বুধবার ৩ জুন ২০২৬ - ১০:৪৮
গাদিরকে জীবন্ত রাখলে ইসলাম জীবন্ত থাকবে: আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.)

পবিত্র ঈদে গাদির উপলক্ষে ইসলামী বিপ্লবের নেতা শহীদ হযরত আয়াতুল্লাহ সাইয়্যিদ আলী খামেনেয়ী (রহ.)’র বিভিন্ন বক্তব্য পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর দৃষ্টিতে গাদির কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বা উত্তরাধিকার নির্ধারণের প্রসঙ্গ নয়; বরং এটি ইমামত, সমাজ পরিচালনা, ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা, ইসলামী পরিচয় এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মৌলিক ও নির্ধারক সত্য।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: বিভিন্ন বক্তব্যে ঈদে গাদিরকে «عیدالله الأکبر» (আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ ঈদ) হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, গাদিরকে জীবন্ত রাখা মানে ইসলামকে জীবন্ত রাখা। কারণ গাদিরের মধ্যেই নিহিত রয়েছে ইমামতের দর্শন, ঐশী নেতৃত্বের আদর্শ, ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি এবং মানবসমাজকে সঠিক পথে পরিচালনার রূপরেখা।

গাদিরকে জীবন্ত রাখা মানেই ইসলামকে জীবন্ত রাখা
শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.) বলেন,

ইমামত, বেলায়েত এবং গাদিরকে জীবন্ত রাখার বিষয়টি এক অর্থে ইসলামকে জীবন্ত রাখারই নাম। এটি কেবল শিয়া সম্প্রদায় বা আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.)-এর বিলায়াতে বিশ্বাসীদের বিষয় নয়।

যদি আমরা, যারা নিজেদেরকে আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর অনুসারী বলে দাবি করি, গাদিরের সত্যকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারি এবং তা সঠিকভাবে অন্যদের সামনে উপস্থাপন করতে সক্ষম হই, তাহলে গাদির নিজেই মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের একটি শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।

আকীদাগত বিশ্বাস একটি বিষয়, আর কোনো বিষয়ের প্রকৃত তাৎপর্য ও দর্শনকে সঠিকভাবে জানা আরেক বিষয়। গাদিরের মাধ্যমে ইসলাম ইসলামী সমাজ, ইসলামী রাষ্ট্র এবং ইসলামী সভ্যতা নির্মাণের সর্বোচ্চ নীতিকে মানবতার সামনে উপস্থাপন করেছে।
[১০ আবান ১৩৯১ শামসি/ ৩১ অক্টোবর ২০১২]

গাদির শুধু উত্তরাধিকার নির্ধারণের বিষয় নয়; এটি ইমামতের প্রশ্নকে সামনে আনে
তিনি বলেন, “গাদিরের ঘটনা কেবল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একজন উত্তরসূরি নির্ধারণের বিষয় ছিল না। গাদিরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। একটি হলো উত্তরসূরি মনোনয়ন; অন্যটি হলো ‘ইমামত’ প্রশ্নকে মুসলমানদের সামনে সুস্পষ্টভাবে উত্থাপন করা।

ইমামত বলতে সেই অর্থই বোঝানো হয়েছে, যা মুসলমানরা এ শব্দ থেকে বুঝে থাকেন। ইমামত অর্থ মানুষের নেতৃত্ব, সমাজের নেতৃত্ব এবং মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত-সংক্রান্ত জীবনকে সঠিক পথে পরিচালনা করা।

এটি কেবল মুসলমান বা শিয়াদের বিশেষ কোনো বিষয় নয়; বরং মানবজাতির ইতিহাসের অন্যতম মৌলিক প্রশ্ন। কারণ প্রতিটি সমাজেই কোনো না কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নেতৃত্ব দেয় এবং মানুষের পার্থিব ও আধ্যাত্মিক জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে।”
[৪ আজার ১৩৮৯ শামসি / ২৫ নভেম্বর ২০১০]

গাদির: ‘ঈদুল্লাহিল আকবার’
তিনি বলেন, “ইসলামী বর্ণনাসমূহে গাদিরকে ‘عیدالله الأکبر’, ‘یوم العهد المعهود’ এবং ‘یوم المیثاق المأخوذ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে।

এই বিশেষ মর্যাদার কারণ হলো ‘বেলায়েত’। ইসলামে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের গ্যারান্টি হলো ইসলামী শাসনব্যবস্থা এবং কুরআনের বিধানের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা।

অন্যথায় মানুষ ব্যক্তিগতভাবে ঈমানদার হলেও, যদি আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা অন্যদের হাতে থাকে, তবে ইসলামের পূর্ণ বাস্তবায়ন নির্ভর করবে তাদের সদিচ্ছার ওপর।

যদি তারা অন্যায়পরায়ণ হয়, তাহলে মুসলমানদের অবস্থা সেই রকম হবে, যা আমরা কসোভো, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, ফিলিস্তিন এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে প্রত্যক্ষ করেছি। আর যদি কিছুটা ন্যায়পরায়ণও হয়, তবে ইসলাম ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকবে; সমাজজীবনে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটবে না।”
[১৬ ফারভারদিন ১৩৭৮ শামসি / ৫ এপ্রিল ১৯৯৯]

যদি ইতিহাসে সেই বিচ্যুতি না ঘটত...
শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.) অন্যত্র বলেন,

“আজও মানবসমাজ ক্ষুধা, বৈষম্য, জুলুম এবং মানুষের ওপর মানুষের অন্যায় কর্তৃত্বের সমস্যায় আক্রান্ত। চার হাজার বছর আগে কিংবা দুই হাজার বছর আগে যেসব সমস্যা ছিল, আজও মূলত সেগুলোই বিদ্যমান; শুধু তাদের রূপ পরিবর্তিত হয়েছে।

গাদির ছিল এমন এক ধারার সূচনা, যা মানবজাতিকে এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথে নিয়ে যেতে পারত।

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইসলামী সমাজের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং সেই ভিত্তি রক্ষার জন্য ‘ওসিয়্যাত’ ও ‘নিয়াবাত’-এর ব্যবস্থা নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু পরে সে পথ থেকে বিচ্যুতি ঘটে।

যদি সেই বিচ্যুতি না ঘটত, তাহলে মানবসভ্যতা ভিন্ন এক পর্যায়ে পৌঁছাত এবং মানুষের উচ্চতর চাহিদা ও উৎকৃষ্ট মূল্যবোধ মানবজীবনের প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হতো।

গাদিরের তাৎপর্য এখানেই নিহিত।”
[২৯ দেই ১৩৮৪ শামসি/ ১৯ জানুয়ারি ২০০৬]

গাদিরের আলোচনা মুসলিম ঐক্যের কারণ হওয়া উচিত
তিনি বলেন, “শহীদ মুর্তজা মুতাহ্হারীর ‘الغدیر و الوحدة الإسلامیة’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রয়েছে। সেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, কীভাবে গাদিরের আলোচনা মুসলমানদের হৃদয়কে একে অপরের নিকটবর্তী করতে পারে।

আল্লামা আমিনী তাঁর অমর গ্রন্থ ‘الغدیر’-এ শিয়া বিশ্বাসের পক্ষে দলিল উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু তাঁর ভাষা, উপস্থাপনা ও পদ্ধতি এমন ছিল, যা বিভিন্ন মাজহাবের মুসলমানদের আকৃষ্ট করেছে।

আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে, যাতে গাদিরের আলোচনা মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির কারণ না হয়।

নিজেদের বিশ্বাস অবশ্যই তুলে ধরতে হবে এবং তার ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে হবে; কিন্তু তা এমনভাবে করতে হবে, যাতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।”
[১৪ আজার ১৩৮৪ শামসি/ ৫ ডিসেম্বর ২০০৫]

গাদির: সমাজ পরিচালনার প্রশ্নে নবীজির প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ
শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.)’র ভাষায়, “গাদিরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.)-কে ইসলামী উম্মাহর অভিভাবক ও নেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা।

প্রকৃতপক্ষে এটি সমাজ পরিচালনার প্রশ্নে নবী করিম (সা.)-এর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ।

এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে, ইসলামে সমাজ পরিচালনা ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ নেতৃত্ব একটি সমাজের সবচেয়ে প্রভাবশালী উপাদানগুলোর অন্যতম।

আমিরুল মুমিনীন (আ.) ছিলেন জ্ঞান, তাকওয়া, সাহস, আত্মত্যাগ এবং ন্যায়বিচারের অনন্য প্রতীক। তাঁকে নেতৃত্বের জন্য মনোনীত করার মাধ্যমে ইসলাম আদর্শ শাসক ও নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্যগুলোকে স্পষ্ট করে দিয়েছে।”
[১০ বাহমান ১৩৮৩ শামসি/ ২৯ জানুয়ারি ২০০৫]

ঈদে গাদির আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যেরও অংশ
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.) বলেন,

“ঈদে গাদির আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যেরও অংশ। কারণ আমাদের জাতি এই বিশ্বাস, এই মূল্যবোধ এবং এই পরিচয়কে নিজেদের চেতনার অংশ হিসেবে ধারণ করে।

শত্রুর অন্যতম কৌশল হলো জাতিগুলোকে তাদের নিজস্ব পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। বিষয়টি অত্যন্ত বিস্তৃত; কয়েকটি বাক্যে এর গভীরতা বা এর বিপদের মাত্রা পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব নয়।

বিশেষ করে শিক্ষিত সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের উচিত এই প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সচেতন থাকা এবং সেই মূল্যবোধগুলো সংরক্ষণ করা, যেগুলো প্রকৃতপক্ষে জাতির পরিচয় নির্মাণ করে, তাকে অগ্রগতির পথে পরিচালিত করে এবং মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে।”
[৮ উর্দিবেহেশ্ত ১৩৮২ শামসি/ ২৮ এপ্রিল ২০০৩]

জনগণের ব্যাপারে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ—أعدلکم فی الرعیة
রাসূলুল্লাহ (সা.) আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.)-এর গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন,

 أعدلکم فی الرعیة

অর্থাৎ, “জনগণের ব্যাপারে তিনি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ।”

আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.) বলেন, “এখানে যেমন তাঁর ব্যক্তিগত ও আত্মিক ন্যায়পরায়ণতার কথা বোঝানো হয়েছে, তেমনি বোঝানো হয়েছে তাঁর সামাজিক আচরণ, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং জনজীবনে ন্যায় প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও।

মুখে ন্যায়বিচারের কথা বলা সহজ, কিন্তু বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটানোই প্রকৃত পরীক্ষা। আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর জীবন ও শাসনব্যবস্থা সেই বাস্তব ন্যায়বিচারের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

আজ শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিক্রান্ত হওয়ার পরও যদি ন্যায়বিচারের একটি পূর্ণাঙ্গ উদাহরণ উপস্থাপন করতে হয়, তাহলে তাঁর জীবন ও আচরণের চেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন।

এ কারণেই নবী করিম (সা.) আল্লাহর নির্দেশে তাঁকে জনগণের সামনে পরিচয় করিয়ে দেন এবং বিলায়াত ও নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেন।

গাদিরের প্রকৃত বার্তা হলো ন্যায়ের শাসন, মহত্ত্বের শাসন এবং «ولایة الله»-এর শাসন প্রতিষ্ঠা।

আমরা যদি সত্যিই আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর বিলায়াতের অনুসারী হতে চাই, তাহলে আমাদের নিজেদের জীবন এবং সমাজকে ন্যায়ভিত্তিক করার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে হবে। কারণ ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র সীমাহীন; যত বেশি আমরা সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারব, তত বেশি আমরা তাঁর আদর্শের নিকটবর্তী হতে পারব।”
[১ ইসফান্দ ১৩৮১ শামসি/ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০০৩]

গাদির ও ইসলামী বিপ্লব
তিনি বলেন, “যারা আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর হাতে বাইআত করেছিলেন এবং তাঁর চারপাশে সমবেত হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই গাদিরের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেননি; যেমন তাঁরা ইসলামের সূচনা কিংবা প্রথম যুগের সংগ্রামগুলোরও প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন না।

কিন্তু ইসলামের আলো ও হেদায়েত কেবল সমসাময়িক মানুষের জন্য নয়; বরং সকল যুগ এবং সকল মানুষের জন্য।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন:

وَآخَرِينَ مِنْهُمْ لَمَّا يَلْحَقُوا بِهِم

‘এবং তাদের পরবর্তীদের জন্যও, যারা এখনো তাদের সঙ্গে মিলিত হয়নি।’ (সূরা জুমু‘আ, ৬২:৩)

ইসলামী বিপ্লবও তেমনই এক ঐতিহাসিক যাত্রার সূচনা। পৃথিবীর যেসব মানুষ অবিচার, স্বৈরাচার, দমন-পীড়ন এবং বৈষম্যের শিকার হয়েছে, তারা স্বাভাবিকভাবেই ন্যায়ভিত্তিক এই আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হবে।

আজ যেমন তারা এ আন্দোলনের প্রতি আগ্রহী, ভবিষ্যতেও তেমনই থাকবে।”
[১৯ দেই ১৩৮১ শামসি / ৯ জানুয়ারি ২০০৩]

গাদির: নবী-রাসূলদের সকল মিশনের কাঙ্ক্ষিত পরিণতি
শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.) বলেন, “আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.)-এর ব্যক্তিত্বে আমরা এক অনন্য সমন্বয় দেখতে পাই।

একদিকে রয়েছে আধ্যাত্মিকতা, ঈমান, নৈতিকতা, জ্ঞান ও তাকওয়া; অন্যদিকে রয়েছে গভীর প্রজ্ঞা, অসাধারণ সাহস, আত্মত্যাগ এবং মানুষের প্রতি মমত্ববোধ।

তিনি খাওয়ারিজের বিদ্রোহের মতো ভয়াবহ সংকট মোকাবিলায় এমন দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছিলেন, যা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না।

এই সব গুণাবলির মূল উৎস হলো তাঁর ‘ইসমত’ বা আল্লাহপ্রদত্ত নিষ্পাপতা। আল্লাহ তাঁকে এমন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিলেন, যেখানে পাপ ও বিচ্যুতির কোনো স্থান নেই।

এমন একজন ব্যক্তি যদি সমাজের নেতৃত্বে থাকেন, তবে সেটিই হলো নবী-রাসূলদের সকল মিশনের সর্বোচ্চ ও কাঙ্ক্ষিত পরিণতি।

গাদিরে মূলত এই সত্যটিই ঘোষণা করা হয়েছিল।”
[১২ ইসফান্দ ১৩৮০ শামসি / ৩ মার্চ ২০০২]

মানবজাতি কখনোই আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর পাঁচ বছরের শাসনকে ভুলবে না
তিনি বলেন, “ইমামত হলো সমাজ পরিচালনার সর্বোচ্চ আদর্শ। এটি সেইসব শাসনব্যবস্থার বিপরীত, যেগুলো মানুষের দুর্বলতা, প্রবৃত্তি, অহংকার এবং ক্ষমতালিপ্সা থেকে উৎসারিত হয়।

ইসলাম মানবজাতির সামনে ইমামতের আদর্শ উপস্থাপন করেছে। অর্থাৎ এমন এক নেতৃত্ব, যার হৃদয় আল্লাহর হেদায়েতের আলোয় পরিপূর্ণ; যে দ্বীনের জ্ঞান রাখে এবং সঠিক পথ চিনতে পারে; যে দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম।

পবিত্র কুরআনের ভাষায়:

يَا يَحْيَىٰ خُذِ الْكِتَابَ بِقُوَّةٍ‌

‘হে ইয়াহইয়া! দৃঢ়তার সঙ্গে কিতাব গ্রহণ কর।’ (সূরা মারইয়াম, ১৯:১২)

একজন প্রকৃত ইমাম নিজের জীবন, স্বার্থ ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেন না; বরং মানুষের জীবন, মর্যাদা ও কল্যাণকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেন।

আমিরুল মুমিনীন (আ.) তাঁর পাঁচ বছরেরও কম সময়ের শাসনকালে এই সত্যকে বাস্তবে প্রমাণ করে গেছেন।

এ কারণেই তাঁর সংক্ষিপ্ত শাসনকাল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানবজাতির জন্য এক উজ্জ্বল আদর্শ ও প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। গাদিরের শিক্ষা ও ব্যাখ্যার অন্যতম ফল হলো এই আদর্শ নেতৃত্বের ধারণা।”
[১২ ইসফান্দ ১৩৮০ শামসি / ৩ মার্চ ২০০২]

‘আল-গাদির’ গ্রন্থ সম্পর্কে বিপ্লবী নেতার সুপারিশ
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.) বলেন, “আমার মতে, ‘আল-গাদির’ এখনো যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি।

এই গ্রন্থে শত শত গবেষণার বিষয়বস্তু ছড়িয়ে রয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তি, ঐতিহাসিক ঘটনা, হাদিস এবং চিন্তাগত বিষয় নিয়ে আল্লামা আমিনী বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয় খুঁজে বের করতে হলে পাঠককে কখনো কখনো বহু পৃষ্ঠা অধ্যয়ন করতে হয়।

আমি আমাদের বন্ধুদের পরামর্শ দিয়েছি, তাঁরা যেন ‘আল-গাদির’ গ্রন্থকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন এবং এর বিভিন্ন বিষয় পৃথকভাবে সংগ্রহ ও সংকলন করেন।

প্রতিটি বিষয়ই একটি স্বতন্ত্র বই, গবেষণাগ্রন্থ কিংবা পুস্তিকায় রূপান্তরিত হতে পারে।

আল্লামা আমিনী যে জ্ঞানভাণ্ডার নির্মাণ করেছেন, তা এক বিশাল জ্ঞান-প্রাসাদের মতো। সেই প্রাসাদ যেমন অক্ষুণ্ণ থাকবে, তেমনি তার ভেতরের মূল্যবান সম্পদগুলোও পৃথক গ্রন্থ ও গবেষণার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া উচিত।”
[১০ এসফান্দ ১৩৭৮ শামসি / ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০০০]

শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.)’র বক্তব্যসমূহ থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর দৃষ্টিতে গাদির কেবল একটি ঐতিহাসিক স্মৃতি নয়; বরং ইসলামের রাজনৈতিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক দর্শনের কেন্দ্রীয় উপাদান।

তিনি গাদিরকে ইমামতের ঘোষণা, ন্যায়ভিত্তিক শাসনের ভিত্তি, মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের একটি সম্ভাবনাময় কেন্দ্র এবং ইসলামী পরিচয় সংরক্ষণের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।

তাঁর ভাষায়, গাদিরের সঠিক উপলব্ধি ও যথাযথ উপস্থাপন বিভেদের কারণ নয়; বরং তা ন্যায়, নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ এবং ইসলামী ঐক্যের গভীরতর উপলব্ধির পথ সুগম করতে পারে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha