শনিবার ১৬ মে ২০২৬ - ০৮:৫৪
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর জন্য প্রতীক্ষাকারীদের বিশেষ দায়িত্ব ও কর্তব্য

বর্তমান সময়ে এমন মানুষের অভাব নেই, যারা বিভিন্ন কারণে গায়েব বা দৃষ্টির আড়ালে থাকা ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর প্রতি বিশ্বাস ও তাঁর স্মরণকে সহ্য করতে পারে না এবং এ পথে নানাবিধ অপচেষ্টা চালায়। অথচ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—বিপদ ও দুর্দশার সময় ধৈর্য ধারণ করা। তাই এই যুগে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আমাদের উচিত এসব কষ্ট ও প্রতিকূলতার মুখে আরও বেশি ধৈর্যশীল থাকা।

হাওজা নিউজ এজেন্সি'র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘আদর্শ সমাজের দিকে’ শিরোনামে মাহদাভিয়াত বিষয়ক এই ধারাবাহিক আলোচনাটি ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা ও জ্ঞান প্রচারের উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করা হচ্ছে:

ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর জন্য প্রতীক্ষাকারীদের বিশেষ দায়িত্ব কী?
বিশেষ দায়িত্ব বলতে সেই সব কর্তব্যকে বোঝায়, যা সরাসরি ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর গায়বাতের যুগের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন—
১. ইমামের বন্ধুদের প্রতি ভালোবাসা ও শত্রুদের প্রতি বিরাগ
অসংখ্য রেওয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.) আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁদের শত্রুদের প্রতি বিরাগ পোষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন—যা সব যুগের জন্যই প্রযোজ্য। তবে কিছু বর্ণনায় বিশেষভাবে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর বন্ধুদের ভালোবাসা এবং শত্রুদের প্রতি বিরাগের কথা বলা হয়েছে।

ইমাম বাকির (আ.) রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেন—

طُوبی لِمَنْ أَدْرَكَ قائِمَ أَهْلِ بَیْتِی وَهُوَ یَأْتَمُّ بِهِ فِی غَیْبَتِهِ قَبْلَ قِیَامِهِ وَیَتَوَلَّى أَوْلِیَاءَهُ وَیُعَادِی أَعْدَاءَهُ، ذٰلِكَ مِنْ رُفَقَائِی وَذَوِی مَوَدَّتِی وَأَكْرَمُ أُمَّتِی عَلَى یَوْمِ الْقِیَامَةِ.

ধন্য সে ব্যক্তি, যে আমার আহলে বাইতের কায়েমকে উপলব্ধি করবে এবং তাঁর কিয়ামের পূর্বে, গায়বাত অবস্থায় তাঁর অনুসারী থাকবে; তাঁর বন্ধুদের ভালোবাসবে এবং শত্রুদের শত্রু মনে করবে। কিয়ামতের দিনে সে আমার সঙ্গী ও প্রিয়জনদের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং আমার উম্মতের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত হবে। [কামালুদ্দীন, খণ্ড ১, পৃ. ২৮৬]

২. গায়বাতের কষ্টসহিষ্ণুতা
বর্তমান যুগে অনেকে গায়েব ইমামের প্রতি বিশ্বাসকে অস্বীকার করে বা তা সহ্য করতে পারে না। এ অবস্থায় একজন মুমিনের প্রধান কর্তব্য হলো ধৈর্য ধারণ করা।

ইমাম সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

سَیَأْتِی قَوْمٌ مِنْ بَعْدِكُمْ الرَّجُلُ الْوَاحِدُ مِنْهُمْ لَهُ أَجْرُ خَمْسِینَ مِنْكُمْ... فَقَالَ: إِنَّكُمْ لَوْ تَحَمَّلْتُمْ مَا حُمِّلُوا لَمْ تَصْبِرُوا صَبْرَهُمْ.

“তোমাদের পর এমন এক যুগ আসবে, যখন তাদের একজন ব্যক্তির সওয়াব তোমাদের পঞ্চাশ জনের সমান হবে।”
সাহাবীরা বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তো আপনার সঙ্গে বদর, উহুদ ও হুনায়নে যুদ্ধ করেছি এবং আমাদের সম্পর্কে কুরআন নাজিল হয়েছে!”
তিনি বললেন: “তোমরা যদি তাদের মতো পরীক্ষার সম্মুখীন হতে, তাদের মতো ধৈর্য ধারণ করতে পারতে না।” [শাইখ তূসি, আল-গায়েবা, পৃ. ৪৫৬]

ইমাম হুসাইন (আ.) বলেন—

 إِنَّ الصَّابِرَ فِی غَیْبَتِهِ عَلَى الْأَذَى وَالتَّكْذِیبِ بِمَنْزِلَةِ الْمُجَاهِدِ بِالسَّیْفِ بَیْنَ یَدَیْ رَسُولِ اللَّهِ صلی‌الله‌علیه‌وآله‌وسلم.

গায়বাত অবস্থায় কষ্ট ও অস্বীকৃতির ওপর ধৈর্যধারণকারী ব্যক্তি সেই মুজাহিদের মতো, যে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে তলোয়ার হাতে যুদ্ধ করে।”
[কামালুদ্দীন, খণ্ড ১, পৃ. ৩১৭]

৩. ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর ফারাজের জন্য দোয়া
ইসলামে দোয়া ও ইবাদতের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। মানবজাতির সার্বিক মুক্তি ও কল্যাণের অন্যতম মাধ্যম হলো দোয়া—বিশেষ করে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর আবির্ভাবের জন্য দোয়া।

তাওকী‘ শরীফে এসেছে—

وَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ بِتَعْجِیلِ الْفَرَجِ
“তোমরা ফারাজের ত্বরান্বিত হওয়ার জন্য অধিক পরিমাণে দোয়া কর।” [কামালুদ্দীন, খণ্ড ২, পৃ. ৪৮৩]

মরহুম আয়াতুল্লাহ আলী পাহলাভানি তেহরানি (আলী সা‘আদাত-পরভার) এ প্রসঙ্গে বলেন—
দোয়ার উদ্দেশ্য কেবল মুখে উচ্চারণ নয়; বরং এর প্রকৃত লক্ষ্য হলো অন্তরের গভীর মনোযোগ ও উপলব্ধি। গায়বাতগায়বাত যুগে দ্বীনদারিত্ব ও সঠিক আকীদা রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন—যা কেবল দৃঢ় ঈমান ও অবিচল ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব।

৪. সর্বদা প্রস্তুত থাকা
গায়বাতের যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো সর্বদা প্রস্তুত থাকা।

কুরআনে এসেছে—

اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا

“ধৈর্য ধারণ কর, প্রতিরোধ কর এবং প্রস্তুত থাক।”

ইমাম বাকির (আ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন—

 اصْبِرُوا عَلَى أَدَاءِ الْفَرَائِضِ وَصَابِرُوا عَدُوَّكُمْ وَرَابِطُوا إِمَامَكُمُ الْمُنْتَظَرَ.

ফরজ আদায়ে ধৈর্য ধারণ কর, শত্রুর মোকাবিলায় দৃঢ় থাক এবং তোমাদের প্রতীক্ষিত ইমামের সাহায্যের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাক।” [নু‘মানী, আল-গায়েবা, পৃ. ১৯৯]

এখানে ‘رابطوا’ শব্দটি সাক্ষাৎ বা যোগাযোগ নয়; বরং সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

৫. ইমামের নাম ও স্মৃতির মহিমান্বিতকরণ
এই যুগে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর নাম ও স্মৃতিকে সম্মান জানানো একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। দোয়া মাহফিল, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, আলোচনা সভা ও গবেষণা—সবই এর অন্তর্ভুক্ত।

৬. বেলায়েতের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখা
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং নিয়মিতভাবে তাঁর প্রতি অঙ্গীকার নবায়ন করা একজন প্রতীক্ষাকারীর অন্যতম কর্তব্য।

ইমাম বাকির (আ.) বলেন—

 یَأْتِی عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ یَغِیبُ عَنْهُمْ إِمَامُهُمْ فَیَا طُوبَى لِلثَّابِتِینَ عَلَى أَمْرِنَا فِی ذٰلِكَ الزَّمَانِ... وَلَوْلَاكُمْ لَأَنْزَلْتُ عَلَیْهِمْ عَذَابِی.

মানুষের ওপর এমন এক সময় আসবে, যখন তাদের ইমাম গায়বাতে থাকবেন। ধন্য তারা, যারা সে সময় আমাদের আদর্শে অবিচল থাকবে! ... তোমাদের কারণেই আমি বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং বিপদ দূর করি; আর তোমরা না থাকলে আমি তাদের ওপর আযাব নাজিল করতাম।
[কামালুদ্দীন, খণ্ড ১, পৃ. ৩৩০]

এই আলোচনা অব্যাহত থাকবে…

উৎস: ‘দারসনামা-এ মাহদাভিয়াত’— খোদা-মুরাদ সোলাইমান (সামান্য সম্পাদনাসহ)

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha