হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: গাদীরে খুমের ঘটনা
ঈদে গাদীর হলো হিজরী ১০ম সালের ১৮ই জিলহজ, যখন মহানবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) বিদায় হজ শেষে মক্কা থেকে মদিনা ফিরছিলেন। পথিমধ্যে ‘গাদীরে খুম’ নামক জলাশয়ের নিকটে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিম্নোক্ত আয়াত নাজিল হয়:
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ ﴿۶۷﴾
“হে রাসূল! পৌঁছে দিন যা আপনার প্রতি আপনার প্রভুর কাছ থেকে নাজিল করা হয়েছে। যদি আপনি তা না করেন, তবে আপনি তাঁর রিসালাত (বার্তা) পৌঁছালেন না। আর আল্লাহ আপনাকে মানুষদের থেকে রক্ষা করবেন।”
(সূরা আল-মায়েদা, আয়াত ৬৭)
এই আয়াতের পরপরই নবী করিম (সা.) সেখানে উপস্থিত প্রায় এক লক্ষেরও বেশি সাহাবীকে একত্র করে একটি দীর্ঘ ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি ঘোষণা করেন:
"من كُنْتُ مَوْلَاهُ فَهٰذَا عَلِيٌّ مَوْلَاهُ” “যার মাওলা আমি, এই আলী তার মাওলা।”
এবং আরও বলেন: “اللّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ وَ عَادِ مَنْ عَادَاهُ”
হে আল্লাহ! যারা আলীকে ভালোবাসে, তুমি তাদের ভালোবাসো; আর যারা আলীর সাথে শত্রুতা করে, তুমি তাদের সাথে শত্রুতা করো।
এই ঘটনার পরপরই সাহাবীগণ হযরত আলী (আ.)-কে ‘আমীরুল মুমিনীন’ মুমিনদের নেতা হিসেবে অভিবাদন জানান এবং নবীজীর নির্দেশে সকলে তাঁর সাথে বায়‘আত করেন। পরের দিন (১৯ জিলহজ) নবীজী (সা.) সূরা মায়েদার ৩ নম্বর আয়াত (আল-ইয়াওমা আকমালতু...) নাজিল হওয়ার কথা উল্লেখ করেন-যাতে পরিপূর্ণ দীনের ঘোষণা দেওয়া হয়। তাই এই দিনটি শুধু ঐতিহাসিক নয়, বরং আকিদাগতভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঈদে গাদীরের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা
মাওলানা হায়দার আলী তার বিবৃতিতে বলেন: ঈদে গাদীর শুধু একটি আনুষ্ঠানিক উৎসব নয়; বরং এটি ইসলামের মূল স্তম্ভ ইমামত ও খিলাফতের পূর্ণতার ঘোষণাপত্র। এই দিনেই আল্লাহ তাআলা রিসালাতের পর উম্মাহর জন্য ইমামতের দায়িত্ব হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (আ.)-এর উপর অর্পণ করেন।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন:
· গাদীরের ঘোষণা ছিল আল্লাহর সরাসরি নির্দেশ: রাসূল (সা.) নিজে থেকে নন, বরং ঐশী আদেশেই এই ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। আয়াত নাজিলের পর নবীজী যদি তা না করতেন, তাহলে তার রিসালাতের সম্পাদনই প্রশ্নসাপেক্ষ হয়ে যেত।
· ‘মাওলা’ শব্দের ব্যাখ্যা: এখানে ‘মাওলা’ অর্থ ‘প্রভু’, ‘মালিক’, ‘অভিভাবক’ বা ‘নেতা’—যা আক্ষরিক ও পারিভাষিক উভয় অর্থেই নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব বোঝায়। শিয়া ইসলামের মতে, এটি হযরত আলী (আ.)-এর ইমামত ও খিলাফতের স্পষ্ট ঘোষণা।
· দীনের পরিপূর্ণতা: গাদীরের ঘটনার পরই সূরা মায়েদার ৩ নং আয়াত নাজিল হয়: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম, আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন হিসেবে পছন্দ করলাম।” এটি প্রমাণ করে যে রিসালাতের পরে ইমামত ছাড়া দীন অসম্পূর্ণ ছিল।
ইমামত ও খিলাফতের পূর্ণতা: শিয়া দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে
মাওলানা সাবির রেজা তাঁর বিবৃতিতে বলেন: ইমামত ও খিলাফতের ধারণা শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি আধ্যাত্মিক, বৈজ্ঞানিক, সামাজিক ও বিচারিক নেতৃত্বের এক অনন্য সমন্বয়। হযরত আলী (আ.) ছিলেন নবীজীর জ্ঞান, বীরত্ব, ন্যায়পরায়ণতা ও তাকওয়ার প্রতীক। গাদীরের দিন আল্লাহ তাআলা আলী (আ.)-এর মাধ্যমে উম্মাহকে অনন্ত পথপ্রদর্শক দান করেন।
তিনি আরও যুক্ত করেন:
· পরবর্তী ইমামদের ধারাবাহিকতা: শিয়া ইসনা আশারিয়ার মতে, হযরত আলী (আ.)-এর পরে তাঁর বংশধরদের মধ্য থেকে ১১ জন ইমাম (আ.) পর্যায়ক্রমে এই ইমামতের দায়িত্ব বহন করেন। গাদীর সেই ধারাবাহিকতার ভিত্তি প্রস্তর।
· আজকের প্রাসঙ্গিকতা: ইমামতের আদর্শ আজকের মুসলিম বিশ্বের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, যখন নেতৃত্বের সংকট, বিশৃঙ্খলা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ভিত্তিক শাসনের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।
উম্মাহর প্রতি আহ্বান ও সমসাময়িক বার্তা
মাওলানা সাবির রেজা তার বিবৃতিতে সরাসরি মুসলিম উম্মাহকে আহ্বান জানিয়েছেন:
আমি বিশ্বের সব মুসলমানের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি-ঈদে গাদীরের শিক্ষা গ্রহণ করুন। এটি কেবল একটি ফেরকা বা দলের উৎসব নয়; এটি ঐক্য, ন্যায় ও সত্যের পুনরুজ্জীবনের দিন। নবীজী (সা.) নিজে এই দিনকে ‘ঈদুল্লাহিল আকবার’ (আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ ঈদ) নামে অভিহিত করেছেন।
তিনি বিশেষভাবে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো স্মরণ করিয়ে দেন:
১. গাদীরের ঘটনা কেবল শিয়াদের বিশ্বাস নয়: অনেক সুফি ও মুহাক্কিক আলেম (যেমন, ইবনে হাজার আসকালানি, ফখরুদ্দিন রাজি, ইমাম গাজ্জালি) এই ঘটনার বিশুদ্ধতা ও গুরুত্ব স্বীকার করেছেন।
২. সকল মুসলমানের উচিত এই দিনে আনন্দ-উৎসব করা: রোজা রাখা, গোসল করা, নতুন পোশাক পরা, দান-খয়রাত করা এবং হযরত আলী (আ.)-এর গুণকীর্তন করা।
৩. বিভেদ ভুলে ঐক্যের পথে এগিয়ে যাওয়া: যদিও খিলাফতের ধারাবাহিকতা নিয়ে মতভেদ আছে, গাদীরের মৌলিক বার্তা-আলীর ন্যায়, প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের গুণাবলী-সবাই গ্রহণ করতে পারে।
সমাপনী দোয়া ও শুভেচ্ছা
বিবৃতির শেষাংশে মাওলানা সাবির রেজা বলেন: হে আল্লাহ! তুমি গাদীরের এই পবিত্র দিনের বরকতে আমাদের অন্তরকে হযরত আলী (আ.)-এর ভালোবাসায় ভরিয়ে দাও। আমাদের সেই ন্যায় ও সত্যের পথে চলার তৌফিক দান কর, যার দিশা দেখিয়ে গেছেন নবীজী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বায়ত (আ.)। সব মুসলমানকে তুমি ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ রাখো।
সর্বশেষ বার্তা: ঈদে গাদীর মুবারক! আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি-ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গড়ি এবং ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় থাকি।
আপনার কমেন্ট