হাওজা নিউজ এজেন্সি: কয়েক ঘণ্টা আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে কয়েকটি আরব ও মুসলিম দেশের নেতাদের প্রকাশ্যে ধন্যবাদ জানান। তিনি দাবি করেন, তাদের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতার পথ তৈরি হয়েছে এবং খুব দ্রুতই সেই চুক্তির ঘোষণা আসতে পারে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—ট্রাম্পের বক্তব্যে কোথাও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস, ক্ষেপণাস্ত্র সীমিতকরণ কিংবা “শর্তহীন আত্মসমর্পণ”-জাতীয় আগের কঠোর ভাষা দেখা যায়নি। বরং পুরো আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর বিষয়।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় থাকা সম্ভাব্য চুক্তির মূল দিকগুলো হচ্ছে—
• লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা
• ইরানের প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার অবমুক্ত করা
• হরমুজ প্রণালি থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার
• ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনা
• বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া
• ইরান ও ওমানের যৌথ তত্ত্বাবধানে নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণ
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যদি বাস্তবিক অর্থে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে এবং ইরানের অর্থ ছাড় করে, তাহলে প্রায় ৩০ দিন পর পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে।
অর্থাৎ, যুদ্ধের শুরু থেকে ইরান যে অবস্থান ধরে রেখেছিল—প্রথমে অবরোধ ও চাপ প্রত্যাহার, এরপর আলোচনা—শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি অনেকটাই সেদিকেই এগোতে দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে: তাহলে কি সামরিক সংঘাতে নয়, বরং ধৈর্য ও কৌশলগত চাপের মাধ্যমে ইরানই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে নিজের শর্তের কাছাকাছি টেনে আনতে সক্ষম হলো?
তবে এই সমঝোতার পথ মোটেও মসৃণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই ইতোমধ্যে যুদ্ধপন্থি রিপাবলিকান রাজনীতিক এবং কট্টর ইসরায়েলপন্থি মহল ট্রাম্পের সম্ভাব্য নমনীয় অবস্থানের তীব্র সমালোচনা শুরু করেছে। তাদের অভিযোগ, এই ধরনের সমঝোতা মূলত ইরানের কাছেই নতি স্বীকারের শামিল।
ইসরায়েল সরকার এখনও প্রকাশ্যে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া না দিলেও, তেলআবিব যে এই সম্ভাব্য সমঝোতায় সন্তুষ্ট নয়, সেটি মোটামুটি স্পষ্ট। ফলে শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি আবারও বদলে যেতে পারে কি না, সেই শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত এই অবস্থানে অটল থাকবেন, নাকি আবারও হুমকি ও সামরিক চাপের রাজনীতিতে ফিরে যাবেন—সেটাই এখন দেখার বিষয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলঘনিষ্ঠ অবস্থানে থাকা আবুধাবির হঠাৎ সক্রিয় মধ্যস্থতাকারীতে পরিণত হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারই ইঙ্গিত বহন করছে। বিশেষ করে নেতানিয়াহুর গোপন আমিরাত সফর নিয়ে তথ্য ফাঁসের পর দুই পক্ষের সম্পর্কের ভেতরে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, সেটিও আলোচনায় এসেছে।
সব মিলিয়ে, চুক্তিটি বাস্তবে কার্যকর হবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—যদি ওয়াশিংটন সত্যিই ইরানের শর্তের কাছাকাছি অবস্থানে যেতে বাধ্য হয়ে থাকে, তাহলে এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক লাভ আপাতত তেহরানের ঝুলিতেই যাচ্ছে।
আপনার কমেন্ট