বুধবার ১৩ মে ২০২৬ - ০০:১৩
শিয়া সংস্কৃতিতে ‘প্রতীক্ষা বা ইন্তেজার’-এর মাহাত্ম্য (চতুর্থ পর্ব)

ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর আবির্ভাবের প্রতীক্ষা কখনোই দায়িত্ব রহিত করে না এবং কর্ম বা আমলে বিলম্বের কোনো অনুমতি দেয় না। দ্বীনি দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য ও উদাসীনতা কোনোভাবেই বৈধ নয়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, “আদর্শ সমাজের দিকে” শীর্ষক মাহদাভিয়াত বিষয়ক এই ধারাবাহিক আলোচনা ইমাম যামান (আজ্জাল্লাহু তা‘আলা ফারাজাহুশ শরীফ)-সংক্রান্ত শিক্ষা ও জ্ঞান প্রচারের উদ্দেশ্যে সম্মানিত পাঠকমণ্ডলীর জন্য উপস্থাপিত হচ্ছে।

যদিও ‘ইন্তেজার’-এর প্রকৃত অর্থ সুস্পষ্ট ও নির্ধারিত, তথাপি এ বিষয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপিত হয়েছে। এসব ব্যাখ্যার একটি বড় অংশ চিন্তাবিদ ও আলেমদের বিশ্লেষণভিত্তিক; আর অন্য অংশটি কিছু শিয়ার ব্যক্তিগত উপলব্ধির প্রতিফলন।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধান দুটি দৃষ্টিভঙ্গি হলো—
১. সঠিক ও গঠনমূলক প্রতীক্ষা
গঠনমূলক, প্রেরণাদায়ক ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টিকারী প্রতীক্ষাই হলো প্রকৃত ‘ইন্তেজার’, যা রেওয়ায়াতে “সর্বোত্তম ইবাদত” এবং “নবী করিম (সা.)-এর উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ” হিসেবে অভিহিত হয়েছে।

মরহুম মুহাম্মদ রেজা মুযাফ্‌ফর (রহ.) সংক্ষিপ্ত অথচ সারগর্ভ ভাষায় ‘ইন্তেজার’-এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন:
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)—যিনি প্রকৃত সংস্কারক ও ঐশী মুক্তিদাতা—তাঁর আবির্ভাবের প্রতীক্ষা এই অর্থে নয় যে, মুসলমানরা নিজেদের দ্বীনি দায়িত্বে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে এবং যেসব বিষয় তাদের ওপর ফরজ—যেমন: সত্যের সহায়তা, দ্বীনের বিধানসমূহকে জীবন্ত রাখা, জিহাদ, আমর বিল-মা‘রূফ ও নাহি আনিল-মুনকার—এসব থেকে বিরত থাকবে এই আশায় যে, কায়েমে আলে মুহাম্মদ (আ.ফা.) এসে সবকিছু সংশোধন করবেন।

বরং প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য হলো—নিজেকে ইসলামের বিধান পালনে বাধ্য মনে করা, সঠিক পথে দ্বীনকে জানার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ‘আমর বিল-মা‘রূফ’ ও ‘নাহি আনিল-মুনকার’ অব্যাহত রাখা।

যেমন মহানবী (সা.) বলেছেন:

کُلُّکُمْ رَاعٍ وَ کُلُّکُمْ مَسْؤُولٌ عَنْ رَعِیَّتِهِ

“তোমাদের প্রত্যেকেই একজন অভিভাবক, এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার অধীনদের ব্যাপারে জবাবদিহি করবে।” [বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৭২, পৃষ্ঠা ৩৮]

এই ভিত্তিতে, কোনো মুসলমান ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর আবির্ভাবের প্রতীক্ষার অজুহাতে নিজের নিশ্চিত ও অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে পারে না। কারণ, ‘ইন্তেজার’ কখনোই দায়িত্ব রহিত করে না এবং কর্ম বিলম্বের অনুমতি দেয় না। দ্বীনি কর্তব্যে শৈথিল্য ও উদাসীনতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। [আকায়েদুল ইমামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ১১৮]

সংক্ষেপে, প্রকৃত ‘ইন্তেজার’-এর সংস্কৃতি তিনটি মৌলিক স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত—
ক. বর্তমান অবস্থার প্রতি অসন্তোষ;
খ. উত্তম ভবিষ্যতের প্রতি দৃঢ় আশা;
গ. বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে কাঙ্ক্ষিত অবস্থায় পৌঁছাতে সক্রিয় প্রচেষ্টা।

২. ভুল ও ধ্বংসাত্মক প্রতীক্ষা
ধ্বংসাত্মক ও স্থবিরতাসৃষ্টিকারী প্রতীক্ষা, যা বাস্তবে এক ধরনের ‘ইবাহিয়াত’ (অবাধতা/নিয়মশিথিলতা), সর্বদা দ্বীনের মহাপুরুষদের নিকট নিন্দিত হয়েছে এবং তাঁরা আহলে বাইত (আ.)-এর অনুসারীদের এ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

শহীদ আল্লামা মুতাহ্‌হারী (রহ.) এ সম্পর্কে লিখেছেন:[এই ধরনের প্রতীক্ষা] মাহদিয়াত ও মাহদী-এ মওউদের (আ.ফা.) বিপ্লব সম্পর্কে একটি উপরিভাগীয় ও ভ্রান্ত ধারণা, যা একে কেবল বিস্ফোরণধর্মী ঘটনায় সীমাবদ্ধ করে। অর্থাৎ, এটি মনে করে—সমাজে যখন অত্যাচার, বৈষম্য, দমন-পীড়ন ও অনাচার চরমভাবে বিস্তার লাভ করবে, তখনই সেই বিপ্লব সংঘটিত হবে।

এই ধরনের ব্যাখ্যা—যা ইসলামী বিধান ও নীতিমালা স্থগিত করার দিকে নিয়ে যায় এবং একপ্রকার ‘ইবাহিয়াত’-এ রূপ নেয়—তা কোনোভাবেই ইসলামী ও কুরআনিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। [কিয়াম ও ইনকিলাব-এ মাহদী (আ.), পৃষ্ঠা ৫৪]

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা (রহ.)-ও তাঁর মূল্যবান বক্তব্যে এ ধরনের ভ্রান্ত ধারণার তীব্র সমালোচনা করেছেন।
[সহীফা-এ নূর, খণ্ড ২১]

অতএব, একজন প্রকৃত ‘মুনতাজির’ (অপেক্ষাকারী) কখনোই ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর আবির্ভাব ও বিপ্লবের ক্ষেত্রে দর্শকের ভূমিকায় থাকতে পারে না; বরং তাকে সক্রিয়, সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

এই আলোচনা অব্যাহত থাকবে…

উৎস:  ‘দারসনামা-এ মাহদাভিয়াত’, খোদা-মুরাদ সুলাইমান; সামান্য সম্পাদনাসহ।

টীকা:
(১) মুহাম্মদ রেজা মুযাফ্‌ফর (১৩২২–১৩৮৩ হিজরি): প্রসিদ্ধ মুজতাহিদ, ফকীহ, উসূলবিদ, মুতাকাল্লিম ও দার্শনিক; ফিকহ, উসূল, মানতিক ও আকীদাহ বিষয়ে বিশিষ্ট শিয়া গবেষক।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha