয়সমূহের তত্ত্বাবধান ও পরিচালনা করেন।

৪. ইমাম (আ.) আরও বলেন যে, যখন এই হাকিম—যিনি ইমামের পক্ষ থেকে নিযুক্ত—কোনো রায় প্রদান করেন, তখন তা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। যদি তা প্রত্যাখ্যান করা হয়, তবে তা ইমামের রায় প্রত্যাখ্যান করার শামিল; আর ইমামের রায় প্রত্যাখ্যান করা মানে আল্লাহর রায় প্রত্যাখ্যান করা। এই সাধারণ বক্তব্যের মাধ্যমে ইমাম ফকীহকে মানুষের উপর প্রামাণ্য কর্তৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন—ব্যক্তিগত ও সামাজিক, বিচারিক ও অবিচারিক—সব ক্ষেত্রেই।

প্রখ্যাত শিয়া ফকীহ মুহাম্মদ হাসান নাজাফি, যিনি সাহেব-ই জাওয়াহির (মৃত্যু: ১২৬৬ হিজরি) নামে পরিচিত, বলেন, ফকীহদের সাধারণ নিয়োগ (نصب عام) সব বিষয়ে প্রযোজ্য। অর্থাৎ ইমামের জন্য যা কিছু প্রযোজ্য, ফকীহের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য—যেমন ইমামের এই উক্তি: 

فَإِنِّی قَدْ جَعَلْتُهُ عَلَیْکُمْ حَاکِماً

এর দাবিই হলো—ফকীহ বিচারকার্য ও অন্যান্য বিষয়, যেমন বিভিন্ন প্রকার অভিভাবকত্ব ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কর্তৃত্বশীল। যেমন ইমাম মাহদী (আ.)-এর তাওকী‘তে এসেছে: 

فَإِنَّهُمْ حُجَّتِی عَلَیْکُمْ. 

এর অর্থ হলো—যেসব বিষয়ে আমি তোমাদের উপর প্রমাণ (হুজ্জাত), সেসব বিষয়েই ফকীহগণ তোমাদের উপর প্রমাণ—যতক্ষণ না কোনো বিশেষ দলিল দ্বারা কোনো বিষয় ব্যতিক্রম করা হয়। 
(জাওয়াহিরুল কালাম, খণ্ড ২১, পৃ. ৩৯৬–৩৯৭)

মহান ফকীহদের শিক্ষক, মরহুম শায়খ আনসারি (মৃত্যু: ১২৮১ হিজরি) বলেন, উমর ইবনে হানযালাহর মাকবুলা রেওয়ায়েতে “হাকিম” শব্দ থেকে যে অর্থ বোঝা যায় তা হলো সম্পূর্ণ কর্তৃত্বশালী শাসক। অর্থাৎ যখন ইমাম বলেছেন,

فَإِنِّی قَدْ جَعَلْتُهُ عَلَیْکُمْ حَاکِماً 

এটি ঠিক সেই রকম, যেমন কোনো শাসক শহরের জনগণকে বলছে, “আমি অমুক ব্যক্তিকে তোমাদের উপর শাসক নিযুক্ত করেছি।” এই ধরনের বাক্য থেকে বোঝা যায় যে শাসক তাকে শহরের নাগরিকদের সামগ্রিক ও আংশিক—সব ধরনের প্রশাসনিক বিষয়ে কর্তৃত্ব প্রদান করেছেন। 
(ক্বাজা ও শাহাদাত, শায়খ আনসারি, নং ২২, পৃ. ৮–৯)

উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, ফকীহ তার অভিভাবকত্ব ইমাম মাসূমের কাছ থেকেই গ্রহণ করেন। কারণ ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর তাওকী‘ এবং উমর ইবনে হানযালাহর মাকবুলা—উভয় ক্ষেত্রেই ইমামই ফকীহকে মানুষের উপর হুজ্জাত ও শাসক হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। অতএব ফকীহ ইমামের নিয়োগ ও নির্দেশের ভিত্তিতেই মানুষের উপর কর্তৃত্ব লাভ করেন।

হ্যাঁ—ফকীহের এই অভিভাবকত্ব সমাজে কার্যকর হওয়া এবং বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হওয়া মানুষের গ্রহণযোগ্যতা ও সমর্থনের উপর নির্ভর করে।

এই আলোচনা অব্যাহত থাকবে…

উৎস: ‘নেগিনে অফারিনেশ’ থেকে (সামান্য সম্পাদনাসহ) গৃহীত।
___________________________________________

১. উমর ইবনে হানযালাহ ইমাম বাকির ও ইমাম সাদিক (আ.)-এর সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত এবং তিনি একজন প্রসিদ্ধ রাবি। তার কাছ থেকে জরারা, হিশাম ইবনে সালিম, সাফওয়ান ইবনে ইয়াহইয়া প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা হাদীস বর্ণনা করেছেন। “মাকবুলা” বলতে এমন রেওয়ায়েত বোঝায় যা আলেমদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে।

২. এই মহান ফকীহ শিয়া ফিকহের অন্যতম স্তম্ভ। তিনি ৪৩ খণ্ডে বিশাল ফিকহগ্রন্থ জাওয়াহিরুল কালাম রচনা করেছেন, যা দীর্ঘদিন ধরে হাওযা ইলমিয়ার শিয়া ফকীহদের একটি প্রধান রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha