হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা জিহাদে অবহেলাকারীদের কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন। সূরা তাওবার ৩৮ ও ৩৯ নম্বর আয়াতে দুনিয়ার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম থেকে পিছিয়ে পড়ার ভয়াবহ পরিণতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। নিম্নে এ বিষয়ে প্রশ্নোত্তর আকারে আলোচনা উপস্থাপন করা হলো।
প্রশ্ন: যারা “জিহাদে” অবহেলা করে, আল্লাহ তাআলা তাদের কী সতর্কবার্তা দিয়েছেন?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: আল্লাহ তাআলা জিহাদে অবহেলাকারীদের সতর্ক করে বলেছেন—আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের ভোগ-বিলাস অত্যন্ত নগণ্য। যারা জিহাদ থেকে পিছিয়ে থাকবে, আল্লাহ তাদের কঠিন শাস্তি দেবেন। তাদের অবহেলা আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না; বরং আল্লাহ তাদের পরিবর্তে অন্য এক জাতিকে দায়িত্ব দান করবেন।
বিস্তারিত উত্তর:
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন—
১.
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَا لَكُمْ إِذَا قِيلَ لَكُمُ انْفِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ اثَّاقَلْتُمْ إِلَى الْأَرْضِ أَرَضِيتُمْ بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا مِنَ الْآخِرَةِ فَمَا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا قَلِيلٌ
“হে মুমিনগণ! তোমাদের কী হলো, যখন তোমাদের বলা হয়—আল্লাহর পথে বের হও, তখন তোমরা মাটির সঙ্গে লেপ্টে থাক? তোমরা কি আখিরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনেই সন্তুষ্ট হয়ে গেলে? অথচ আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের ভোগ-বিলাস অতি সামান্য।”
[সূরা তাওবা, আয়াত: ৩৮]
২.
إِلَّا تَنْفِرُوا يُعَذِّبْكُمْ عَذَابًا أَلِيمًا وَيَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ وَلَا تَضُرُّوهُ شَيْئًا وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
“যদি তোমরা (জিহাদের জন্য) বের না হও, তবে আল্লাহ তোমাদের মর্মন্তুদ শাস্তি দেবেন এবং তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে নিয়ে আসবেন। তোমরা তাঁর কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।”
[সূরা তাওবা, আয়াত: ৩৯]
একজন মুসলমান যখন এসব আয়াত পাঠ করে, তখন তার উপলব্ধি করা উচিত—জিহাদের ক্ষেত্রে যদি সে অবহেলা করে, তবে কুরআনের এই সতর্কবার্তা তার প্রতিও প্রযোজ্য। যদিও এসব আয়াত তাবুক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়েছিল, তবে কুরআনের বিধান কোনো নির্দিষ্ট সময় বা ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা সব যুগের মুসলমানদের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
অতএব, যদি আমরা মৌখিক, কলমের, অর্থনৈতিক কিংবা আত্মত্যাগের জিহাদে অবহেলা করি, তবে কীভাবে ইসলামী ভূখণ্ডে শত্রুর আগ্রাসনের সামনে নীরব থাকতে পারি? কীভাবে দেখতে পারি যে, দখলদার ও জালিম শক্তিগুলো মুসলমানদের সম্মান ও মর্যাদার ওপর আঘাত হানছে, অথচ আমরা নিশ্চুপ?
হযরত আলী (আ.)-এর সেই বিখ্যাত বক্তব্য স্মরণীয়—যখন তিনি শুনলেন, ইসলামী রাষ্ট্রে এক অমুসলিম নারীর পায়ের নূপুর ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে, তখন তিনি বলেছিলেন
“এ ঘটনার শোকে কেউ মৃত্যুবরণ করলে তাকে দোষারোপ করা যাবে না।”
[নাহজুল বালাগা, খুতবা: ২৭]
তাহলে মুসলিম নারীদের সম্মানহানি দেখে কীভাবে একজন মুমিন নিশ্চুপ থাকতে পারে?
আজ প্রয়োজন কলম, ভাষা, অর্থ ও আত্মত্যাগের জহাদে অংশগ্রহণ করা। শত্রুর বিষাক্ত প্রচারণা মোকাবিলা করা, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা এবং ইসলামের মর্যাদা রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নেওয়া প্রত্যেক সচেতন মুসলমানের দায়িত্ব।
আল্লাহর পথে সংগ্রাম শুধু সামরিক লড়াই নয়; বরং এটি চিন্তা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও মূল্যবোধ রক্ষার লড়াইও। তাই মুসলমানের উচিত ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, কুরআন ও মহানবী (সা.)-এর অবমাননা এবং মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।
মুমিনের জীবন কখনো অপমানের কাছে নত হয় না। তার জীবন মর্যাদার, তার মৃত্যু সম্মানের। কারণ সত্য ও মিথ্যার মাঝে স্থায়ী আপস কখনো প্রতিষ্ঠিত হয় না।
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) সীমান্তরক্ষীদের জন্য এক দোয়ায় বলেন—
وَأَنْسِهِمْ عِنْدَ لِقَائِهِمُ الْعَدُوَّ ذِكْرَ دُنْيَاهُمُ الْخَدَّاعَةَ الْغَرُورَ وَامْحُ عَنْ قُلُوبِهِمْ خَطَرَاتِ الْمَالِ الْمَفْتُونِ
“হে আল্লাহ! শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার সময় তাদের অন্তর থেকে এই প্রতারণাময় দুনিয়ার মোহ দূর করে দিন এবং সম্পদের আকর্ষণ তাদের হৃদয় থেকে মুছে দিন।”
[আস-সহীফাতুস সাজ্জাদিয়াহ, দোয়া: ২৭]
এ দোয়ার মূল শিক্ষা হলো—মুমিন যেন পরিপূর্ণ আল্লাহপ্রেম ও আত্মত্যাগের চেতনা নিয়ে সত্যের পথে সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে পারে।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) থেকেও বর্ণিত হয়েছে,
مَا الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا مِثْلَ مَا يَجْعَلُ أَحَدُكُمْ إِصْبَعَهُ فِي الْيَمِّ فَلْيَنْظُرْ بِمَ يَرْجِعُ
“আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার উদাহরণ এমন, যেমন তোমাদের কেউ সমুদ্রে একটি আঙুল ডুবিয়ে বের করে দেখে—কতটুকু পানি সঙ্গে এসেছে।”
[তাফসিরে নমুনা, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ৪১৭; বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড: ৭০, পৃষ্ঠা: ১১৯]
অর্থাৎ, আখিরাত হলো বিশাল সমুদ্র, আর দুনিয়া সেই সমুদ্র থেকে আঙুলে লেগে থাকা সামান্য পানির মতো।
অতএব, মানুষের লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। তাঁর পথে সংগ্রাম করা এবং সত্যের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া। কারণ আমরা দায়িত্ব পালন না করলে আল্লাহ অন্যদের মাধ্যমে তাঁর দ্বীনকে সাহায্য করবেন।
এই আয়াতগুলোর মূল শিক্ষা হলো— মর্যাদার সঙ্গে বাঁচো, মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুবরণ করো; অপমান ও নীরবতার কাছে কখনো আত্মসমর্পণ করো না।
সূত্র:
১. পবিত্র কুরআন, সূরা তাওবা, আয়াত ৩৮-৩৯।
২. নাহজুল বালাগা, খুতবা ২৭।
৩. আস-সহীফাতুস সাজ্জাদিয়াহ, দোয়া ২৭।
৪. তাফসিরে নমুনা, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৪১৭।
৫. বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৭০, পৃষ্ঠা ১১৯।
৬. “আখলাকে ইসলামী দার নাহজুল বালাগা”, আয়াতুল্লাহ নাসির মাকারেম শিরাজি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৫০৪।
আপনার কমেন্ট