হাওজা নিউজ এজেন্সি: মাহদাভিয়াতবিষয়ক ধারাবাহিক আলোচনা ‘আদর্শ সমাজের পথে’–এর এই পর্বে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-কে চেনার মৌলিক উপায়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
কেন ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-কে চেনা জরুরি?
এক ব্যক্তি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কাছে জানতে চাইলেন:
یَا ابْنَ رَسُولِ اللَّهِ بِأَبِی أَنْتَ وَأُمِّی، فَمَا مَعْرِفَةُ اللَّهِ؟
হে রাসূলুল্লাহর সন্তান! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গিত হোক। আল্লাহকে চেনার অর্থ কী?
ইমাম হুসাইন (আ.) জবাবে বলেন:
مَعْرِفَةُ أَهْلِ كُلِّ زَمَانٍ إِمَامَهُمُ الَّذِي يَجِبُ عَلَيْهِمْ طَاعَتُهُ
আল্লাহর পরিচয় লাভের অর্থ হলো, প্রত্যেক যুগের মানুষ সেই ইমামকে চিনবে, যার আনুগত্য তাদের ওপর অপরিহার্য।
[ইলালুশ শারায়ে, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৯]
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, যুগের ইমামকে চেনা আল্লাহর মারিফাতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর আমাদের যুগের ইমাম হলেন ইমাম মাহদী (আ.ফা.)। অতএব, তাঁকে চেনা ও তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হওয়া একজন মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব।
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-কে চেনার জন্য দোয়া
আহলে বাইত (আ.) সূত্রে বর্ণিত একটি প্রসিদ্ধ দোয়ায় বলা হয়েছে—
اللَّهُمَّ عَرِّفْنِي نَفْسَكَ، فَإِنَّكَ إِنْ لَمْ تُعَرِّفْنِي نَفْسَكَ لَمْ أَعْرِفْ نَبِيَّكَ. اللَّهُمَّ عَرِّفْنِي رَسُولَكَ، فَإِنَّكَ إِنْ لَمْ تُعَرِّفْنِي رَسُولَكَ لَمْ أَعْرِفْ حُجَّتَكَ. اللَّهُمَّ عَرِّفْنِي حُجَّتَكَ، فَإِنَّكَ إِنْ لَمْ تُعَرِّفْنِي حُجَّتَكَ ضَلَلْتُ عَنْ دِينِي
হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার পরিচয় দান করুন। আপনি যদি নিজেকে আমার কাছে পরিচিত না করেন, তবে আমি আপনার নবীকে চিনতে পারব না। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার রাসূলের পরিচয় দান করুন। আপনি যদি আপনার রাসূলকে আমার কাছে পরিচিত না করেন, তবে আমি আপনার হুজ্জতকে চিনতে পারব না। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার হুজ্জতের পরিচয় দান করুন। আপনি যদি আপনার হুজ্জতকে আমার কাছে পরিচিত না করেন, তবে আমি আমার দ্বীন থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ব।
[আল-কাফি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৪২]
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-কে চেনার প্রধান উপায়
১. নস (সুস্পষ্ট ঘোষণা)
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর ইমামত সম্পর্কে মহানবী (সা.) এবং পূর্ববর্তী নিষ্পাপ ইমামদের (আ.) অসংখ্য হাদিস ও সুস্পষ্ট বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। এসব বর্ণনায় তাঁর নাম, বংশপরিচয়, বৈশিষ্ট্য এবং বিশ্বব্যাপী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মিশনের কথা উল্লেখ রয়েছে। এ ধরনের সুস্পষ্ট ঘোষণাকে ‘নস’ বলা হয়, যা ইমামত প্রমাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
২. কারামত ও আল্লাহপ্রদত্ত নিদর্শন
আল্লাহর মনোনীত হুজ্জাতদের মাধ্যমে বিশেষ কারামত ও অলৌকিক নিদর্শন প্রকাশ পেতে পারে। এসব কারামত তাঁদের সত্যতা ও আল্লাহপ্রদত্ত মর্যাদার প্রমাণ বহন করে। যদিও ইমামত প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি নস, তবুও কারামত একজন সত্য ইমামের পরিচয় শনাক্ত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
৩. চরিত্র, জ্ঞান ও জীবনাচার
ইমামের জ্ঞান, নৈতিকতা, প্রজ্ঞা, জীবনযাপন, বক্তব্য ও আচরণ তাঁর পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। যারা সত্যকে অনুধাবনের যোগ্যতা রাখেন, তারা তাঁর চরিত্র ও জ্ঞানের গভীরতা থেকে তাঁর ঐশী মর্যাদা উপলব্ধি করতে পারেন।
[আয়াতুল্লাহ লুৎফুল্লাহ সাফি গুলপায়েগানি, পেইরামুনে মারিফাতে ইমাম, পৃ. ৭৭-৭৮]
ইমামের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ইমাম রেজা (আ.)-এর বর্ণনা
অষ্টম ইমাম, আলী ইবনে মূসা আর-রেজা (আ.) ইমামের মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন— “ইমাম হলেন আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে তাঁর আমানতদার, বান্দাদের ওপর তাঁর হুজ্জাত, পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি, আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী এবং তাঁর দ্বীনের রক্ষক।
ইমাম পাপ ও ত্রুটি থেকে পবিত্র। তিনি বিশেষ জ্ঞান ও অসাধারণ প্রজ্ঞার অধিকারী। তিনি দ্বীনের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেন, মুসলমানদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং সত্যের শত্রুদের মোকাবিলা করেন।
ইমাম তাঁর যুগের একক ও অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব। মর্যাদা, জ্ঞান ও গুণাবলিতে কেউ তাঁর সমকক্ষ হতে পারে না। তাঁর কোনো বিকল্প নেই এবং তাঁর মতো আর কেউ নেই। এসব মর্যাদা মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে তাঁকে দান করা হয়েছে।”
[আল-কাফি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২০১]
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-কে চেনা কেবল একটি ঐতিহাসিক বা তাত্ত্বিক আলোচনা নয়; বরং তা ঈমান, মারিফাত এবং সঠিক দ্বীনি পথ অনুসরণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁর পরিচয়, মর্যাদা, বৈশিষ্ট্য এবং আল্লাহপ্রদত্ত অবস্থান সম্পর্কে যত গভীর জ্ঞান অর্জিত হবে, ততই তাঁর প্রতি আনুগত্য, ভালোবাসা এবং অপেক্ষার চেতনা দৃঢ় হবে।
অতএব, একজন মুমিনের কর্তব্য হলো নির্ভরযোগ্য কুরআনি ও হাদিসভিত্তিক সূত্র থেকে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর পরিচয় লাভ করা, তাঁর জন্য দোয়া করা এবং তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা।
এই আলোচনা অব্যাহত থাকবে…
উৎস: ‘দারসনামা-এ মাহদাভিয়াত’— খোদা-মুরাদ সোলাইমান (সামান্য সম্পাদনাসহ)
টীকা
১. «وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ»
“আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” (সুরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬)
২. «أَوَّلُ عِبَادَةِ اللَّهِ مَعْرِفَتُهُ»
“আল্লাহর ইবাদতের প্রথম ধাপ হলো তাঁর পরিচয় লাভ করা।” (আত-তাওহিদ, পৃ. ৩৪; আল-আমালি, পৃ. ২২)
আপনার কমেন্ট