হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, রুশ সংবাদ সংস্থা 'তাস'-এর বরাতে জানা গেছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা এবং সেন্ট পিটার্সবার্গ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরামের আয়োজক কমিটির দায়িত্বশীল সচিব আন্তন কুবিয়াকভ এই অনুষ্ঠান শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেছেন যে, পশ্চিমা বিশ্ব আবারও ফ্যাসিবাদকে পুনর্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিন্তু রাশিয়া নিজেকে রক্ষার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
তিনি বলেন, কোনো ধরনের আগ্রাসন হলে রাশিয়া নিজেদের সব উপকরণ ও সামর্থ্য ব্যবহার করে প্রতিরক্ষা করবে, যাতে চিরকালের জন্য দেশটিতে আক্রমণের প্রবণতা দূর করা যায়।
তিনি বলেন, আজ পশ্চিমা বিশ্ব আবারও ফ্যাসিবাদী চিন্তাধারাকে পুনর্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং মনে হচ্ছে তাদের ঐতিহাসিক স্মৃতি খুবই স্বল্পস্থায়ী। যদি পশ্চিমা দেশগুলো মনে করে যে তারা ৮৫ বছর আগের মতো 'পূর্ব দিকে অভিযান' চালিয়ে সফল হতে পারবে, তাহলে তারা ভয়ানক ভুল করছে। রাশিয়া এবার ভিন্ন প্রতিরক্ষামূলক উপকরণ ও সামর্থ্য ব্যবহার করবে। আমরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণের ইচ্ছা ও প্রবণতা চিরকালের জন্য দূর করে দেব।
ভ্লাদিমির পুতিনের এই উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেন যে, রাশিয়া ধারাবাহিকভাবে সব দেশকে বাস্তববাদী ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক অংশীদারিত্বের প্রস্তাব দিয়ে আসছে, অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার সাথে সংঘর্ষ ও যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছে। তাঁর মতে, পশ্চিমা বিশ্ব আবারও যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে, কারণ বৈশ্বিক ঋণ সমস্যা আবারও দিগন্তে দেখা দিয়েছে।
এই রুশ কর্মকর্তার মতে, বিশ্ব আজ পশ্চিমা দেশগুলোর 'ধ্বংসাত্মক মৃত্যু' থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নতুন ব্যবস্থা খুঁজে বের করার প্রয়োজন। তিনি বলেন, ইউরেশীয় নিরাপত্তা মডেল এমনই একটি ব্যবস্থা, যা রাশিয়া তার অংশীদারদের সাথে গঠন করছে এবং এটি ক্রমশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
কুবিয়াকভ সেন্ট পিটার্সবার্গ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরামের ফলাফল সংক্ষেপ করে এই সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বিশ্বের একটি বড় অংশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন প্রতিষ্ঠান এবং ধারণার প্রয়োজন অনুভব করছে, যার মধ্যে রয়েছে আর্থিক সহযোগিতা থেকে শুরু করে সামরিক বিষয়, প্রযুক্তি বিনিময় ও বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা। বিশ্বব্যবস্থার রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গঠন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।
আমেরিকা ইউক্রেনের আলোচনা প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে
রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা স্মরণ করিয়ে দেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অস্থিতিশীলতা, বিশ্বব্যাপী বিশৃঙ্খলা এবং বিশ্বের অনেক সংঘাতের মূল কারণ। তিনি মনে করেন, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জোরদারের বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মন্তব্য ওয়াশিংটনের এই উপলব্ধি থেকে উদ্ভূত যে, এই সংঘাতের ফলাফল মস্কোর পক্ষে যাচ্ছে।
আন্তন কুবিয়াকভ সাংবাদিকদের ব্যাখ্যা করে বলেন, লক্ষ্য করুন, আমেরিকা কীভাবে ইউক্রেনের শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। মার্কো রুবিও স্পষ্টভাবে বলছেন যে, তিনি এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার আর কোনো কারণ দেখেন না। এটি বোধগম্য, কারণ আমেরিকা নিজেই এই সংঘাতে আগুন জ্বালিয়েছে, সবাইকে এতে টেনে এনেছে এবং এখন ভান করছে যে তারা মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করতে পারে।
প্রকৃতপক্ষে, এই পরিস্থিতি তাদের জন্য বিরাট মুনাফা এনে দিয়েছে। কেন মার্কো রুবিও এবং আমেরিকার কংগ্রেস দুদিন আগে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জোরদারের প্রস্তাব দিয়েছেন? উত্তর সহজ: তারা বুঝতে পেরেছে যে বিশেষ সামরিক অভিযানের ফলাফল তাদের পক্ষে যাচ্ছে না; বরং পরিস্থিতি রাশিয়ার পক্ষে এগোচ্ছে। তাই তারা এখন যথাসম্ভব আমাদের দেশের জন্য পরিস্থিতি কঠিন করার চেষ্টা করছে।
সেন্ট পিটার্সবার্গ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরামের আয়োজক কমিটির দায়িত্বশীল সচিব স্মরণ করিয়ে দেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া-মার্কিন সম্পর্ককে সেই অচলাবস্থা থেকে বের করে এনেছেন যা জো বাইডেনের প্রেসিডেন্সির সময় তৈরি হয়েছিল। তিনি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে যে, তিনি রাশিয়া-আমেরিকা সম্পর্ককে সেই আলোচনার অচলাবস্থা থেকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছেন, যেখানে জো বাইডেন এই সম্পর্কগুলোকে নিমজ্জিত করেছিলেন।
কুবিয়াকভ আরও যোগ করেন যে, রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক যদিও ধীরগতিতে, তবুও উন্নত ও পুনর্গঠিত হচ্ছে এবং বর্তমান প্রক্রিয়া দুই দেশের মধ্যে সংলাপ ও মিথস্ক্রিয়ার চ্যানেল পুনরুদ্ধারের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
ইউরোপ ইউক্রেনকে নিজেদের 'অর্থ পাচারের কেন্দ্রে' পরিণত করেছে
রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা মনে করেন, ইউরোপীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারা ইউক্রেনকে আয় উপার্জন ও নিজেদের লক্ষ্য অগ্রসরের হাতিয়ারে পরিণত করেছেন। কুবিয়াকভ বলেছেন, অ্যাংলো-স্যাক্সন দেশগুলোর লক্ষ্য ছিল ইউরেশিয়ায় বড় সংঘাতের দিকে পরিস্থিতি ঠেলে দেওয়া, যা কিছুটা হলেও বাস্তবায়িত হয়েছে। এই বড় খেলায় ইউক্রেন সংকট একটি মূল প্রকল্পে পরিণত হয়। পশ্চিমা দেশগুলো এই সংঘাতে উসকানি দেওয়ার পর ধীরে ধীরে ইউক্রেনকে-যাকে তারা দাবি করেছিল রক্ষা করছে-আক্রমণের হাতিয়ার এবং একইসঙ্গে আয় উপার্জনের মাধ্যম বানিয়ে ফেলে। এটি তাদের জন্য একটি খুব সহজ ব্যবস্থা। প্রকৃতপক্ষে, আজকের ইউক্রেন লন্ডন, ব্রাসেলস এবং বার্লিনের সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য অর্থ পাচারের স্থানে পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেছেন, পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেন সংকটকে শুধু ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য অগ্রসরের জন্যই নয়, বরং নিজেদের আর্থিক স্বার্থ হাসিলের জন্যও ব্যবহার করছে।
ইউক্রেন একটি জনসংখ্যাগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি, যেখান থেকে উত্তরণ কঠিন হবে
আন্তন কুবিয়াকভ সতর্ক করে বলেছেন যে ইউক্রেনের জনসংখ্যা প্রায় ২০ মিলিয়নে নেমে এসেছে এবং দেশটি গভীর জনসংখ্যাগত বিপর্যয়ের সম্মুখীন। তিনি বলেন, ইউক্রেনের জনসংখ্যা এখন ২০ মিলিয়নে নেমেছে। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে দেশটির জনসংখ্যা ছিল ৫২ মিলিয়ন। এটি একটি জনসংখ্যাগত বিপর্যয়, যেখান থেকে উত্তরণ অত্যন্ত কঠিন হবে। যেসব ইউক্রেনীয় দেশ ছেড়ে অন্য দেশে নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে, তারা সম্ভবত নিজ মাতৃভূমিতে আর ফিরে আসবে না।
আপনার কমেন্ট