হাওজা নিউজ এজেন্সি: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর এক সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ হাদিসের ব্যাখ্যায় শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ ইমাম খামেনেয়ী (রহ.) তুলে ধরেছেন, কারা প্রকৃত অর্থে সবচেয়ে বিচক্ষণ, সবচেয়ে সৎ এবং সর্বোত্তম মানুষ। তাঁর ব্যাখ্যা নিম্নরূপ:
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম
আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) থেকে বর্ণিত এই হাদিসটি পূর্ববর্তী আলোচনার ধারাবাহিকতার অংশ।
وَ أَحْزَمُ النَّاسِ أَكْظَمُهُمْ لِلْغَيْظِ
মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বিচক্ষণ সেই ব্যক্তি, যে নিজের ক্রোধ সংবরণ করতে পারে।
‘হাযম’ অর্থ দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা ও পরিণামদর্শী সতর্কতা। বিচক্ষণ ব্যক্তি কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তার বিভিন্ন দিক ও সম্ভাব্য পরিণতি বিবেচনা করেন।
হাদিসে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বিচক্ষণ মানুষ সেই ব্যক্তি, যে নিজের ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। কারণ ক্রোধ মানুষের বিবেক ও প্রজ্ঞার ওপর পর্দা ফেলে দেয়। রাগের বশবর্তী হয়ে মানুষ অনেক সময় নিজের বিচারবুদ্ধির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। তখন তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে অনুচিত কথা, সে ভুল সিদ্ধান্ত নেয় এবং এমন কাজ করে বসে, যার পরিণতি হয় অনুতাপ ও ক্ষতি।
অতএব, যে ব্যক্তি জীবনের নানা ক্ষেত্রে ভুল-ত্রুটি থেকে বাঁচতে চায় এবং বিচক্ষণতার সঙ্গে চলতে আগ্রহী, তার জন্য ক্রোধ দমন করা একটি অপরিহার্য গুণ। অর্থাৎ রাগ এলেও সে যেন তা নিজের কথা, আচরণ, সিদ্ধান্ত ও কর্মে প্রভাব ফেলতে না দেয়। এটি নিঃসন্দেহে এক মহান নৈতিক শিক্ষা।
রাগেরও নানা রূপ রয়েছে। কখনো তা ব্যক্তিগত কারণে সৃষ্টি হয়, আবার কখনো পরিবেশ ও জনসমষ্টির আবেগ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। কেউ কেউ পরিস্থিতির চাপে আবেগপ্রবণ হয়ে এমন প্রতিক্রিয়া দেখায়, যা একাকী অবস্থায় হয়তো করত না। কিন্তু সাময়িক উত্তেজনায় বলা একটি বেপরোয়া কথা কিংবা নেওয়া একটি ভুল সিদ্ধান্ত দীর্ঘস্থায়ী অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
وَ أَصْلَحُ النَّاسِ أَصْلَحُهُمْ لِلنَّاسِ
মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সৎ ও কল্যাণকামী সেই ব্যক্তি, যে মানুষের কল্যাণে সবচেয়ে বেশি কাজ করে।
আমরা প্রত্যেকেই আল্লাহর নেক বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করি। যদি সত্যিই সৎকর্মপরায়ণ মানুষের অন্তর্ভুক্ত হতে চাই, তবে আমাদের সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের উপকারে এগিয়ে আসতে হবে, তাদের কল্যাণে কাজ করতে হবে এবং সমাজের সংশোধন ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে।
وَ خَيْرُ النَّاسِ مَنْ انْتَفَعَ بِهِ النَّاسُ
মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যার মাধ্যমে অন্য মানুষ উপকৃত হয়।
এখানে ‘খাইর’ শব্দটি উৎকর্ষ বা শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ সর্বোত্তম মানুষ সেই, যার উপস্থিতি অন্যের জীবনে কল্যাণ বয়ে আনে; মানুষ পার্থিব ও পরকালীন প্রয়োজন, দুঃখ-কষ্ট ও সংকটের সময়ে যার কাছ থেকে সহযোগিতা ও উপকার লাভ করে। যে ব্যক্তি নিজের সামর্থ্য, জ্ঞান, সময় ও সামর্থ্যের আলোকে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখে, মহানবীর ভাষায় সেই-ই প্রকৃত অর্থে মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।
শিক্ষা:
এই হাদিস আমাদের তিনটি মৌলিক নৈতিক গুণের শিক্ষা দেয়—আত্মসংযম, মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ এবং অন্যের উপকারে নিবেদিত থাকা। যে ব্যক্তি ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, মানুষের মঙ্গল কামনা করে এবং নিজের অস্তিত্বকে মানুষের কল্যাণের উৎসে পরিণত করে, সে-ই আল্লাহর নিকট প্রিয় এবং মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম।
আপনার কমেন্ট