বুধবার ১০ জুন ২০২৬ - ১৬:৪২
যুদ্ধের অবসান নিয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ভিন্ন অবস্থান কেন?

পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে দৃশ্যমান মতপার্থক্যের মূল কারণ কৌশলগত লক্ষ্য নয়, বরং রাজনৈতিক টিকে থাকার ভিন্ন বাস্তবতা। নেতানিয়াহুর জন্য যুদ্ধের ধারাবাহিকতা রাজনৈতিক প্রয়োজন, আর ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ এড়ানো রাজনৈতিক অগ্রাধিকার।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাবলি আবারও দেখিয়েছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যকার দূরত্বের কারণ ইরানকে ঘিরে কোনো মৌলিক কৌশলগত মতবিরোধ নয়। বরং এর পেছনে কাজ করছে তাদের রাজনৈতিক টিকে থাকার ভিন্ন চাহিদা। উভয় নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক সংকটের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত হলেও তাদের অগ্রাধিকার এক নয়। নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান অনেকাংশে সংকট ও যুদ্ধের ধারাবাহিকতার ওপর নির্ভরশীল, অন্যদিকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক স্বার্থ নতুন যুদ্ধ এড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত।

সম্প্রতি অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা এই মতপার্থক্যকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান ও ইসরায়েলের পারস্পরিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ট্রাম্প উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন যে পরিস্থিতি একটি সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলবে। এ কারণেই তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখার এবং ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের বৃহত্তর সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

প্রথম দৃষ্টিতে এটি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে কৌশলগত বিভেদের ইঙ্গিত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা আরও সূক্ষ্ম। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মৌলিক লক্ষ্যগুলোর মধ্যে বড় ধরনের কোনো পার্থক্য নেই। উভয়েই ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করতে চান, প্রতিরোধ অক্ষের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে এবং নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতা জোরদারের সমর্থক। বর্তমান দূরত্বের কারণ লক্ষ্যগত পার্থক্য নয়; বরং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের ভিন্নতা।

ক্ষমতায় ফিরে এসে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি বারবার বলেছেন, তাঁর প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো যুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনীকে জড়াতে চায় না। তাঁর রাজনৈতিক সমর্থকদের একটি বড় অংশও এই অবস্থানের সমর্থক। তাদের বিশ্বাস, কয়েক দশকের সামরিক হস্তক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রকে লাভবান করার পরিবর্তে দেশটির অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পদের অপচয় ঘটিয়েছে।

ট্রাম্প উপলব্ধি করেন যে ইরানের সঙ্গে বৃহত্তর কোনো সংঘাত জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, তেলের দাম বাড়াতে পারে, অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ ও সামরিক ঘাঁটিগুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘস্থায়ী সংকটে নিমজ্জিত করতে পারে। এমন পরিস্থিতি তাঁর অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে এবং রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে।

অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি ব্যাপক জনবিক্ষোভ, সামাজিক বিভাজন, বিচারিক বিতর্ক এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা সংকট ও যুদ্ধের পরিবেশ তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবে সহায়ক হয়ে উঠেছে। কারণ সংকটের সময় জনমতের দৃষ্টি প্রায়ই অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো থেকে সরে যায়।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সংকট নেতানিয়াহুকে নিজেকে ‘নিরাপত্তার রক্ষক’ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ দেয় এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা রাখতে সহায়তা করে। ফলে যুদ্ধবিরতি বা দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনা প্রশমন তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে এক মার্কিন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি এই বাস্তবতাকেই সংক্ষেপে তুলে ধরে। তাঁর ভাষায়, “নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক টিকে থাকার জন্য যুদ্ধের ধারাবাহিকতা প্রয়োজন, আর ট্রাম্পের রাজনৈতিক টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন যুদ্ধের সমাপ্তি।” বর্তমান পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে এই মন্তব্যটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে এই মতপার্থক্যকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে মৌলিক বিচ্ছেদ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের কৌশলগত সম্পর্ক এতটাই গভীর যে দুই নেতার রাজনৈতিক মতভেদের কারণে তা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম। বর্তমানে যা দেখা যাচ্ছে, তা মূলত সংকট ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি, সময় এবং মাত্রা নিয়ে কৌশলগত মতানৈক্য।

ট্রাম্পের দৃষ্টিতে ইরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা যেতে পারে, তবে তা এমন সীমার মধ্যে থাকতে হবে যাতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু মনে করেন সামরিক চাপ বৃদ্ধি ইসরায়েলের জন্য আরও অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই দুই নেতার মধ্যে উত্তেজনার প্রধান উৎস।

এদিকে, ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়াও এই মতপার্থক্যকে আরও প্রকট করেছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা দেখিয়েছে যে তেহরান সরাসরি জবাব দেওয়ার সক্ষমতা ও ইচ্ছা রাখে এবং যে কোনো উত্তেজনা দ্রুত আঞ্চলিক মাত্রা লাভ করতে পারে। ফলে ট্রাম্পের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তিনি উপলব্ধি করছেন যে ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে বৃহত্তর সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে।

অন্যদিকে, নেতানিয়াহুও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। অতীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বয়ংক্রিয় ও নিঃশর্ত সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে পারলেও এখন এমন এক মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছেন, যার অন্যতম অগ্রাধিকার হলো নতুন যুদ্ধ এড়ানো। ফলে নিজের কৌশল বাস্তবায়নে তাঁকে আগের তুলনায় বেশি সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

সবশেষে বলা যায়, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বর্তমান মতপার্থক্য মূলত যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যকার দ্বন্দ্ব নয়; বরং রাজনৈতিক টিকে থাকার দুটি ভিন্ন কৌশলের প্রতিফলন। ট্রাম্প মনে করেন, নতুন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়ানো থেকে বিরত রাখাই তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার উপায়। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান অনেকাংশে এমন এক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে নিরাপত্তা সংকট ও যুদ্ধের প্রশ্ন জনআলোচনার কেন্দ্রে থাকে।

যতদিন উভয় পক্ষের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা অপরিবর্তিত থাকবে, ততদিন এই স্বার্থগত দ্বন্দ্বও বহাল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে স্বল্পমেয়াদে যুদ্ধবিরতি বা উত্তেজনা প্রশমিত হলেও মতপার্থক্যের মূল কারণ দূর হবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবধান ইরান বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নয়; বরং দুই নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও ক্ষমতায় টিকে থাকার ভিন্ন কৌশল নিয়ে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha