বুধবার ১০ জুন ২০২৬ - ১২:২৩
জ্ঞানের পুনর্জাগরণ-মুসলিম সমাজের টেকসই উন্নয়নের একমাত্র পথ

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে মুসলিম সমাজ নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মুখোমুখি। একদিকে ধর্মীয় আবেগ ও ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ, অন্যদিকে আধুনিক জ্ঞান, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা হলো-আবেগকে প্রাধান্য দিলে প্রজ্ঞা পিছিয়ে যায়, প্রতিক্রিয়ার বশবর্তী হয়ে পড়লে প্রস্তুতি দুর্বল হয়, আর ক্ষণিকের বিতর্কে লিপ্ত থাকলে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়ে। এই নিবন্ধে আমরা ধাপে ধাপে আলোচনা করব কেন শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও দক্ষতা অর্জন আজ মুসলিম সমাজের সবচেয়ে বড় ফরজ, এবং কীভাবে আবেগের পরিবর্তে প্রজ্ঞা, প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে প্রস্তুতি ও বিতর্কের পরিবর্তে উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমাজকে পরিবর্তন করা সম্ভব।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, জ্ঞানের পুনর্জাগরণ-মুসলিম সমাজের টেকসই উন্নয়নের একমাত্র পথ

ভূমিকা: সংকটের মূল চিহ্নিতকরণ

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে মুসলিম সমাজ নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মুখোমুখি। একদিকে ধর্মীয় আবেগ ও ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ, অন্যদিকে আধুনিক জ্ঞান, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা হলো-আবেগকে প্রাধান্য দিলে প্রজ্ঞা পিছিয়ে যায়, প্রতিক্রিয়ার বশবর্তী হয়ে পড়লে প্রস্তুতি দুর্বল হয়, আর ক্ষণিকের বিতর্কে লিপ্ত থাকলে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়ে। এই নিবন্ধে আমরা ধাপে ধাপে আলোচনা করব কেন শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও দক্ষতা অর্জন আজ মুসলিম সমাজের সবচেয়ে বড় ফরজ, এবং কীভাবে আবেগের পরিবর্তে প্রজ্ঞা, প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে প্রস্তুতি ও বিতর্কের পরিবর্তে উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমাজকে পরিবর্তন করা সম্ভব।

প্রথম অংশ: বর্তমান মুসলিম সমাজের মূল সমস্যা-‘আবেগের জয়গানে জ্ঞানের পরাজয়

১. সামাজিক মাধ্যম ও অনর্থক বিতর্কের জাল

গত এক দশকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার অস্বাভাবিক বেড়েছে। ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, টিকটক-সর্বত্র দেখা যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা আদর্শগত তর্ক। কেউ কাউকে বোঝাতে পারে না, বরং সময়, শক্তি এবং মানসিক শান্তি নষ্ট হয়। অথচ এই সময়টুকু যদি কোনো দক্ষতা অর্জনে, কোনো বই পড়তে, কোনো অনলাইন কোর্স করতে ব্যয় করা হতো, তাহলে আজ মুসলিম তরুণেরা সিলিকন ভ্যালি, জার্মানির টেকনোলজি পার্ক বা চীনের উদ্ভাবনী কেন্দ্রে নেতৃত্ব দিচ্ছিল।

২. দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব

আবেগ-চালিত প্রতিক্রিয়ার কারণে বেশিরভাগ মুসলিম সংগঠন ও ব্যক্তি ‘দমে যায়’ অল্প সময়ে। যেমন: একটি অপবাদমূলক পোস্ট দেখে সাথে সাথে বিক্ষোভ করা, কিন্তু নিজের এলাকার স্কুল, হাসপাতাল বা লাইব্রেরির উন্নয়নে কেউ তেমন আগ্রহী নয়। ক্ষণিকের রাগ মেটে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কিছু বদলায় না।

৩. জ্ঞানের চেয়ে বাগ্মিতাকে প্রাধান্য

আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, যিনি জোরে কথা বলেন, যিনি আরবি বা উর্দুতে কিছু শ্লোগান দিতে পারেন, তিনিই ‘পণ্ডিত’ হিসেবে গণ্য হন। অথচ প্রকৃত পণ্ডিতি আসে গভীর জ্ঞান, যুক্তি, গবেষণা ও যাচাইকৃত তথ্য থেকে। আবেগের কথায় কোনো জাতি উন্নত হয়নি।

দ্বিতীয় অংশ: শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা-ইতিহাসের অভিসন্দর্ভ

ইসলামের প্রথম আদেশ ইকরা (পড়ো)

পবিত্র কুরআনের প্রথম পাঁচ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন: “পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন...” (সূরা আলাক, ১-৫)। এখানে ‘পড়া’ বলতে শুধু ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, বরং মহাবিশ্বের প্রতিটি নিদর্শন, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস-সব কিছু পড়া বোঝায়। নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন: “জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ।”

ইতিহাসের স্বর্ণযুগ: জ্ঞানই ছিল শক্তি

- বাগদাদের বাইতুল হিকমা (জ্ঞানঘর): অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম বিশ্ব ছিল জ্ঞানের কেন্দ্র। এখানে গণিত (বীজগণিত), জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা, রসায়ন, দর্শন, ভূগোলে অসাধারণ অগ্রগতি হয়।

- আল-খোয়ারিজমি (আলগোরিদমের জনক), ইবনে সিনা (চিকিৎসাশাস্ত্রের পিতামহ), আল-বিরুনি (ভূগোল ও নৃবিজ্ঞান)-এসব মনীষী ছিলেন কট্টর মুসলিম। তারা ধর্ম ও বিজ্ঞানকে পরস্পরবিরোধী মনে করতেন না।

- পতন শুরু হয় যখন জ্ঞানের চর্চা কমে গেল, অন্ধ অনুসরণ বাড়ল, আবেগ ও গোঁড়ামি বিজ্ঞানকে দমন করল।

শিক্ষা ছাড়া মর্যাদা নেই

আজ বিশ্বে যতটুকু বৈষম্য, দারিদ্র্য, নেতৃত্বের অভাব মুসলিম সমাজে দেখা যায়, তার মূলে রয়েছে শিক্ষার অভাব। ইউনেস্কোর রিপোর্ট অনুযায়ী, পৃথিবীর ৪০% নিরক্ষর প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম দেশগুলিতে বাস করেন। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে মুসলিম দেশগুলোর পেটেন্ট ও গবেষণাপত্রের সংখ্যা বিশ্বের মাত্র ২-৩%। অথচ জনসংখ্যা প্রায় ২৫%।

তৃতীয় অংশ: দক্ষতা অর্জন ও নৈতিক চরিত্র গঠন-দুই চাকার গাড়ি

শুধু ডিগ্রি নয়, লাগসই দক্ষতা (skill) প্রয়োজন। একজন মুসলিম তরুণ যদি চমৎকার প্রোগ্রামার, দক্ষ ডাক্তার, চমৎকার ব্যবসায়ী বা সৃজনশীল শিল্পী হতে পারেন, তাহলে তিনি সমাজের মূল্যবান সম্পদ। আবেগের বাণী দিয়ে ক্ষুধা মেটে না, বরং কলম ও কারিগরি দক্ষতা দিয়ে মেটে।

প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন

বর্তমান চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সময় আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ব্লকচেইন, রোবোটিকস, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর যুগে আছি। মুসলিম সমাজ যদি এসব ক্ষেত্রে নিজেদের পজিশন না করে, তবে তারা হবে কেবল ব্যবহারকারী, নির্মাতা নয়। নিজেরা না তৈরি করলে নির্ভরশীলতা কখনো কমবে না।

ব্যবসা ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা

নবী করিম (সা.) ব্যবসাকে অত্যন্ত পছন্দ করতেন। সাহাবিরা যেমন আব্দুর রহমান ইবনে আউফ ব্যবসার মাধ্যমে অসাধারণ সফলতা এনে সমাজে দান-খয়রাত করেছেন। আজ মুসলিম সমাজের দারিদ্র্যের একটি কারণ হলো উদ্যোক্তা সংস্কৃতির অভাব। চাকরির পেছনে ছোটার চেয়ে বেশি প্রয়োজন দক্ষ উদ্যোক্তা তৈরি করা।

নৈতিক চরিত্র: ব্যাকবোন অফ সাকসেস

জ্ঞান ও দক্ষতা যদি নৈতিকতা ছাড়া হয়, তবে সেটি ধ্বংসাত্মক হতে পারে। কুরআনে বারবার বলা হয়েছে: “নিশ্চয় আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন যারা ভালো কাজ করে” (সূরা বাকারা, ১৯৫)। সুতরাং শিক্ষার সাথে সাথে সততা, দায়িত্ববোধ, সহানুভূতি, পরিশ্রম এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলার সাহস-এগুলো গড়ে তুলতে হবে। একজন অসাধু বিজ্ঞানী যেমন ধ্বংস ডেকে আনে, তেমনি একজন দক্ষ কিন্তু নীতিহীন ব্যবসায়ীও সমাজের জন্য ক্যান্সার।

চতুর্থ অংশ: প্রতিবাদ-সংস্কৃতি বনাম নির্মাণ-সংস্কৃতি

আমরা কীসের প্রতিবাদ করি?

আজ মুসলিম বিশ্বের বহু স্থানে প্রতিবাদে পথ বন্ধ করা, চাকা পোড়ানো, বিদেশি পণ্য বর্জন (যা ভালো), কিন্তু নিজের মাঠে ফলন বাড়ানোর বা নিজের কলকারখানা গড়ার চিন্তা নেই। অর্থাৎ, আমাদের প্রতিবাদের লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।

প্রকৃত প্রতিবাদ হওয়া উচিত:

১. নিজের অজ্ঞতার বিরুদ্ধে-যে অজ্ঞতা আমাদের পশ্চাৎপদ রাখে।

২. দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে-যা আমাদের অন্যের মুখাপেক্ষী করে।

৩. কুসংস্কারের বিরুদ্ধে-যা ধর্মের নামে প্রচলিত কিন্তু ইসলামের বিরোধী।

৪. লুটেরা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে-যারা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ আত্মসাৎ করে।

৫. নির্লজ্জ অলসতার বিরুদ্ধে-যা কর্মচাঞ্চল্যকে হত্যা করে।

আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা হওয়া উচিত কলম ও জ্ঞান, এবং সেরা অস্ত্র সৎকর্ম। একজন শিক্ষিত ব্যক্তির লেখা একটি নিবন্ধ, একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, একটি দরকারি অ্যাপ, একটি সৎ ব্যবসা-এগুলো শত বিক্ষোভের চেয়েও বেশি পরিবর্তন আনে।

পঞ্চম অংশ: কীভাবে শুরু করবেন-ব্যক্তি থেকে সমাজ

১. ব্যক্তিগত পর্যায়

- দৈনিক নির্দিষ্ট সময় জ্ঞানচর্চার জন্য রাখুন (কমপক্ষে ১ ঘণ্টা)।

- সামাজিক মিডিয়ায় টাইম ব্লকিং করুন, অর্থহীন গ্রুপ থেকে বেরিয়ে আসুন।

- একটি দক্ষতা বেছে নিন (কোডিং, লেখা, ডিজাইন, ভাষা, মার্কেটিং) এবং তাতে মাস্টার হন।

- নিয়মিত ভালো বই পড়ুন-ইতিহাস, বিজ্ঞান, জীবনী, মনোবিজ্ঞান।

- নিজের প্রতিবাদকে পণ্য বা সেবায় রূপ দিন। যেমন: অসুস্থতা দেখে শুধু কান্না না করে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে গবেষণা করুন।

২. পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়

- সন্তানদের মুখস্থ ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিত ও যুক্তিবিদ্যা শেখান।

- বাড়িতে মিনি লাইব্রেরি তৈরি করুন।

- প্রতিবেশীদের নিয়ে ‘লার্নিং সার্কেল’ গঠন করুন, সপ্তাহে একদিন জ্ঞানালোচনা করুন।

- মসজিদগুলোতে শুধু নামাজ ও আলোচনার আসর নয়, কম্পিউটার ল্যাব, টিউটোরিয়াল সেন্টার ও ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং শুরু করুন।

৩. প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্ব পর্যায়

- মুসলিম দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থাকে সংস্কার করতে হবে: মুখস্থনির্ভরতা বাদ দিয়ে ক্রিটিক্যাল থিংকিং, প্রজেক্ট বেসড লার্নিং চালু করতে হবে।

- গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে: জিডিপির অন্তত ১% গবেষণায় খরচ করতে হবে।

- টেকনিক্যাল ভোকেশনাল ট্রেনিং বাধ্যতামূলক করতে হবে।

ইনশাআল্লাহ, আলো আসবেই

অতীতে মুসলিম সমাজ যখন জ্ঞানের পথে হেঁটেছে, তখনই তারা সভ্যতার নেতৃত্ব দিয়েছে। আজ আমরা যদি সেই পথে ফিরি-আবেগের পরিবর্তে প্রজ্ঞা, প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে প্রস্তুতি, বিতর্কের পরিবর্তে উন্নয়নকে প্রাধান্য দিই-তাহলে বর্তমান হতাশার অন্ধকার কেটে যাবে।

আমাদের কলম হোক জ্ঞানের পেন্সিল, আমাদের কাজ হোক প্রমাণ, এবং আমাদের প্রার্থনা হোক দৃঢ়তা। নিজের দুর্বলতার বিরুদ্ধে সজ্জিত প্রতিবাদই হোক আমাদের সকালের সূচনা।

শেষ কথাটি মনে রাখবেন: “যে ব্যক্তি জ্ঞানের পথে পাড়ি দেয়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করেন।”

তাই চলুন, আজ থেকেই শুরু করা যাক-একটি বই হাতে নিয়ে, একটি দক্ষতা শিখে, একটি সৎকাজ করে। ইনশাআল্লাহ, পরিবর্তন আসবেই। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।

মজিদুল ইসলাম শাহ

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha