শনিবার ১৩ জুন ২০২৬ - ০৩:৩০
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর আবির্ভাব-পূর্ব আন্দোলনসমূহ

কিছু মানুষ কিছু বিচ্ছিন্ন রেওয়ায়েত ও তার বাহ্যিক অর্থের ভিত্তিতে ধারণা করেছেন যে, ইমাম যামান মুহাম্মাদ আল মাহদী (আ.ফা.)’র আবির্ভাবের পূর্বে জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে যেকোনো আন্দোলন ও প্রতিরোধ নিষিদ্ধ। এ কারণেই তারা ন্যায়বিচার ও ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার আহ্বানকেও “তাগুতী আন্দোলন” বলে আখ্যায়িত করে থাকে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: মাহদাভিয়াতের আলোচনায় এই বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। প্রশ্ন হলো—গায়বাতের যুগে ইসলামী আন্দোলন, সরকার প্রতিষ্ঠা বা জুলুমবিরোধী সংগ্রামের শরয়ি অবস্থান কী?

এখানে আমরা আবির্ভাব-পূর্ব আন্দোলনসমূহ সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা ও সেগুলোর বিশ্লেষণ সংক্ষেপে তুলে ধরছি:

আবির্ভাব-পূর্ব আন্দোলনের পতাকাবাহীদের “তাগুত” হিসেবে ইশারা
কিছু বর্ণনায় ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর কিয়ামের পূর্বে যেকোনো পতাকা উত্তোলন ও আন্দোলনকে নিন্দা করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ—

১. ইমাম সাদিক (আ.) বলেন,

کُلُّ رایَةٍ تُرْفَعُ قَبْلَ قِیامِ القائِمِ فَصاحِبُها طاغُوتٌ یُعْبَدُ مِنْ دُونِ اللّهِ عَزَّوَجَلَّ.

কায়েম (আ.ফা.)-এর কিয়ামের পূর্বে যে পতাকাই উত্তোলিত হবে, তার পতাকাবাহক এমন এক তাগুত, যে আল্লাহর পরিবর্তে উপাসিত হয়।

[আল-কাফি, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৯

২. ইমাম বাকির (আ.) বলেন,

کُلُّ رایَةٍ تُرْفَعُ قَبْلَ رایةِ القائِمِ صاحِبُها طاغُوتٌ.

“কায়েম (আ.)-এর পতাকার পূর্বে যে পতাকাই উত্তোলিত হবে, তার অধিকারী তাগুত।”

[নুমানি, আল-গাইবা, পৃষ্ঠা ১১৪]

এসব বর্ণনার সনদগত কিছু দুর্বলতা রয়েছে। তাছাড়া গবেষকগণ এ বর্ণনার ব্যাখ্যায় বলেছেন—“দাওয়াত” বা আহ্বান দুই ধরনের হতে পারে:

১. হকের দাওয়াত
মানুষকে সত্য প্রতিষ্ঠা এবং শাসনব্যবস্থা আহলুল বাইত (আ.)-এর দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান। এ ধরনের আন্দোলন ইমামগণের সমর্থিত।

২. বাতিল দাওয়াত
নিজেকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য মানুষকে আহ্বান করা।

এখানে “كُلُّ راية” (প্রত্যেক পতাকা) বলতে মূলত এই দ্বিতীয় ধরনের আন্দোলন বোঝানো হয়েছে—অর্থাৎ যে আন্দোলন আহলুল বাইত (আ.)-এর পথের বিপরীতে দাঁড়ায়, তাদের ধারাবাহিকতায় নয়।

অতএব, যেসব আন্দোলন আহলুল বাইত (আ.)-এর আদর্শ রক্ষা ও তাদের পথে মানুষকে আহ্বান করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়েছে, সেগুলো এ বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত নয়।

ইমাম রুহুল্লাহ খোমেনী (রহ.)-এর ব্যাখ্যা
ইমাম রুহুল্লাহ খোমেনী (রহ.) এ ধরনের বর্ণনার ভুল ব্যাখ্যার জবাবে বলেন:

“এই হাদিসগুলো ন্যায়ভিত্তিক আল্লাহভীরু সরকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বরং এর অর্থ হতে পারে—যেসব পতাকা ‘ইমামত’ বা ‘মাহদাভিয়াত’-এর দাবিতে কায়েম (আ.ফা.)-এর পূর্বে উঠবে, সেগুলো বাতিল।”

[কাশফুল আসরার, পৃষ্ঠা ২২৫]

তিনি আরও বলেন, “যে বর্ণনায় বলা হয়েছে—যে-ই পতাকা উত্তোলন করবে, তা বাতিল—এর উদ্দেশ্য হলো, কেউ যদি ‘মাহদী’ হওয়ার দাবিতে পতাকা তোলে।” [সহিফায়ে ইমাম, খণ্ড ২১, পৃষ্ঠা ১৪]

আবির্ভাব-পূর্ব আন্দোলনের ব্যর্থতা প্রসঙ্গে বর্ণনা
কিছু বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর পূর্ববর্তী আন্দোলনগুলো সফল হবে না। উদাহরণস্বরূপ—
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বলেন,

وَاللَّهِ لایَخْرُجُ واحِدٌ مِنَّا قَبْلَ خُرُوجِ القائِمِ علیه‌السلام اِلاّ کانَ مَثَلُهُ مَثَلَ فَرْخٍ طارَ مِنْ وَکْرِهِ قَبْلَ اَنْ یَسْتَوِی جَناحاهُ فَاَخَذَهُ الصِّبْیانُ فَعَبَثُوا بِهِ.

আল্লাহর কসম! আমাদের মধ্য থেকে কায়েম (আ.ফা.)-এর পূর্বে কেউ কিয়াম করবে না, নচেৎ তার উদাহরণ হবে এমন এক ছানার মতো, যে ডানা শক্ত হওয়ার আগেই বাসা থেকে উড়ে যায়। ফলে শিশুরা তাকে ধরে খেলনা বানিয়ে ফেলে।
[আল-কাফি, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৬৪]

কিছু মানুষ এ বর্ণনা থেকে উপসংহার টেনেছে যে, ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা অর্থহীন। কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয়।

কারণসমূহ:
প্রথমত, এ বর্ণনা মূলত “ব্যর্থতার সম্ভাবনা” উল্লেখ করছে; “কিয়াম হারাম”—এ কথা বলছে না। যদি তা-ই হতো, তাহলে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কারবালার আন্দোলনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যেত—যা অসম্ভব।

ইমাম সাদিক (আ.) হযরত জায়েদের শাহাদাত সম্পর্কে বলেন,

وَ لَا تَقُولُوا خَرَجَ زَیْدٌ فَإِنَّ زَیْداً کَانَ عَالِماً وَ کَانَ صَدُوقاً وَ لَمْ یَدْعُکُمْ إِلَی نَفْسِهِ إِنَّمَا دَعَاکُمْ إِلَی الرِّضَا مِنْ آلِ مُحَمَّدٍ علیهم السلام...

তোমরা জায়েদের আন্দোলনকে তুচ্ছ করো না। তিনি ছিলেন জ্ঞানী ও সত্যবাদী ব্যক্তি। তিনি নিজের দিকে আহ্বান করেননি; বরং আলে মুহাম্মদ (আ.)-এর সন্তুষ্টির দিকে আহ্বান করেছিলেন...”
[আল-কাফি, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৬৪]

দ্বিতীয়ত, কোনো আন্দোলন সফল না হলেও তা দায়িত্ব পালনের অংশ হতে পারে। যেমন, সিফফিন যুদ্ধে ইমাম আলী (আ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল—মুয়াবিয়া যদি শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়, তবে কেন যুদ্ধ করছেন?

তিনি উত্তরে বলেন,

اَلْتَمِسُ العُذْرَ بَینی وَ بَیْنَ اللَّهِ.

আমি চাই, আল্লাহর সামনে আমার জন্য যেন ওজর (দায়মুক্তির কারণ) থাকে।
[ইবনে শহর আশুব, আল-মানাকিব, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৫৮]

অর্থাৎ, একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া; ফলাফল নিশ্চিত হওয়া নয়।

“নীরব থাকো ও ঘরে বসে থাকো”— এ ধরনের রেওয়ায়েতের ব্যাখ্যা
ইমাম সাদিক (আ.) সাদিরকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

یا سَدیرُ اِلْزَمْ بَیْتَکَ وَکُنْ حِلْساً مِنْ اَحْلاسِهِ وَاسْکُنْ ما سَکَنَ اللَّیْلُ وَالنَّهارُ فَاِذا بَلَغَکَ اَنَّ السُّفْیانِیَّ قَدْ خَرَجَ فَارْحَلْ اِلَیْنا وَلَوْ عَلی رِجْلِکَ.

হে সাদির! ঘরে অবস্থান করো, শান্ত থাকো, যতদিন রাত-দিন শান্ত থাকে। কিন্তু যখন শুনবে সুফিয়ানি বের হয়েছে, তখন আমাদের দিকে চলে এসো—যদিও পায়ে হেঁটে আসতে হয়।
[আল-কাফি, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৬৪]

কিছু লোক এ বর্ণনা থেকে ধারণা করে যে, আবির্ভাবের পূর্বে সব ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন নিষিদ্ধ। অথচ এ বক্তব্য সর্বজনীন নয়; বরং বিশেষ ব্যক্তি ও বিশেষ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে বলা হয়ে থাকতে পারে।

অতএব, এসব বর্ণনার কোনোটিই গায়বাতের যুগে ইসলামী সরকার বা ন্যায়ভিত্তিক আন্দোলনের বৈধতাকে নাকচ করে না। বরং যেসব আন্দোলন ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতালিপ্সা ও বাতিল উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়, সেগুলোকেই নিন্দা করা হয়েছে।

কিন্তু যদি কোনো আন্দোলন শরিয়তের নীতিমালার ভিত্তিতে, ন্যায়পরায়ণ ফকিহের নেতৃত্বে এবং ইসলামী লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়, তবে তা ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর বিশ্বব্যাপী কিয়ামের ভূমিকা প্রস্তুতকারী আন্দোলন হিসেবেই গণ্য হবে।

এই আলোচনা অব্যাহত থাকবে…

উৎস: ‘দারসনামা-এ মাহদাভিয়াত’— খোদা-মুরাদ সোলাইমান (সামান্য সম্পাদনাসহ)

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha