শনিবার ১৩ জুন ২০২৬ - ১৩:৫৬
আহলুল বাইতের (আ.) প্রতি ভালোবাসা সব মুসলমানের অভিন্ন বিষয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোর দিয়ে বলেছেন যে, আহলুল বাইতের (আ.) প্রতি ভালোবাসা সকল মুসলমানের জন্য একটি অভিন্ন ও ঈমানি বিষয়। তিনি মাওয়াদ্দাতের আয়াত, তাতহীরের আয়াত এবং হাদিসে সাকালাইন-এর আলোকে এটিকে দ্বীনের প্রতি আন্তরিকতার নিদর্শন এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের সুন্নি আলেম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আহসান আল-হাদী ‘মুবাহালার দিবস’ এবং পবিত্র হাল আতা সূরার অবতীর্ণ হওয়ার উপলক্ষে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে আহলুল বাইতের (আ.) উচ্চ মর্যাদার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন: আহলুল বাইতের (আ.) প্রতি ভালোবাসা কেবল শিয়া-সুন্নি সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় নয়; বরং এটি বিশ্বের সব মুসলমানের মধ্যে একটি ঈমানি ও অভিন্ন বিষয়।

তিনি বক্তব্যের শুরুতে সভার সভাপতি, অতিথিবৃন্দ এবং আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আহলুল বাইতের (আ.) মর্যাদা নিয়ে গবেষণাধর্মী আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন যে, মহানবী (সা.) বারবার মুসলিম উম্মাহকে আহলুল বাইতের (আ.) প্রতি ভালোবাসার নির্দেশ দিয়েছেন এবং পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতেও এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক আরও বলেন: বাংলাদেশে আমরা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অনুসারীরা বিশ্বাস করি যে, আহলুল বাইতের (আ.) প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অন্যতম পূর্বশর্ত। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে রাসূলকে নিজের পিতা, সন্তান এবং সমগ্র মানুষের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। তাই রাসূলের প্রতি ভালোবাসা তাঁর পবিত্র পরিবারের প্রতি ভালোবাসা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না।

মাওয়াদ্দাতের আয়াতের ব্যাখ্যা

ড. আহসান আল-হাদী সূরা শূরার ২৩ নম্বর আয়াত উল্লেখ করে বলেন: বলুন, আমি এ কাজের জন্য তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না, শুধু আমার নিকটাত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া।

তিনি বলেন, মানুষের হেদায়েতের জন্য রাসূল (সা.) যে কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তার বিনিময়ে তিনি কেবল তাঁর নিকটাত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা কামনা করেছেন। তিনি জালালুদ্দীন সুয়ূতী-র আদ-দুররুল মানসুর তাফসিরের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, এখানে “আল-কুরবা” বলতে হযরত ফাতিমা (সা.) এবং তাঁর সন্তানদের বোঝানো হয়েছে।

তাতহীরের আয়াত ও আহলুল বাইতের মর্যাদা

তিনি সূরা আহযাবের ৩৩ নম্বর আয়াতের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, যখন তাতহীরের আয়াত নাজিল হয়, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আলী (আ.), হযরত ফাতিমা (সা.), ইমাম হাসান (আ.) এবং ইমাম হুসাইন (আ.)-কে নিজের চাদরের নিচে একত্রিত করে ঘোষণা করেন: “এরা আমার আহলুল বাইত।”

তার মতে, এই ঘটনা মুসলিম উম্মাহর মধ্যে আহলুল বাইতের (আ.) বিশেষ মর্যাদাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

আনুগত্যের আয়াত

সূরা নিসার ৫৯ নম্বর আয়াতের আলোকে তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে আল্লাহ, রাসূল এবং উলিল আমর-এর আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর মতে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর আহলুল বাইত (আ.) হেদায়েতের পথ ব্যাখ্যা করা এবং উম্মাহকে বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

হাদিসে সাকালাইন

ড. আহসান আল-হাদী বলেন, আহলুল বাইতের (আ.) মর্যাদা প্রমাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলোর একটি হলো হাদিসে সাকালাইন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই হাদিস সহিহ মুসলিম, সুনানে তিরমিযি এবং সুনানে নাসাঈ-সহ বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সুন্নি গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আমি তোমাদের মাঝে দুটি মূল্যবান আমানত রেখে যাচ্ছি-আল্লাহর কিতাব এবং আমার আহলুল বাইত।”

তিনি বলেন, এই বক্তব্য অনুযায়ী কুরআন ও আহলুল বাইত (আ.) মুসলিম উম্মাহর জন্য রাসূলের রেখে যাওয়া দুটি মহামূল্যবান উত্তরাধিকার।

গাদীরে খুমের ঘটনা

তিনি গাদীরে খুমের ঘটনাও উল্লেখ করে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) সেখানে হযরত আলী (আ.)-এর হাত উঁচু করে ঘোষণা করেছিলেন:

“যার আমি মাওলা, আলীও তার মাওলা।”

এরপর তিনি দোয়া করেন: “হে আল্লাহ! যে আলীকে ভালোবাসে, আপনি তাকেও ভালোবাসুন।”

ড. আহসান আল-হাদীর মতে, এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে হযরত আলী (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য ঈমান ও দ্বীনদারির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মুবাহালার আয়াত

সূরা আলে ইমরানের ৬১ নম্বর আয়াত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মুবাহালার ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর সঙ্গে হযরত ফাতিমা (সা.), ইমাম হাসান (আ.), ইমাম হুসাইন (আ.) এবং হযরত আলী (আ.)-কে নিয়ে গিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, আয়াতে ব্যবহৃত “আনফুসানা” (আমাদের নিজেদের) শব্দটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে হযরত আলী (আ.)-এর অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদার নির্দেশক; কারণ তিনি আলীকে নিজের ন্যায় মর্যাদায় মুবাহালার ময়দানে নিয়ে গিয়েছিলেন।

বাংলাদেশে আহলুল বাইতের ভালোবাসা

ড. আহসান আল-হাদী বলেন: বাংলাদেশে আকিদাগত দিক থেকে আহলে সুন্নাত ও শিয়াদের মধ্যে আহলুল বাইতের (আ.) প্রতি ভালোবাসার বিষয়ে খুব বেশি দূরত্ব নেই। আমরা আমাদের জুমার খুতবা ও ধর্মীয় সমাবেশগুলোতে হযরত ফাতিমা (সা.)-কে জান্নাতের নারীদের নেত্রী এবং ইমাম হাসান (আ.) ও ইমাম হুসাইন (আ.)-কে জান্নাতের যুবকদের নেতা হিসেবে উল্লেখ করি এবং এ সত্য প্রকাশ্যে বর্ণনা করি।

তিনি বক্তব্যের শেষে বলেন: আহলুল বাইতের (আ.) প্রতি ভালোবাসা ঈমানের নিদর্শন এবং দ্বীনদারির আন্তরিকতার মানদণ্ড। যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে ভালোবাসে, সে তাঁর পবিত্র পরিবারের প্রতি উদাসীন থাকতে পারে না। তাই আহলুল বাইতের (আ.) প্রতি ভালোবাসার প্রসার বিশ্ব মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক নৈকট্য বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha