বুধবার ৩ জুন ২০২৬ - ১১:৩৩
গাদীরিয়া জিয়ারত; আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর মর্যাদা ও গৌরবের সনদ

ঈদে গাদীরের দিনে আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর জিয়ারত হলো হযরত আমীর (আ.)-এর উপাধি, মর্যাদা ও অবস্থানের একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত তালিকা; ইসলামের পক্ষে তিনি যে ভূমিকা রেখেছেন তার প্রতিফলন।

হাওজা নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী ঈদে গাদীরের দিনে আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর জিয়ারত হলো হযরত আমীর (আ.)-এর উপাধি, মর্যাদা ও অবস্থানের একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত তালিকা; ইসলামের পক্ষে তিনি যে ভূমিকা রেখেছেন তার প্রতিফলন; রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর সম্পর্কে যে হাদীসসমূহ বর্ণনা করেছেন; পবিত্র কুরআনের সেই আয়াতসমূহ যা আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর শানে নাযিল হয়েছে এবং হাদীস অনুসারে যেগুলোর শানে নুযূল হলো আলী (আ.)-এর মর্যাদা, অবস্থান ও কর্ম; পাশাপাশি ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধসমূহ ও ঘটনাবলী যাতে আলী (আ.) ভূমিকা রেখেছেন। এ সবকিছুই ঈদে গাদীরের দিনে আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর জিয়ারতে ব্যাপকভাবে, চিত্তাকর্ষকভাবে এবং সত্যিই বিস্ময়করভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই জিয়ারতের ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও বর্ণনা করতে অনেক সময় লাগবে এবং বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন; কিন্তু আমাদের সামনে যে সুযোগ আছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এই জিয়ারতের কিছু অংশ ও অনুচ্ছেদ তোমাদের কাছে উপস্থাপন করব।

মাফাতিহুল জানানে এই জিয়ারতের শুরুটি এমন:

«السَّلَامُ عَلَی مُحَمَّدٍ رَسُولِ اللَّهِ، خَاتَمِ النَّبِیِّینَ وَسَیِّدِ الْمُرْسَلِینَ وَصَفْوَةِ رَبِّ الْعَالَمِینَ»

এই অংশে রাসূল (সা.)-এর মর্যাদাবলী ও বিশেষ দরূদ ও সালাম পেশ করা হয়েছে।

পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে:

«السَّلَامُ عَلَی أَنْبِیَاءِ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَمَلَائِکَتِهِ الْمُقَرَّبِینَ وَعِبَادِهِ الصَّالِحِینَ»

আল্লাহর নবী-রাসূলগণ, প্রভুর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতাগণ ও তাঁর সৎ বান্দাদের প্রতি সালাম, অভিবাদন ও শুভেচ্ছা।

এরপর আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর দরবারে সালাম, অভিবাদন ও দরূদ পেশ করতে প্রবেশ করা হয়েছে:

«السَّلَامُ عَلَی مُحَمَّدٍ رَسُولِ اللَّهِ، خَاتَمِ النَّبِیِّینَ وَسَیِّدِ الْمُرْسَلِینَ وَصَفْوَةِ رَبِّ الْعَالَمِینَ»

যেমন আমি বলেছি, এই দীর্ঘ ও বিস্তারিত জিয়ারতনামার প্রতিটি শব্দ মওলা আলী (আ.)-এর মর্যাদা ও গুণাবলী বর্ণনা করে এবং তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন। এই অভিব্যক্তি ও বাক্যগুলোর প্রতিটির প্রমাণ আমাদের হাদীসসমূহে ও বিভিন্ন সূত্রে বিদ্যমান; কিন্তু এই জিয়ারতে সেগুলো একত্রিত করে ইমাম হাদী (আ.)-এর বাণীরূপে পেশ করা হয়েছে।

আমিরুল মুমিনীন (আ.) আমাদের মওলা ও মুমিনদের মওলা হিসেবে উল্লেখিত হয়েছেন; সেই ব্যক্তি যিনি  «أَمِینُ اللَّهِ فِی أَرْضِهِ وَصَفِیُّهُ فِی خَلْقِهِ» ; যমীনে আল্লাহর আমিন, সৃষ্টির কাছে প্রভুর প্রতিনিধি, বান্দাদের ওপর প্রভুর পরিপূর্ণ দলীল, আল্লাহর সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন এবং প্রভুর সরল পথ। সরল পথ আলী (আ.) ছাড়া আর কিছুই না।

«السَّلَامُ عَلَیْکَ أَیُّهَا النَّبَأُ الْعَظِیمُ الَّذِی هُمْ فِیهِ مُخْتَلِفُونَ»

এটি সূরা নাবার শানে নুযূল সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসের প্রতি ইঙ্গিত যে এই ‘আজিম সংবাদ’ যা সম্পর্কে মানুষ জিজ্ঞেস করে, আলোচনা করে এবং কেউ কেউ তাতে মতভেদ করে, তা আলী (আ.)-এর অস্তিত্ব বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

হে আমিরুল মুমিনীন, তোমার প্রতি সালাম যখন মানুষ মুশরিক ছিল, তুমি ঈমান এনেছ; «وَصَدَّقْتَ بِالْحَقِّ وَهُمْ مُکَذِّبُونَ»؛ ; অন্যদের মিথ্যারোপ করার সময় তুমি সত্যকে সত্যায়ন করেছ এবং  «وَجَاهَدْتَ وَهُمْ مُحْجِمُونَ؛ ; যে সময়ে অন্যরা জিহাদ, সংগ্রাম ও সত্যের প্রতিরক্ষার ময়দান থেকে পলায়ন করত ও পা পিছু হটত, সে সময়ে হযরত আমীর ছিলেন জিহাদকারী।

«مُخْلِصًا لِلَّهِ الدِّینَ، صَابِرًا مُحْتَسِبًا حَتَّی أَتَاکَ الْیَقِینُ» – তিনি সারাজীবন একনিষ্ঠ ইবাদত ও খাঁটি বান্দেগী করেছেন যতক্ষণ না তাঁর মৃত্যু ও শাহাদাত আসে।

«السَّلَامُ عَلَیْکَ یَا سَیِّدَ الْمُسْلِمِینَ وَیَعْسُوبَ الدِّینِ وَیَعْسُوبَ الْمُؤْمِنِینَ وَإِمَامَ الْمُتَّقِینَ وَقَائِدَ الْغُرِّ الْمُحَجَّلِینَ»-এগুলো সবই হযরত আমীর (আ.)-এর বিশেষণ।

«أَشْهَدُ أَنَّکَ أَخُو رَسُولِ اللَّهِ وَوَصِیُّهُ وَوَارِثُ عِلْمِهِ وَأَمِینُهُ عَلَی شَرْعِهِ»-আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তুমি রাসূলুল্লাহর ভাই, তাঁর ওসী, তাঁর জ্ঞানের উত্তরাধিকারী, তাঁর শরীয়তের ওপর আমানতদার, তাঁর উম্মতের মধ্যে তাঁর খলীফা এবং  «أَوَّلُ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَصَدَّقَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَی نَبِیِّهِ» তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছ এবং তাঁর নবীর প্রতি যা নাযিল হয়েছে তা সত্যায়ন করেছ।

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে যেটুকু প্রচারের নির্দেশ ছিল তা সম্পন্ন করেছেন; তিনি তাঁর দাওয়াত প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন এবং উম্মতের ওপর রাসূল ও তাঁর ওলায়াতের (অভিভাবকত্বের) আনুগত্য করা ফরজ ও ওয়াজিব করেছেন; এই সত্যের ওপর তিনি জনগণের কাছ থেকে বায়‘আত নিয়েছেন এবং হে আলী! তোমাকে মুমিনদের ওপর তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক হকদার বানিয়েছেন।

এটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর গাদীরীয়া খুতবার প্রতি ইঙ্গিত, যেখানে তিনি বলেছিলেন:

«أَلَسْتُ أَوْلَی بِکُمْ مِنْ أَنْفُسِکُمْ؟»-আমি কি তোমাদের নিজেদের চেয়ে অধিক হকদার নই?

সবাই বলল: «بلی یا رسول الله». «বালা ইয়া রাসূলাল্লাহ।»

তাই তিনি বললেন: «مَن کنتُ مولاه فهذا علی مولاه».-যার যার মাওলা আমি, এই আলী তার মাওলা।

আল্লাহও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ এই মিশন পূর্ণ করেছেন এবং গাদীরে খুমে সেই বাগ্মী খুতবা দিয়েছেন, ফলে সবার ওপর হুজ্জত সম্পন্ন হয়েছে।

«وَلَعَنَ اللَّهُ جَاحِدَ وِلَایَتِکَ بَعْدَ الْإِقْرَارِ، وَنَاکِثَ عَهْدِکَ بَعْدَ الْمِیثَاقِ»-যারা তোমার ওলায়াত স্বীকার করার পর তা অস্বীকার করেছে এবং গাদীরের দিনে তোমার সঙ্গে চুক্তি ও অঙ্গীকার করার পর সেই চুক্তি ভঙ্গ করেছে, আল্লাহ তাদের ওপর লানত বর্ষণ করুন।

গাদীরে লোকেরা এসে আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর সাথে আমিরুল মুমিনীন হিসেবে বায়‘আত করে, হাত মিলায় এবং সেই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে-যা গাদীরে টানা তিন দিন অনুষ্ঠিত হয়েছিল-উপস্থিত হয়েছিল। যারা পরবর্তীতে চুক্তি ভঙ্গ করেছে, অঙ্গীকার লংঘন করেছে এবং তাঁর ওলায়াত অস্বীকার করেছে, তারা আল্লাহর লানতের পাত্র।

«أَشْهَدُ أَنَّکَ أَمِیرُ الْمُؤْمِنِینَ حَقًّا لم تنطق بولایتک التنزیل»-আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তুমি প্রকৃত আমিরুল মুমিনীন; তুমি সেই সত্য যে কুরআন ও তানযীল তোমার ওলায়াতের কথা বলেছে এবং আল্লাহ ও রাসূলও তোমার ওলায়াতের ওপর উম্মতের কাছ থেকে অঙ্গীকার ও চুক্তি নিয়েছেন।

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তুমি, তোমার চাচা হামযা সাইয়িদুশ শুহাদা এবং তোমার ভাই জাফর ইবনে আবি তালিব, জাফরে তাইয়ার-তারা তাদের জান দিয়ে আল্লাহর সঙ্গে ব্যবসা করেছে; নিজেদের জান দিয়ে ইসলাম ও আল্লাহর দ্বীনের প্রতিরক্ষা করেছে এবং তোমাদের সম্পর্কে এই আয়াত নাযিল হয়েছে:

«إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَی مِنَ الْمُؤْمِنِینَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ»-নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের নিকট থেকে তাদের জান ও মাল কিনে নেন, এই শর্তে যে তাদের জন্য জান্নাত হবে। (সূরা তাওবা, ১১১)-এই আয়াতের শেষ পর্যন্ত, যেখানে তাদের জন্য আল্লাহর সুসংবাদ যারা সত্য, রাসূলের দ্বীন ও ইসলামের পথে জান কুরবান করে; এবং «ذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ» – এটাই মহান সফলতা।

পবিত্র আয়াত:

«التَّائِبُونَ الْعَابِدُونَ الْحَامِدُونَ السَّائِحُونَ الرَّاكِعُونَ السَّاجِدُونَ» (সূরা তাওবা, ১১২)-হাদীস অনুসারে এর সুস্পষ্ট উদাহরণ আলী (আ.)।

হে আমিরুল মুমিনীন! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, যে ব্যক্তি তোমার ওপর এবং তোমার ইমামত ও ওলায়াতের ওপর সন্দেহ করে, সে রাসূলুল্লাহর প্রতি ঈমান আনেনি; এবং যে অন্য কাউকে তোমার ওপর প্রাধান্য দেয়, সে আল্লাহর সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন থেকে ফিরে গেছে; সেই দ্বীন যা আল্লাহ মানুষের জন্য পছন্দ করেন এবং বলেন: «وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا»-আমি ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করেছি। সেই আল্লাহ গাদীরের দিন তোমার ওলায়াতের মাধ্যমেই তাঁর দ্বীনকে পরিপূর্ণ করেছেন।

হে আলী! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তুমি সেই ব্যক্তি, যার সম্পর্কে মহিমান্বিত ও পরম করুণাময় আল্লাহ বলেছেন:

«وَأَنَّ هَٰذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ»-নিশ্চয় এটাই আমার সরল পথ, অতএব তোমরা এর অনুসরণ কর। (সূরা আনআম, ১৫৩)-এ সরল পথ দ্বারা তুমিই উদ্দেশ্য এবং এই আয়াত তোমার শানে নাযিল হয়েছে। আর রাসূল (সা.) যারা তোমার ও তোমার সত্যতা থেকে বিচ্যুত হয় ও অন্য পথ গ্রহণ করে, তাদের ওপর লানত করেছেন।

এই জিয়ারত চলতেই থাকে, যতক্ষণ না এই অনুচ্ছেদে পৌঁছায়:

«أَشْهَدُ أَنَّکَ لَمْ تَزَلْ لِلْهَوَی مُخَالِفًا وَلِلتُّقَی حَلِیفًا وَعَلَی کَظْمِ الْغَیْظِ قَادِرًا»-আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তুমি সর্বদা খেয়াল-খুশির বিরোধিতা করেছ, তাকওয়ার সাথী ছিলে, ক্রোধ সংবরণে সক্ষম ছিলে, মানুষকে ক্ষমা করার শক্তি রেখেছিলে, যখনই আল্লাহর অবাধ্যতা হতো তখনই ক্রুদ্ধ হতে এবং যখনই আল্লাহর আনুগত্য হতো তখনই সন্তুষ্ট হতে।

আল্লাহর সঙ্গে যেসব অঙ্গীকার ছিল তা পূর্ণ করেছ, তোমার ওপর যা সংরক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তা রক্ষা করেছ, আল্লাহ ও রাসূলের আমানতের হেফাজত করেছ, যেসব দায়িত্ব কাঁধে দেওয়া হয়েছিল তা পৌঁছিয়েছ এবং তোমাকে যা ওয়াদা দেওয়া হয়েছিল তার অপেক্ষায় থেকেছ।

«وَأَشْهَدُ أَنَّکَ مَا بَرِحْتَ فِی الْحَقِّ سَاعِیًا وَعَنِ الْحَقِّ غَیْرَ وَانٍ»-আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তুমি সর্বদা সত্যের পথে ছিলে, সত্য থেকে বিচ্ছিন্ন হওনি এবং সত্যের প্রতিরক্ষায় কখনো দুর্বলতা প্রদর্শন করনি। কখনো আল্লাহর দ্বীন ও তাঁর সন্তুষ্টির পথে আপস বা সমঝোতা করোনি, এবং শিথিলতা দেখাওনি।

আল্লাহর নিকট এ থেকে পনাহ চাই যে এর বিপরীত হোক; বরং যদি তুমি নিপীড়িতও হয়ে থাকো, তবে তা আল্লাহর জন্যই সহ্য করেছ এবং কাজটি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছ।

হে আলী! হে আমিরুল মুমিনীন! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে  «جَاهَدْتَ فِی اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ»؛-যথাযতভাবে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছ; যতক্ষণ না আল্লাহ তোমাকে তাঁর সান্নিধ্যে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং তিনি নিজ ইচ্ছায় তোমার রূহ কবজ করেছেন, তোমার শত্রুদের ওপর হুজ্জত পূর্ণ করেছেন, আর তুমি সবার ওপর পরিপূর্ণ হুজ্জতে পরিণত হয়েছ।

হে আমিরুল মুমিনীন! তোমার প্রতি সালাম-যিনি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করেছ, ধৈর্য সহকারে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছ, নিজের জান আল্লাহর দ্বীনের পথে কুরবান করেছ, তাঁর কিতাব অনুযায়ী আমল করেছ, তাঁর রাসূলের সুন্নাতের অনুসরণ করেছ,  «أَقَمْتَ الصَّلَاةَ وَآتَیْتَ الزَّکَاةَ وَأَمَرْتَ بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَیْتَ عَنِ الْمُنْکَرِ»-সালাত কায়েম করেছ, যাকাত দিয়েছ, সৎকাজের আদেশ দিয়েছ এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেছ।

যেমন আমি ইঙ্গিত করেছি, এই মর্যাদাগুলো চলতেই থাকে এবং আমিরুল মুমিনীন (আ.) যা কিছু সারাজীবনে ও ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে বীরত্ব, সংগ্রাম, একনিষ্ঠতা ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন, এই জিয়ারতনামার বাক্য ও অনুচ্ছেদে ক্রমাগত উল্লেখ করা হয়, যেন ইসলামের প্রাথমিক যুগে তাঁর সম্পর্কে যা কিছু বলা হয়েছিল তা আমরা যেন ভুলে না যাই।

«أقسم بالله قَسَمَ صِدق ...»-আমি সত্যতার শপথে আল্লাহর শপথ করে বলছি যে, নবী ও তাঁর পরিবার (আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক তাদের ওপর) সৃষ্টির সেরা ব্যক্তি; আর তুমি আমার মওলা এবং মুমিনদের মওলা। তুমি আল্লাহর বান্দা, আল্লাহর ওলী, রাসূলুল্লাহর ভাই, তাঁর ওসী ও উত্তরাধিকারী।

তুমি সেই ব্যক্তি, যার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

«وَالَّذِی بَعَثَنِی بِالْحَقِّ مَا آمَنَ بِی مَنْ جَحَدَکَ»-যে সত্তা আমাকে সত্যের সঙ্গে প্রেরণ করেছেন, তাঁর শপথ করে বলছি, যে তোমাকে অস্বীকার করল সে আমার প্রতি ঈমান আনেনি।

আর যে তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হলো, সে ভ্রান্ত পথে চলল এবং সঠিক পথে পদার্পণ করল না।

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তুমি আল্লাহর বান্দাদের ওপর তাঁর দলীল, সৎপথের দিশারি এবং পরকালের পথের পথপ্রদর্শক।

মহান আল্লাহ সর্বদা তোমার নাম ও মর্যাদা উন্নত করেছেন:

«رفع الله فی أولی منزلتک و أعلی فی الآخرة درجتک».-দুনিয়াতেও তোমার মর্যাদা উন্নত করেছেন এবং আখিরাতেও তোমাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেছেন।

«ولعن الله مستحل الحرمة منک و السالب لک حقک»-আল্লাহর লানত সে ব্যক্তির ওপর যে তোমার মর্যাদা লঙ্ঘন করেছে এবং তোমাকে তোমার হক থেকে বঞ্চিত করেছে।

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, যাদেরকে কিয়ামতের দিন উল্টো করে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে।

হে আলী! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তুমি পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট পথ। আর যেখানে মহান আল্লাহ বলেছেন:

«هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ»-যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান? (সূরা জুমার, ৯) – তুমি ‘যারা জানে’ -এর সুস্পষ্ট উদাহরণ।

তুমি সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর দ্বীন ও তাঁর রাসূলের দ্বীনের প্রতিরক্ষা করেছ। কুরআন তোমার মর্যাদা ঘোষণা করে। যেখানে আল্লাহ বলেন:

«فَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ عَلَى الْقَاعِدِينَ أَجْرًا عَظِيمًا»-আল্লাহ মুজাহিদদেরকে অমুজাহিদদের ওপর মহান পুরস্কারের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। (সূরা নিসা, ৯৫)-এটি তোমার সম্পর্কেই।

আর যেখানে বলেন:

«أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِّ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ»-তোমরা কি হাজিদের পানি পান করানো ও মসজিদুল হারামের তত্ত্বাবধানকে, সেই ব্যক্তির সমকক্ষ করছো, যে আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান এনেছে ও আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে? (সূরা তাওবা, ১৯)-এর সুস্পষ্ট উদাহরণ তুমি।

আর যেখানে বলেন:

«الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِنْدَ اللَّهِ»-যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে তাদের জানমাল দিয়ে জিহাদ করেছে, আল্লাহর কাছে তাদের মর্যাদা সর্বশ্রেষ্ঠ। (সূরা তাওবা, ২০)-এর উদাহরণও তুমি।

হে আলী! তুমি সেই ব্যক্তি, যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার ওলায়াত ঘোষণা করার নির্দেশ পেলেন এবং আল্লাহ বললেন:

«بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ...»-আপনার প্রতি আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা নাযিল হয়েছে, তা পৌঁছে দিন। (সূরা মায়েদা, ৬৭)-রাসূল (সা.) উটের জিনের সাহায্যে একটি মিম্বার তৈরির নির্দেশ দিলেন, তোমার হাত উপরে তুললেন এবং জনগণের কাছে আল্লাহর দাবি ও ইচ্ছা ঘোষণা করলেন।

সেই দীর্ঘ খুতবায় তিনি বললেন:

«ألستُ أولی بِکم مِن أَنفسکم؟» -আমি কি তোমাদের নিজেদের চেয়ে অধিক হকদার নই?

সবাই বলল: «اللهم بلی».

তখন তিনি আলীর হাত ধরে বললেন: «اللَّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ وَعَادِ مَنْ عَادَاهُ وَانْصُرْ مَنْ نَصَرَهُ وَاخْذُلْ مَنْ خَذَلَهُ.»-হে আল্লাহ! যে যার বন্ধুত্ব করো, তার বন্ধু হও; যে তার শত্রুতা করো, তার শত্রু হও; যে তাকে সাহায্য করো, তাকে সাহায্য করো; আর যে তাকে ত্যাগ করো, তাকে ত্যাগ করো।

পবিত্র কুরআনে আরও অন্যান্য আয়াত আলী (আ.)-এর শানে নাযিল হয়েছে। সূরা ‘হাল আতা’ (ইনসান) নাযিলের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে:

«و یطعمون الطعام علی حبه مسکیناً و یتیماً و أسیراً»-আর তারা (আহলে বাইত) খাদ্যের প্রতি নিজেদের ভালোবাসা সত্ত্বেও খাবার দান করে মিসকীন, ইয়াতীম ও বন্দীকে। (সূরা ইনসান, ৮)

আলী ছাড়া আর কে সে যে বলে পুত্রের কাছে,

যে আমার হত্যাকারী তোমার বন্দীদশায়,

এখন বন্দীর প্রতি দয়া করো।

তুমিই সেই ব্যক্তি যে সে মর্যাদার অধিকারী ছিলে:

«وَلَا نُرِيدُ مِنْكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا»-আর আমরা তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না। (সূরা ইনসান, ৯)-আর আল্লাহ তোমার স্বপক্ষে এ আয়াত নাযিল করেছেন।

আরও:

«وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ»-আর তারা নিজেদের ওপর অপরকে প্রাধান্য দেয়, এমনকি নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও। (সূরা হাশর, ৯)-হে আলী! এটাও তোমার হকেই।

আর যেখানে আল্লাহ কঠিন মুহূর্তে ধৈর্যশীল ও যুদ্ধক্ষেত্রে দৃঢ় ব্যক্তিদের কথা বলেন, তুমি সেই যুদ্ধ ও কঠিনতায় ধৈর্যশীল।

তুমি সেই ব্যক্তি, যার সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন:

«عَلِیٌّ یَقْسِمُ بِالسَّوِیَّةِ وَیَعْدِلُ فِی الرَّعِیَّةِ»-আলী সমানভাবে বণ্টন করেন এবং প্রজাদের প্রতি ন্যায়বিচার করেন।

তুমি সেসব সুবিদিত অবস্থান, পরিচিত মর্যাদা ও উল্লেখিত দিনগুলোর অধিকারী; সেই স্মরণীয় দিন, যেগুলোতে তুমি ভূমিকা রেখেছিলে; বদরের দিন, আহযাবের দিন এবং সেই অবস্থা যখন:

«زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَنَاجِرَ»-দৃষ্টিশক্তি লুটিয়ে পড়েছিল, প্রাণ কণ্ঠাগত হয়েছিল (সূরা আহযাব, ১০)-তখন সব চোখ উদ্বিগ্ন ছিল, হৃদয় গলায় চলে এসেছিল এবং মানুষ আল্লাহর সম্পর্কে নানা ধারণা পোষণ করতে শুরু করেছিল।

কিছু দল কল্পনা করছিল যে আল্লাহর ওয়াদা পূর্ণ হবে না এবং:

«وَزُلْزِلُوا زِلْزَالًا شَدِيدًا»-আর তারা প্রবণ কম্পনে প্রকম্পিত হয়েছিল। (সূরা আহযাব, ১১)-অনেকেই শিথিলতা প্রকাশ করেছিল।

মুনাফিক ও রোগাক্রান্ত হৃদয়ের লোকেরা বলছিল:

«مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ إِلَّا غُرُورًا»-আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন শুধু প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই না। (সূরা আহযাব, ১২)

আর মুনাফিকরা যারা বলছিল:

«يَا أَهْلَ يَثْرِبَ لَا مُقَامَ لَكُمْ فَارْجِعُوا»-হে ইয়াসরিবের অধিবাসীরা! তোমাদের জন্য অবস্থানের সুযোগ নেই, অতএব ফিরে যাও। (সূরা আহযাব, ১৩)-মদিনায় থেকো না, ফিরে যাও; ইসলামের কাজ শেষ হয়ে গেছে।

কেউ কেউ জিহাদ ছেড়ে দেওয়ার জন্য রাসূলের কাছ থেকে অনুমতি চাইত এবং বলত:

«إِنَّ بُيُوتَنَا عَوْرَةٌ»-নিশ্চয় আমাদের ঘরগুলো উন্মুক্ত। (সূরা আহযাব, ১৩)

কিন্তু এই সব দৃশ্যে যখন কাপুরুষ ও দুর্বল বিশ্বাসীরা মারণকাণ্ড থেকে পালানোর চেষ্টায় ছিল, হে আলী! তুমিই ছিলে যে দাঁড়িয়েছিলে, প্রতিরোধ করেছিলে, জিহাদ করেছিলে, তরোয়াল চালিয়েছিলে এবং ইসলাম তোমার জিহাদ ও তরোয়ালের শক্তিতেই এগিয়েছিল।

আমি এইটুকুতেই সংক্ষেপ করছি। হয়তো আমি যতটুকু উল্লেখ করলাম, গাদীরের ঈদের দিনে আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর এই পূর্ণাঙ্গ জিয়ারতে বর্ণিত মর্যাদা ও গুণাবলির এক-তৃতীয়াংশেও পৌঁছায়নি।

আমার আবেদন, দাবি ও অনুরোধ আপনাদের কাছে-সুযোগ মতো, গাদীরে খুমের দিনে ইমাম হাদী (আ.) থেকে বর্ণিত এই জিয়ারত পাঠের পাশাপাশি এর অনুচ্ছেদগুলোতে মনোযোগ দিন।

এই জিয়ারত হলো ইসলামের ইতিহাস ও প্রাথমিক যুগের ঘটনাবলির একটি পর্যালোচনা এবং আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর মর্যাদা ও গুণাবলির একটি অধ্যয়ন, যা একজন নিষ্পাপ ইমামের মুখে উচ্চারিত হয়েছে।

আমি আশা করি, মহান আল্লাহ এই আনন্দময় ঈদে গাদীর আমাদের সকলের জন্য বরকতময় করুন এবং ওলায়াতকে (অভিভাবকত্বকে)-যা শত্রু মোকাবেলার শক্তিশালী হাতিয়ার-একটি পূর্ণাঙ্গ নেয়ামত হিসেবে এই দেশে ও ইসলামের উম্মতের মধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত ও চিরস্থায়ী করুন।

আমাদের জাতিকে যেন তাওফিক দেন যে, ওলায়াতের সাথে তারা যে মিথ্যুক (অঙ্গীকার) করেছে-ইমামগণের (আ.) ওলায়াতের সাথে, ফকিহের ওলায়াতের সাথে, ইমাম খোমেনী ও আমাদের শহীদ ইমামের সাথে এবং সালেহ-পরবর্তী সালেহ খলীফার সাথে-তারা গাদীরে খুমের সেই চুক্তি ও অঙ্গীকারের মতো তা নবীকরণ করে ও তাতে অটল থাকে।

হে আল্লাহ! আমাদের আলী (আ.)-এর বন্ধু ও প্রেমিকদের অন্তর্ভুক্ত করো; ঈদে গাদীর আমাদের সবার জন্য বরকতময় করো এবং ইমাম জামানার (আ.) আবির্ভাব ত্বরান্বিত করে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করো।

এই দিনটি আলী (আ.)-এর সকল অনুসারী ও প্রেমিকদের জন্য শুভ হোক।

ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha