মঙ্গলবার ২ জুন ২০২৬ - ১০:৫৮
গাদির: আল্লাহর মহাজাগতিক পরিচালনা ও মানবজীবনের বিধানের মিলনবিন্দু

গাদির কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি সেই দিন, যেদিন সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে ঐশী বেলায়াতের ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। সৃষ্টিজগৎ বেলায়াতের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এবং মানবসমাজ ন্যায়, কল্যাণ ও সৌভাগ্য অর্জনের জন্য বেলায়াত, ফিকাহ এবং ঐশী শিক্ষার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সামাজিক ব্যবস্থার প্রতি বাস্তব অঙ্গীকারের প্রয়োজন অনুভব করে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: গাদিরে খুম কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি সৃষ্টিজগতের বেলায়েতভিত্তিক ব্যবস্থার সঙ্গে মানবসমাজের আইন ও নেতৃত্বব্যবস্থার সংযোগের প্রতীক। যেমন মহাবিশ্বের কোনো কিছুই অভিভাবকত্ব ও পরিচালনা ছাড়া নয়, তেমনি মানবসমাজও ঐশী নেতৃত্বের প্রয়োজন থেকে মুক্ত নয়। গাদিরে আল্লাহ মানবসমাজে শৃঙ্খলা ও সুশাসনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার জন্য ওলায়াতের নীতি প্রতিষ্ঠা করেন।

এই আলোচনায় গাদিরের আলোকে তাওহিদভিত্তিক ফিকহ ও সামাজিক ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করা হয়েছে:

ভূমিকা
বেলায়েত: সৃষ্টির ধমনীতে প্রবাহমান এক চিরন্তন সত্য
গভীর তাওহিদি দৃষ্টিভঙ্গিতে বেলায়েত কোনো কৃত্রিম, আইনগত বা নিছক রাজনৈতিক চুক্তি নয়; বরং এটি এমন এক মৌলিক অস্তিত্বগত সত্য, যা সৃষ্টি (তাকউইনি) ও বিধান (তাশরী')—উভয় ক্ষেত্রে কার্যকর।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:

إِنَّمَا وَلِیُّکُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِینَ آمَنُوا الَّذِینَ یُقِیمُونَ الصَّلَاةَ وَیُؤْتُونَ الزَّکَاةَ وَهُمْ رَاکِعُونَ

নিশ্চয়ই তোমাদের অভিভাবক ও কর্তৃত্বশীল নেতা হলেন আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং সেই মুমিনগণ, যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং রুকু অবস্থায় থাকে।
[সূরা মায়িদা: ৫৫]

এই আয়াত আল্লাহর সর্বময় বেলায়েতকে তুলে ধরে, যার ধারাবাহিকতা রাসূল (সা.) এবং আহলুল বাইত (আ.)-এর মাধ্যমে অব্যাহত থাকে।

১. তাকউইনি বেলায়াত: কণা থেকে ছায়াপথ পর্যন্ত শাসনব্যবস্থা
সৃষ্টিজগতের পরিসরে বেলায়েত বলতে আল্লাহর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান, সংরক্ষণ ও পরিচালনাকে বোঝায়। মহাবিশ্বে কোনো কিছুই স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়।

যেমন সৌরজগতের গ্রহসমূহ একটি কেন্দ্রীয় আকর্ষণশক্তির অধীনে থেকে সুশৃঙ্খলভাবে আবর্তিত হয় এবং বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা পায়, তেমনি ‘ওলি’ বা আল্লাহপ্রদত্ত নেতৃত্বও সৃষ্টিজগতের কেন্দ্রবিন্দু এবং অস্তিত্বের শৃঙ্খলা ও স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা।

আল্লাহ বিশ্বজগত সৃষ্টি করে তা পরিত্যাগ করেননি; বরং প্রতিক্ষণ তা পরিচালনা করছেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:

یُدَبِّرُ الْأَمْرَ مِنَ السَّمَاءِ إِلَی الْأَرْضِ

তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সব বিষয় পরিচালনা করেন। =সূরা সাজদাহ: ৫]

আরও ইরশাদ হয়েছে:

 أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ تَبَارَکَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِینَ

জেনে রাখ, সৃষ্টি ও নির্দেশ উভয়ই তাঁর। বরকতময় আল্লাহ, যিনি সমগ্র বিশ্বের প্রতিপালক।” [সূরা আ'রাফ: ৫

২. তাশরিয়ি বেলায়েত: মানব-ইচ্ছা ও বিশ্বব্যবস্থার সমন্বয়
মানুষই একমাত্র সৃষ্টি, যাকে স্বাধীন ইচ্ছা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তাশরিয়ি বেলায়েত হলো সেই ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের এই স্বাধীন ইচ্ছাকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য নেতা, ইমাম ও জীবনপথ নির্ধারণ করেছেন।

যদি তাকউইনি বেলায়েত মানুষের শরীর ও অস্তিত্বকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত করে, তবে ধর্ম ও ইমামত মানুষকে শিক্ষা দেয় কীভাবে সে নিজের ইচ্ছা ও কর্মকে মহাবিশ্বের সামগ্রিক শৃঙ্খলার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে। যে ব্যক্তি এই বেলায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, সে প্রকৃতপক্ষে নিজের অস্তিত্বের মৌলিক কাঠামোর বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয়।

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:

یَا أَیُّهَا الَّذِینَ آمَنُوا أَطِیعُوا اللَّهَ وَأَطِیعُوا الرَّسُولَ وَأُولِی الْأَمْرِ مِنْکُمْ

হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্যকার কর্তৃত্বপ্রাপ্তদের আনুগত্য কর। [সূরা নিসা: ৫৯]

৩. আলে মুহাম্মদ (আ.)-এর ফিকাহ: দৈনন্দিন জীবনে বেলায়াতের বাস্তব প্রতিফলন
বেলায়েতকে কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা না রেখে বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে আলে মুহাম্মদ (আ.)-এর ফিকাহর দিকে ফিরে যেতে হবে। ফিকাহ কেবল কিছু বিধি-নিষেধের সমষ্টি নয়; বরং এটি এমন এক জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের জীবনকে আল্লাহর ইচ্ছার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

وَمَا آتَاکُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاکُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا

রাসূল তোমাদের যা দিয়েছেন তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাক। [সূরা হাশর: ৭]

তাহারাত থেকে মুয়ামালাত
একজন মুমিন যখন তাহারাতের বিধান মেনে চলে, তখন সে নিজের অস্তিত্বকে তাওহিদের নূর গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করে। আবার যখন মুয়ামালাত বা সামাজিক-অর্থনৈতিক লেনদেনে ফিকাহর অনুসরণ করে, তখন সে সামাজিক সম্পর্ককে আল্লাহর ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে গড়ে তোলে।

ইবাদতের মাধ্যমে আত্মার বিকাশ
প্রত্যেক শরিয়তসম্মত বিধান মানুষের আত্মিক উৎকর্ষের একটি দ্বার। আল্লাহর আদেশের প্রতি আত্মসমর্পণ মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং তার অস্তিত্বকে এমন উচ্চতায় উন্নীত করে, যেখানে সে তাওহিদের গভীরতর সত্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়।

৪. ফিকাহভিত্তিক তাওহিদি সামাজিক ব্যবস্থার অপরিহার্যতা
বর্তমান সময়ে গাদিরের প্রকৃত শিক্ষা হলো—আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক ব্যবস্থাকে কেবল বস্তুবাদী তত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত না করে আলে মুহাম্মদ (আ.)-এর জ্ঞান ও শিক্ষার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন:

لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَیِّنَاتِ وَأَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْکِتَابَ وَالْمِیزَانَ لِیَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ

আমি আমার রাসূলদের সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সঙ্গে কিতাব ও ন্যায়ের মানদণ্ড অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। [সূরা হাদিদ: ২৫]

এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য আল্লাহর বিধান রয়েছে। ওহির নির্দেশনা থেকে বিচ্ছিন্ন মানবিক জ্ঞান ও সামাজিক ব্যবস্থা মানুষকে বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাই আজকের জরুরি প্রয়োজন হলো কুরআনের দিকে প্রত্যাবর্তন এবং ফিকাহ থেকে সামাজিক ব্যবস্থার কাঠামো নির্মাণ।

৫. গাদির: তাকউইন ও তাশরীর মিলনস্থল
গাদিরে রাসূলুল্লাহ (সা.) এমন এক বেলায়েতের ঘোষণা দেন, যা নবুয়তের অন্তর্নিহিত সত্য এবং পৃথিবীতে আল্লাহর পরিচালনার ধারাবাহিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

یَا أَیُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَیْکَ مِنْ رَبِّکَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ

“হে রাসূল! আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে তা পৌঁছে দিন; আর যদি তা না করেন, তবে আপনি তাঁর রিসালাতের দায়িত্ব পালন করলেন না। [সূরা মায়িদা: ৬৭]

দ্বীনের পূর্ণতা
এই ঘোষণার পর অবতীর্ণ হয় পবিত্র আয়াত:

الْیَوْمَ أَکْمَلْتُ لَکُمْ دِینَکُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَیْکُمْ نِعْمَتِی

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম। [সূরা মায়িদা: ৩]

অর্থাৎ বেলায়েত ও ফিকাহর সঙ্গে দ্বীনের সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমেই বিধানিক ব্যবস্থার পূর্ণতা অর্জিত হয় এবং মানবসমাজের জন্য কল্যাণকর নেতৃত্ব নিশ্চিত হয়।

ফিকাহর প্রতি অঙ্গীকারই গাদিরের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন অঙ্গীকার
সৃষ্টি ও বিধানের আলোকে বেলায়েতের ধারণা আমাদের শেখায় যে, বেলায়েতের প্রতি আনুগত্য কেবল আবেগগত ভালোবাসার বিষয় নয়; বরং তা আল্লাহর বিধানের প্রতি বাস্তব আনুগত্য, ফিকাহর অনুসরণ এবং ইসলামী নীতির ভিত্তিতে ব্যক্তি ও সামাজিক জীবন গড়ে তোলার মধ্যেই প্রতিফলিত হয়।

গাদির আমাদের সেই শৃঙ্খলার দিকে আহ্বান জানায়, যা আল্লাহ বিশ্বজগতের জন্য নির্ধারণ করেছেন। ব্যক্তি ও সমাজজীবনে সেই ঐশী ব্যবস্থার বাস্তবায়নের মাধ্যমেই মানুষ প্রকৃত প্রশান্তি, ন্যায় এবং কল্যাণ অর্জন করতে পারে।

লেখক: হুজ্জাতুল ইসলাম মোহাম্মদী দাগী

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha