হাওজা নিউজ এজেন্সির প্রতিনিধির রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরান একটি বহুমুখী কৌশলের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালীকে কেবল একটি ভূ-রাজনৈতিক জলপথ থেকে নিজের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণাধীন একটি অর্থনৈতিক ও আর্থিক কেন্দ্রে রূপান্তর করছে।
এই কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে “প্রণালী সেবা ব্যবস্থাপনা”, যা দুটি মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে:
১) জাহাজগুলোকে ইরান থেকে বাধ্যতামূলকভাবে বাঙ্কারিং (জ্বালানি সরবরাহ) সেবা গ্রহণে বাধ্য করা,
২) জাতীয় মুদ্রা (রিয়াল) দিয়ে ট্রানজিট ফি আদায়।
এই জটিল প্রক্রিয়ার লক্ষ্য কেবল আয় বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়; বরং আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্দেশ্য হলো “রিয়ালের জন্য বৈদেশিক চাহিদা সৃষ্টি করা”, যাতে নিষেধাজ্ঞাভিত্তিক আর্থিক কাঠামো ভেঙে ফেলা যায় এবং ইরানের জাতীয় মুদ্রার শক্তি বৃদ্ধি পায়।
যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে পরমাণু চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে বেরিয়ে গিয়ে প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের তথাকথিত “সর্বোচ্চ চাপ” নীতির আওতায় নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করার পর থেকে, ইরান অর্থনৈতিক চাপ কমানো এবং ওয়াশিংটনের আর্থিক হাতিয়ারগুলোকে অকার্যকর করার পথ খুঁজছিল। বর্তমানে, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তেহরান এমন একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, যা আগে কেবল কৌশলগত তাস হিসেবে বিবেচিত হতো: হরমুজ প্রণালীর অনন্য অবস্থানকে হুমকি নয়, বরং সার্বভৌম ও আর্থিক সেবা প্রদানের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার।
ইরানের বন্দর ও নৌপরিবহন সংস্থা একটি “পূর্ণাঙ্গ সেবা বিজ্ঞপ্তি” প্রকাশ করে প্রণালী দিয়ে অতিক্রমকারী জাহাজগুলোকে জ্বালানি সরবরাহ (বাঙ্কারিং), মেরামত ও নৌ-সমন্বয় সেবা ইরান থেকে গ্রহণে বাধ্য করেছে। পাশাপাশি এমন একটি ব্যবস্থাও তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ট্রানজিট ফি মূলত ইরানি রিয়াল অথবা ডলারের বাইরে অন্যান্য মুদ্রায় (যেমন ইউয়ান ও ডিজিটাল মুদ্রা) পরিশোধ করা সম্ভব।
এই কৌশলের মূল চাবিকাঠি হলো রিয়ালে ফি পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা। জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজির ভাষ্যমতে, প্রস্তাবিত আইনের খসড়া অনুযায়ী প্রণালী দিয়ে ট্রানজিটের ফি জাতীয় মুদ্রায় দিতে হবে। এই সিদ্ধান্ত সরাসরি “পেট্রোডলার” ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে। পেট্রোডলার ব্যবস্থায় তেল কিনতে দেশগুলোর ডলার প্রয়োজন হতো, আর এই কৃত্রিম চাহিদাই মার্কিন মুদ্রার বৈশ্বিক আধিপত্য নিশ্চিত করত। এখন ইরান আঞ্চলিক পর্যায়ে অনুরূপ একটি মডেলের মাধ্যমে রিয়ালের জন্য কাঠামোগত ও ধারাবাহিক চাহিদা তৈরি করতে চায়। অর্থাৎ রিয়াল অর্জনের জন্য দেশগুলোকে ইরানে পণ্য ও সেবা রপ্তানি করতে হবে।
যেসব দেশের অর্থনীতি হরমুজ প্রণালীর নিরাপদ ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল, তাদের ট্রানজিট ফি পরিশোধের জন্য আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে রিয়াল সংগ্রহ করতে হবে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা ইরানের অর্থনীতিতে প্রবেশ করবে, জাতীয় মুদ্রার মান বাড়বে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞাকে কার্যত পাশ কাটানো সম্ভব হবে। এ অবস্থায় বিদেশি কোম্পানিগুলোকে রিয়াল কিনতে ইরানি ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ নেটওয়ার্কের সঙ্গে কাজ করতে হবে-যা সুইফট ও মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের নজরদারির বাইরে একটি সমান্তরাল আর্থিক চ্যানেল সৃষ্টি করবে। সহজভাবে বললে, হরমুজ প্রণালী নিষেধাজ্ঞা অতিক্রমের পথ হয়ে উঠতে পারে। চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে রিয়ালকে আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি বিনিময়যোগ্য মুদ্রায় পরিণত করা, পেট্রোডলার মডেলের অনুরূপ।
বাঙ্কারিং সেবার মাধ্যমে একচেটিয়া ভাঙন
এই পরিকল্পনার আরেকটি দিক হলো বাঙ্কারিং সেবা প্রদান। বহু বছর ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর, প্রণালীর বাইরে অবস্থানের সুবিধা নিয়ে, জাহাজে জ্বালানি সরবরাহ ও মেরামতের প্রধান আঞ্চলিক কেন্দ্র ছিল এবং এ থেকে বিলিয়ন ডলার আয় করত। কিন্তু এখন এই একচেটিয়া অবস্থান চ্যালেঞ্জের মুখে। সাম্প্রতিক সংঘাতে ফুজাইরার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া এবং জ্বালানি বিক্রি ৭১ শতাংশ কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে, ইরান কেশম ও লারাক দ্বীপে অনুরূপ সেবা দিয়ে জাহাজগুলোকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করছে। জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ক্রেতারা আমিরাত-নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার পরিবর্তে ইরান-নিয়ন্ত্রিত নতুন ব্যবস্থায় ঝুঁকছে। এই পরিবর্তন ইরানের জন্য আয় বয়ে আনছে এবং একই সঙ্গে আমিরাতের ভূ-অর্থনৈতিক প্রভাবকে দুর্বল করছে।
আপনার কমেন্ট