হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-কে কেন্দ্র করে প্রণীত ধারাবাহিক আলোচনা ‘একটি আদর্শ সমাজের দিকে’-এর পূর্ববর্তী দুই পর্বে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ১৯৯০-এর দশক থেকে হলিউডের গণমাধ্যম ধীরে ধীরে তাদের নির্মাণশৈলীতে ত্রাণকর্তাবাদ ও শেষযুগসংক্রান্ত বিষয়গুলোকে অধিক গুরুত্ব দিতে শুরু করে। এসব নির্মাণের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে মুসলমানদের প্রতিশ্রুত ত্রাণকর্তা ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-কে বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। নিচে তার কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো:
চলচ্চিত্র: ‘ডিউন’ (DUNE)
লেখকের মতে, হলিউডের ওপর ইহুদি-জায়নবাদী প্রভাবের কারণে ইসলাম ও মুসলমানদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা অনেক চলচ্চিত্রের একটি আদর্শিক ধারা তৈরি হয়েছে। যদিও ইসলামী ত্রাণকর্তাকে সরাসরি কেন্দ্র করে নির্মাণ অতীতে খুব বেশি দেখা যায়নি; অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা ছিল পরোক্ষ ইঙ্গিতনির্ভর।
তবে ‘ডিউন’ (DUNE) চলচ্চিত্রের পর এই ধারায় পরিবর্তন ঘটে বলে দাবি করা হয়। লেখকের মতে, এ চলচ্চিত্রে ত্রাণকর্তাবাদের ধারণাকে কাল্পনিক ও মনগড়া হিসেবে উপস্থাপন করে তা ইসলামী ত্রাণকর্তা ‘মাহদি’ নামের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে দর্শকের মনে ‘মাহদি’ বা ‘লিসানুল গায়েব’-কে এক মিথ্যা ও কল্পিত ত্রাণকর্তার প্রতিচ্ছবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়।
ভিডিও গেম: Persian Gulf Inferno (পারস্য উপসাগরের নরক)
এই ভিডিও গেমে খেলোয়াড়কে ‘আল্লাহু আকবার’ কিংবা ‘ইয়া মাহদি’ ধ্বনি শোনামাত্র গুলি চালানোর নির্দেশনার মতো উপাদান যুক্ত করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এর ফলে শিশু-কিশোরদের মনে ইসলাম এবং মুসলমানদের প্রতিশ্রুত ত্রাণকর্তার প্রতি বিদ্বেষের মনোভাব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
লেখকের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে শিশুদের মানসগঠনের পর্যায়কে লক্ষ্যবস্তু করা হয়; কারণ সমাজকে প্রভাবিত করতে হলে প্রথমে মানুষের চিন্তাজগতকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন, আর শৈশব সেই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়।
পশ্চিমা রক সংগীতে ‘দ্বাদশ ইমাম’
পশ্চিমা গণমাধ্যমে মাহদাভিয়াত নিয়ে আলোচনা নতুন কিছু নয়; তবে পশ্চিমা সংগীতে এ বিষয়টির উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বিরল।
২০১০ সালে The Godless, The Godforsaken and the God Damned (ঈশ্বরহীন, ঈশ্বর-পরিত্যক্ত ও ঈশ্বর-অভিশপ্ত) শিরোনামের একটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। এর একটি ট্র্যাকের নাম ছিল The Twelfth Imam (দ্বাদশ ইমাম)।
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-কে কেন্দ্র করে নির্মিত এই সংগীতে গায়বাত, মাতৃগর্ভে কথা বলা এবং আল্লাহর অনুমতিতে গায়বাতের অবসানের মতো কিছু ধর্মীয় ইঙ্গিতের পাশাপাশি নেতিবাচক ও সহিংস ভাবধারার বিষয়ও উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে ইমামকে এক ধ্বংসাত্মক ও নিয়ন্ত্রণকামী শক্তি হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এই সংগীতের পুনরাবৃত্ত প্রধান বক্তব্য হলো—ইমাম মানুষের আত্মা ও চেতনার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন—এমন একটি ধারণা বারবার উপস্থাপন করা হয়।
উল্লেখ্য, এই সংগীতটি BABYLON MYSTERY ORCHESTRA (ব্যাবিলন মিস্ট্রি অর্কেস্ট্রা) নামের একটি ব্যান্ডের সৃষ্টি। রক ও মেটালধর্মী সংগীতচর্চার জন্য পরিচিত এই দলটি ধর্মীয়, দার্শনিক ও পৌরাণিক বিষয়কে কেন্দ্র করে নানা রচনা করে থাকে এবং মানবজীবন ও ধর্মতত্ত্বের জটিল ও কখনো কখনো অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকগুলো অনুসন্ধানের চেষ্টা করে।
মাহদাভিয়াতবিরোধী উপন্যাস
মাহদাভিয়াতবিরোধী প্রচারণার আরেকটি ক্ষেত্র হলো উপন্যাস রচনা। এ ধরনের রচনায় লেখকেরা ভয় সৃষ্টি কিংবা মাহদাভিয়াতের ভাবমূর্তি বিকৃত করার মাধ্যমে একে বিশ্ববাসীর জন্য—বিশেষত খ্রিস্টান সমাজের জন্য—একটি বিপজ্জনক বিশ্বাসব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন।
পেশায় ফার্মাসিস্ট জেমস পার্কার ২০০৬ সাল থেকে ইসলামী শেষযুগসংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন। পরে তিনি মাহদাভিয়াতবিরোধী উপন্যাস-ত্রয়ী সম্পন্ন করেন। উপন্যাসগুলো হলো—
• The Twelfth Imam: The Rise of Antichrist
(দ্বাদশ ইমাম: খ্রিস্টবিরোধীর উত্থান)
• The Twelfth Imam: The Tribulation Begins
(দ্বাদশ ইমাম: দুর্দশা ও বিপর্যয়ের সূচনা)
• The Twelfth Imam: God's Judgments
(দ্বাদশ ইমাম: ঈশ্বরের বিচার)
লেখকের মতে, এসব উপন্যাসে দ্বাদশ ইমামের একটি সহিংস ও ভীতিকর চিত্র পাঠকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
উপন্যাসে দ্বাদশ ইমাম ও ইহুদি সমাজের মধ্যে সংঘাতের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। সেখানে মুসলমান ও দ্বাদশ ইমামকে অসত্যের প্রতিনিধিত্বকারী শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, যারা প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে এবং অমুসলিম বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য প্রদান করে। বিপরীতে, ‘ইসহাক’ নামের এক ইহুদি চরিত্র ও তার পুত্রদের ধর্মনিষ্ঠ, আদর্শবাদী এবং সত্য ও ন্যায়বিচারের অনুসন্ধানী নতুন প্রজন্মের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগেও জোয়েল রোজেনবার্গ তাঁর একাধিক উপন্যাসে মুসলমানদের এবং ইমাম মাহদি (আ.)-এর বিরুদ্ধে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।
উপরোক্ত উদাহরণ ছাড়াও চলচ্চিত্র, বই, উপন্যাস, ভিডিও গেম, সংগীত এবং অসংখ্য বক্তৃতার কথা উল্লেখ করা যায়, যেগুলো একটি অভিন্ন লক্ষ্যকে সামনে রেখে নির্মিত হয়েছে। সেই লক্ষ্য হলো—ইসলামের শেষযুগের ত্রাণকর্তাকে বিশ্ববাসীর সামনে একটি সহিংস, আতঙ্কজনক ও ভীতিপ্রদ চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা।
তবে মুসলিম বিশ্বাস অনুযায়ী, মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে মানবজাতির প্রতিশ্রুত ত্রাণকর্তার আবির্ভাব, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং জুলুম-অত্যাচার ও দুর্নীতির অবসানের সুসংবাদ দিয়েছেন। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ কখনো তাঁর অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন না।
এই আলোচনা অব্যাহত থাকবে...
সূত্র: কোমের হাওজায়ে ইলমিয়ার মাহদাভিয়াত বিশেষায়িত কেন্দ্র (পশ্চিমা বিশ্ব ও মাহদাভিয়াত বিভাগ)— সামান্য সম্পাদিত ও অনূদিত
আপনার কমেন্ট