গাদীরে খুমের ঘটনা ও ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয়, নিয়ে হাওজা নিউজ এজেন্সি’র সঙ্গে কথা বলেছেন পশ্চিম বঙ্গের আলেম মোবাল্লিগ ও হাওজা ইলমিয়া আমিরুল মুমেনিন (নাজাফী হাউস) এর শিক্ষক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা জয়নুল আবেদীন সাহেব-যার সারসংক্ষেপ পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি:
হাওজা নিউজ এজেন্সি: আসসালামু আলাইকুম, মাওলানা সাহেব। আমাদের সময় দিয়ে আলোচনায় রাজি হওয়ার জাজাকুমুল্লাহু খাইরান।
মাওলানা জয়নুল আবেদীন: ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ। আপনাদের প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। আমি যা জানি, তা ভাগ করে নিতে পেরে খুশি হব।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। প্রথমেই জানতে চাই, পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় পরিচয়ে গাদীরে খুমের ঘটনা কী স্থান দখল করে আছে?
মাওলানা জয়নুল আবেদীন: দেখুন, গাদীরে খুমের ঘটনার তাৎপর্য মুসলমানদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখা হয়। সবার দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। মুসলমানদের প্রধান দুটি ধারার মধ্যে-শিয়া ও সুন্নি-উভয়েই গাদীরের ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন ঠিকই, তবে এর ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য সম্পর্কে তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশেও এই ভিন্নতা স্পষ্ট।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: সুন্নি মুসলমানরা এই ঘটনাটি কীভাবে বোঝেন? তাদের দৃষ্টিভঙ্গিটি আমাদের জন্য পরিষ্কার করবেন কি?
মাওলানা জয়নুল আবেদীন: অবশ্যই। সুন্নি মুসলমানরা গাদীরে খুমকে ইসলামের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখেন। তাদের মতে, হজ থেকে ফেরার পথে রাসূলুল্লাহ (সা:) মুসলমানদের উদ্দেশ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন, যেখানে তিনি ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং উম্মাহর বিভিন্ন দায়িত্ব সম্পর্কে নসীহত করেন। একই সঙ্গে তিনি হযরত আলীর মর্যাদা ও গুরুত্বও তুলে ধরেন।
আহলে সুন্নাতের মতে, এর পেছনে একটি বিশেষ প্রেক্ষাপট ছিল। আর তা হল ইয়েমেনে দায়িত্ব পালন করার সময় হযরত আলীর সঙ্গে কিছু সাহাবির মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। গনীমতের মাল বণ্টনসহ কয়েকটি বিষয়ে তারা অসন্তুষ্ট হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর কাছে অভিযোগ করে। রাসূলুল্লাহ (সা:) তখন হযরত আলীর পক্ষ নিয়ে বলেন : আলী আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দৃঢ় এবং তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা ঠিক নয়।
সুন্নি আলেমদের মতে, আল্লাহর রাসূল মক্কায় সাহাবীদের বোঝানোর পরেও তাদের মধ্যে হজরত আলীকে নিয়ে কথাবার্তা হতে থাকে। এই কারণে গাদীরে খুমে আল্লাহর রাসূল (সা:) আবারও হযরত আলীর মর্যাদা স্পষ্ট করার জন্য বলেন: “আমি যার মাওলা, আলীও তার মাওলা।”
তাদের ব্যাখ্যায় এখানে “মাওলা” বলতে নেতা বা খলিফা বোঝানো হয়নি, বরং প্রিয়জন, বন্ধু, সাহায্যকারী ও সম্মানিত ব্যক্তি বোঝানো হয়েছে। তাই আহলে সুন্নাতের বিশ্বাস হলো, গাদীরে খুমের মূল উদ্দেশ্য ছিল হযরত আলীর প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান প্রতিষ্ঠা করা এবং তাঁর বিরুদ্ধে সৃষ্ট ভুল ধারণা দূর করা — খিলাফত বা উত্তরাধিকার ঘোষণা করা নয়।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: অপরদিকে, শিয়া মুসলিমরা এই ঘটনাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেন? তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও সুন্নিদের থেকে মূল পার্থক্যটি কোথায়?
মাওলানা জয়নুল আবেদীন: শিয়া মুসলিমরা মনে করেন, গাদীরে খুমের ঘটনার সঙ্গে ইয়েমেনের ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। ইয়েমেনের ঘটনা সম্পর্কে যা কিছু অভিযোগ ইত্যাদি ছিল, সেটা মক্কাতেই সমাপ্ত হয়ে গিয়েছিল যখন আল্লাহর রাসূল (সা:) অভিযোগকারীদেরকে কঠোরভাবে বুঝিয়ে দেন।
কেননা যদি শুধু কয়েকজন সাহাবির অভিযোগের জবাব দেওয়াই উদ্দেশ্য হতো, তাহলে রাসূলুল্লাহ (সা:) মদিনায় পৌঁছেও তা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি হজ থেকে ফেরার পথে গাদীরে খুম নামক স্থানে লক্ষাধিক হাজীকে থামিয়ে, আগে চলে যাওয়া লোকদের ফিরিয়ে আনলেন এবং পিছিয়ে থাকা লোকদের জন্য অপেক্ষা করলেন। এরপর তিনি একটি দীর্ঘ ভাষণ দেন।
শিয়াদের মতে, এত বড় আয়োজন শুধুমাত্র হযরত আলীকে ভালোবাসার আহ্বান জানানোর জন্য ছিল না, বরং মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যতে নেতৃত্ব সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেওয়ার জন্য ছিল।
শীয়ারা বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) প্রথমে উপস্থিত লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “আমি কি মোমিনদের ওপর তাদের নিজেদের চেয়ে বেশি অধিকার রাখি না?” সবাই তখন উত্তর দিয়েছিল: “হ্যাঁ, কেন নয়!” এরপর তিনি বলেন: “আমি যার মাওলা, এই আলীও তার মাওলা।”
শিয়া ব্যাখ্যায় এখানে “মাওলা” শব্দের অর্থ বন্ধু বা প্রিয়জন নয়, বরং নেতা, অভিভাবক এবং কর্তৃত্বশীল ব্যক্তি। কারণ এই কথা বলার আগে রাসূল (সা:) নিজের কর্তৃত্ব ও অধিকার সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। এছাড়াও শিয়ারা মনে করেন, গাদীরের ঘটনার পর অনেক সাহাবি হযরত আলীকে মুসলমানদের আমীর ও মাওলা হিসেবে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন, যেটা শিয়া-সুন্নি উভয়ের পুস্তকে বর্ণনা হয়েছে। শীয়াদের মতে, যদি এটি শুধুমাত্র ভালোবাসা বা সম্মান প্রদর্শনের ঘোষণা হতো, তাহলে সেই অভিনন্দনের বিশেষ তাৎপর্য থাকত না।
তাই শিয়া বিশ্বাস অনুযায়ী, গাদীরে খুম ছিল হযরত আলীর ইমামত ও নেতৃত্ব ঘোষণার ঘটনা — রাসূলুল্লাহ (সা:) তাঁর পরে মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বের জন্য হযরত আলীকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: এই ভিন্ন ব্যাখ্যার প্রেক্ষিতে, ভারতের মুসলমানরা কীভাবে এই ঘটনাকে পালন বা স্মরণ করেন?
মাওলানা জয়নুল আবেদীন: খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একই ঘটনাকে শিয়া ও সুন্নি মুসলিমরা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে থাকেন। সুন্নিরা এটিকে হযরত আলীর মর্যাদা ও ভালোবাসা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা হিসেবে দেখেন, আর শিয়ারা এটিকে তাঁর ইমামত ও নেতৃত্ব তথা খেলাফত ঘোষণার ঘটনা হিসেবে মনে করেন।
আর সেই হিসেবে শিয়ারা এই দিনটিকে প্রতি বছর ঈদ-এ-গাদীর হিসেবে উদযাপন করেন। তারা মহফিল ও খুশির অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন, যা সুন্নি মুসলমান ভাইয়েরা করেন না। পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের শিয়া মুসলমানদের কাছে এটি একটি বড় ধর্মীয় উৎসব। অন্যদিকে সুন্নি সম্প্রদায় সাধারণত এই দিনটিকে বিশেষভাবে উদযাপন না করলেও, ঘটনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকার করে থাকেন।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: শেষ কথা হিসেবে, আপনি এই ভিন্নতা নিয়ে উপমহাদেশের মুসলমানদের কী বার্তা দিতে চান?
মাওলানা জয়নুল আবেদীন: আমার বক্তব্য হলো, মতভেদ থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ভিন্নতা যেন আমাদের বিভক্ত না করে। গাদীরে খুমের ঘটনা আমাদের সবার জন্য শিক্ষা বহন করে — ন্যায়বিচার, নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা, এবং রাসূলের (সা.) পরিবারের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান। আমরা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি, কিন্তু একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান করা আমাদের কর্তব্য। আল্লাহ সবাইকে হিদায়াত দান করুন।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: মাওলানা সাহেব, সময় দিয়ে আমাদের আলোকিত করার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।
মাওলানা জয়নুল আবেদীন: আপনাকেও ধন্যবাদ। আল্লাহ হাফেজ।
আপনার কমেন্ট