শনিবার ১৩ জুন ২০২৬ - ১৩:২৮
ঐশী নেতা মানুষকে নিজের দিকে নয়, আল্লাহর দিকে পরিচালিত করেন

মুবাহালা দিবস, সূরা “হাল আতা” (আল-ইনসান) অবতীর্ণ হওয়ার স্মরণ এবং জিলহজ মাস উপলক্ষে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে ‘কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঐশী নেতাদের বৈশিষ্ট্য’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তব্য রেখেছেন বাংলাদেশি গবেষক ও চিন্তাবিদ এবং বাংলাদেশ ইমামিয়া ওলামা পরিষদের মহাসচিব হুজ্জাতুল ইসলাম আবদুল কুদ্দুস।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশি গবেষক ও চিন্তাবিদ এবং বাংলাদেশ ইমামিয়া ওলামা পরিষদের মহাসচিব হুজ্জাতুল ইসলাম আবদুল কুদ্দুস মুবাহালার দিবস, সূরা “হাল আতা” (সূরা আল-ইনসান)-এর অবতীর্ণ হওয়ার স্মরণ এবং জিলহজ মাস উপলক্ষে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে “কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঐশী নেতাদের বৈশিষ্ট্য” শীর্ষক আলোচনায় বক্তব্য রাখেন।

তিনি বক্তব্যের শুরুতে বলেন, ঐশী নেতৃত্ব একটি গভীর ও বিস্তৃত বিষয়। মুসলমানরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ বিষয়ে আলোচনা করে আসছেন এবং কুরআন ও সুন্নাহতেও এর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।

গাদিরে খুমের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জিলহজ মাস আমাদের সেই ঐতিহাসিক ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর পরবর্তী সময়ে মুসলিম উম্মাহর পথনির্দেশনা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। গাদিরের ভাষণ ছিল উম্মাহকে সঠিক পথে পরিচালিত করা, বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করা এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর নেতৃত্বের অবস্থান নির্ধারণ করার ওপর ভিত্তি করে। এ কারণেই “যার আমি মাওলা, আলীও তার মাওলা” (مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَهَذَا عَلِيٌّ مَوْلَاهُ) উক্তিটি মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব ও হিদায়াতে হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর বিশেষ মর্যাদা নির্দেশ করে।

আব্দুল কুদ্দুস কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে বলেন, ঐশী নেতৃত্ব আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। কুরআনে “আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি স্থাপন করতে যাচ্ছি” (إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً) এবং “আমি তোমাকে মানুষের জন্য ইমাম নিযুক্ত করেছি” (إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا)-এ ধরনের আয়াত প্রমাণ করে যে খেলাফত, ইমামত ও নেতৃত্ব একটি ঐশী মর্যাদা, এবং ঐশী নেতাকে আল্লাহর পক্ষ থেকেই মনোনীত ও অনুমোদিত হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে ঐশী মানদণ্ড পার্থিব মানদণ্ড থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাধারণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সম্পদ, ক্ষমতা, সামাজিক প্রভাব বা নির্বাচনে বিজয় নেতৃত্বের মাপকাঠি হতে পারে; কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে নেতা সেই ব্যক্তি, যিনি মানুষকে আল্লাহর ইবাদত, ন্যায়, সত্য এবং সরল পথের দিকে পরিচালিত করেন।

তিনি বলেন, ঐশী নেতাদের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাকওয়া ও পবিত্রতা। তাকওয়া থেকেই অন্যান্য গুণাবলি জন্ম নেয়। যে ব্যক্তি নিজের জন্য নয়, আল্লাহর জন্য জীবনযাপন করে, সে-ই সমাজকে কল্যাণ ও সৎপথে পরিচালিত করতে পারে। ন্যায়বিচার, দূরদৃষ্টি, সাহসিকতা, কল্যাণকামিতা এবং নেতৃত্বদানের সক্ষমতা-সবই তাকওয়ার ফল।

তিনি ন্যায়বিচারকে ঐশী নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ঐশী নেতা কোনো দল, জাতি, ব্যক্তিগত স্বার্থ বা বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য কাজ করেন না; বরং তার একমাত্র মানদণ্ড সত্য ও ন্যায়। সমাজে যদি প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে বিশ্বের অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব।

হুজ্জাতুল ইসলাম ড. আবদুল কুদ্দুস সাহসিকতা ও দৃঢ়তাকেও ঐশী নেতৃত্বের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ঐশী নেতা অত্যাচারী শক্তির হুমকি ও চাপের মুখে ভীত হন না বা পিছিয়ে যান না; কারণ তাঁর লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। এমনকি আল্লাহর পথে শহীদ হলেও, কুরআনের দৃষ্টিতে তিনি প্রকৃত জীবনের অধিকারী।

তিনি হযরত আলী (আ.)-এর জীবনের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ঐশী নেতারা শত্রুর প্রতিও কল্যাণকামী হন। জীবনের শেষ মুহূর্তেও হযরত আলী (আ.) তাঁর ঘাতক ইবনে মুলজামের প্রতি সদয় আচরণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে ঐশী নেতাদের মানবিকতা ও করুণা শত্রুদের প্রতিও বিস্তৃত।

তিনি আরও বলেন, নবী ও ইমামদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা আদর্শ চরিত্রের অধিকারী। তাঁরা মানুষকে কোনো কাজের নির্দেশ দেওয়ার আগে নিজেরাই তা পালন করেন। হযরত আলী (আ.) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি এমন কোনো সৎকাজের নির্দেশ দিতেন না, যা তিনি নিজে আগে পালন করেননি।

কুরআনে বর্ণিত তালুত (আ.)-এর উদাহরণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, জ্ঞান ও সক্ষমতা ঐশী নেতৃত্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। কুরআনে বলা হয়েছে:

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে তোমাদের ওপর মনোনীত করেছেন এবং তাকে জ্ঞান ও শারীরিক শক্তিতে সমৃদ্ধ করেছেন।”

এ থেকে বোঝা যায় যে, শুধু দাবি, সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদা নেতৃত্বের জন্য যথেষ্ট নয়; বরং জ্ঞান, দূরদৃষ্টি, সমাজ পরিচালনার দক্ষতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও অপরিহার্য।

বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলেন, ঐশী নেতার প্রধান দায়িত্ব হলো মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা। তিনি মানুষকে নিজের, নিজের দল, জাতি বা ব্যক্তিগত স্বার্থের দিকে ডাকেন না; বরং তাঁর সমস্ত প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম থাকে মানুষকে আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের পথে পরিচালিত করার জন্য। বিপরীতে, যে নেতা মানুষকে নিজের দিকে আহ্বান করে, সে ফেরাউনের পথ অনুসরণ করে।

তিনি আরও বলেন, ধৈর্য, সহনশীলতা, দৃঢ় বিশ্বাস, সময়-সচেতনতা, শত্রু সম্পর্কে সতর্কতা, আশা সঞ্চার এবং সঠিক পথ সম্পর্কে জ্ঞান-এসবও ঐশী নেতার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

শেষে তিনি বলেন, ঐশী নেতাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সঠিক পথকে জানা এবং মানুষকে সেই পথের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। তাঁরা মানুষকে সিরাতুল মুস্তাকিম বা সরল পথের দিকে পরিচালিত করেন-যে পথ আল্লাহর দিকে নিয়ে যায়। এ কারণেই ইসলামী শিক্ষায় আহলে বাইত (আ.)-কে উম্মাহর প্রকৃত পথপ্রদর্শক এবং সিরাতুল মুস্তাকিমের বাস্তব প্রতীক হিসেবে পরিচয় করানো হয়েছে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha