হাওজা নিউজ এজেন্সি: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের প্রায় প্রতিটি স্তরকে প্রভাবিত করছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানে এই বৈঠকে যাচ্ছেন, আর এর বড় কারণ ইরান যুদ্ধ। এই সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত করেছে এবং ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক মিত্রতাকেও চাপে ফেলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে চীন তার প্রভাব খাটিয়ে তেহরানকে এমন একটি সমঝোতার পথে আনুক, যাতে যুদ্ধের অবসান ঘটে এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হয়। ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং ইরানি তেলের ওপর নির্ভরতার কারণে বেইজিংয়ের প্রভাবকে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।
বিচার-বিশ্লেষণে পার্থক্য, আস্থার সংকট
তবে চীনের হিসাব ভিন্ন। শি জিনপিংও সংঘাতের অবসান চান, কিন্তু তার মূল লক্ষ্য চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। জার্নালের বিশ্লেষকদের মতে, শি এই সংকটকে এমন এক সুযোগ হিসেবে দেখছেন, যার মাধ্যমে তিনি নিজেকে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা প্রশমনে সক্ষম একজন বৈশ্বিক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তুলে ধরতে পারেন—ঠিক সেই সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রকে ক্লান্ত ও কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছে।
পত্রিকাটি বলছে, বৈঠকটি এমন এক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে দুই পক্ষের মধ্যে গভীর কৌশলগত অবিশ্বাস কাজ করছে। ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে ইরান ও রাশিয়াকে সহায়তার অভিযোগ তুলতে পারেন। এর মধ্যে চীনা কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে ইরানকে স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ইতোমধ্যে চারটি চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
অন্যদিকে, বৈঠকের ঠিক আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে স্বাগত জানিয়ে বেইজিং স্পষ্ট করেছে, মার্কিন চাপ সত্ত্বেও তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে তারা আগ্রহী।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সম্পাদকীয় বোর্ড সতর্ক করেছে, এই বৈঠকের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ঝুঁকি ইরান নয়; বরং আশঙ্কা হলো, কূটনৈতিক সাফল্যের আশায় ট্রাম্প তাইওয়ানের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে ছাড় দিতে পারেন। জার্নালের মতে, শি হয়তো ইরান ও বাণিজ্যে সহযোগিতার বিনিময়ে তাইপের প্রতি ওয়াশিংটনের অবস্থান নরম করার চেষ্টা করবেন।
পত্রিকাটি আরও সতর্ক করেছে, বেইজিংয়ের সঙ্গে যে কোনো কূটনৈতিক সমঝোতা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের এক কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বীকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ও বিরল খনিজ সম্পদে চীনের প্রবেশাধিকার নিয়েও ওয়াশিংটনে উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রতিবেদনটির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো—ট্রাম্পের ব্যক্তিনির্ভর কূটনীতি ও সরাসরি সমঝোতার কৌশল কি এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে? জার্নালের উপসংহার, শি জিনপিং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে এগোচ্ছেন, যার লক্ষ্য ধীরে ধীরে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করা।
আমেরিকান ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা
দ্য গার্ডিয়ান আরও কঠোর মূল্যায়ন দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিষয়ক লেখক সাইমন টিসডল তার কলামে লিখেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচন করেছে, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।
তার ভাষ্য, ট্রাম্পের চেয়ে শির দরকার কম; বরং ট্রাম্পই এখন শির সহায়তা বেশি চান। কারণ, ইরানের ওপর চীনের প্রভাব এবং তেহরানের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক হিসেবে বেইজিং ভবিষ্যৎ সমঝোতায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া থেকে সামরিক মনোযোগ সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে বেশি সম্পদ নিয়োজিত করতে বাধ্য হয়েছে, ফলে ইন্দো-প্যাসিফিকে তাদের প্রতিরোধক্ষমতাও কিছুটা দুর্বল হয়েছে।
গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, শি ট্রাম্পের রাজনৈতিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাইওয়ান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কমানোর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। লেখাটিতে এই বৈঠককে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা কমছে এবং চীন নিজেকে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলার রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করছে।
প্রবন্ধটিতে সংঘাতের অর্থনৈতিক দিকও গুরুত্ব পেয়েছে। উচ্চ তেলের দাম, বৈশ্বিক নৌপথে বিঘ্ন এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপ বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে, যার প্রভাব চীনও এড়াতে পারছে না। ফলে বেইজিং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতা চাইলেও, সরাসরি সামরিক জড়িয়ে পড়া এড়াতে চায়।
সব মিলিয়ে, তিনটি বিশ্লেষণই এক জায়গায় এসে মিলে—ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র-চীন শীর্ষ বৈঠককে শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং এটিকে বৈশ্বিক ক্ষমতা, প্রভাব ও নেতৃত্বের বৃহত্তর পরীক্ষায় পরিণত করেছে। ট্রাম্প বেইজিংয়ে যাচ্ছেন এমন এক সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে, যা তাকে অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল করেছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে অস্থির করেছে। অন্যদিকে, শি জিনপিং তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানে আছেন এবং ওয়াশিংটনের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে চীনের কূটনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত করার সুযোগ দেখছেন।
আপনার কমেন্ট