হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্লেষণধর্মী সাময়িকী আটলান্টিক ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ঘোষিত সমঝোতাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি “সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণপত্র” এবং ইরানের জন্য একটি কৌশলগত বিজয় হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাক্কালে সংকট এড়াতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সব যুদ্ধলক্ষ্য বিসর্জন দিয়েছেন।
প্রতিবেদনের মূল বিষয়গুলো নিম্নরূপ:
১. মার্কিন আধিপত্যের ধ্বংসাবশেষের ওপর ট্রাম্পের উদযাপন
ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার রাতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ “সবাইকে অভিনন্দন!” লিখে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সমাপ্তির চুক্তিকে উদযাপন করেন। কিন্তু আটলান্টিক বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের উদযাপন করার মতো কিছু নেই। ট্রাম্প নিজের জন্মদিনে দ্রুত চুক্তি স্বাক্ষর করতে চাইলেও, পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে থাকা ইরান জানিয়েছে যে তাদের কোনো তাড়াহুড়ো নেই এবং তারা শুধু একজন প্রতিনিধি সুইজারল্যান্ডে শুক্রবারের বৈঠকে পাঠাবে।
২. ইরানের সব কৌশলগত লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরান ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হলেও বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ এমন অবস্থায় শেষ হচ্ছে যেখানে তেহরানের সরকার সম্পূর্ণভাবে টিকে আছে। ইরানের কাছে এখনও বিপুল সংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে এবং তাদের সামরিক সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিষেধাজ্ঞার বড় অংশ প্রত্যাহারের ফলে ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মুক্ত হবে।
প্রতিবেদনটির মতে, সরকার পরিবর্তনসহ যুক্তরাষ্ট্র তার কোনো লক্ষ্যই অর্জন করতে পারেনি। বরং ইরান এখন আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল আক্রমণের মুখেও টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে।
৩. ইসরায়েলের বিচ্ছিন্নতা
এই সমঝোতা ইসরায়েলকে দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যিনি ট্রাম্পকে এই যুদ্ধে উৎসাহিত করেছিলেন, এখন অপমানিত অবস্থায় রয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান কৌশলগতভাবে লেবাননে নেতানিয়াহুর হিজবুল্লাহবিরোধী যুদ্ধকে উপসাগরীয় অঞ্চলের বৃহত্তর সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ট্রাম্প এখন নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষুব্ধ, কারণ তাঁর বিশ্বাস, নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসা আরও কঠিন করে তুলেছেন।
৪. জনমতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা
ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে যে তারা বিজয়ী হয়েছে, কারণ তারা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রেখেছে। আটলান্টিক এই দাবিকে “হাস্যকর ও ভিত্তিহীন” বলে উল্লেখ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান এর আগেও পরমাণু চুক্তি (JCPOA)-এর আওতায় পারমাণবিক অস্ত্র অনুসরণ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং যুদ্ধ শুরুর সময়ও তারা বোমা তৈরির সক্ষমতা থেকে অনেক দূরে ছিল। তাই ট্রাম্পের এই দাবি আসলে ইরানি সরকারকে উৎখাত করতে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা।
৫. “পারমাণবিক ধূলিকণা” নিয়ে বিতর্ক
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প কয়েক সপ্তাহ ধরে “পারমাণবিক ধূলিকণা” ধ্বংসের কথা বলে আসছেন, যা বোমাবর্ষণের ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা ইউরেনিয়ামের জন্য ব্যবহৃত তাঁর একটি অদ্ভুত শব্দ।
কিন্তু আটলান্টিক দাবি করেছে যে, ইরান এসব স্থাপনার চারপাশে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং তেহরানের সম্মতি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র কখনও সেখানে প্রবেশ করে খননকাজ চালাতে পারবে না।
৬. ইরানের সম্পদ মুক্তি
ইরানি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন প্রথম ধাপে ১২ বিলিয়ন ডলার নগদ অর্থ এবং পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আরও ১২ বিলিয়ন ডলার মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে।
এছাড়া, ইরানের পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, সম্পদ মুক্তি “ইরানের কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল”, তবে প্রতিবেদনের মতে এই অস্পষ্ট শর্ত তেহরানের জন্য আরও দরকষাকষির সুযোগ সৃষ্টি করবে।
৭. উপসংহার
আটলান্টিক–এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান সহযোগিতা না করলে যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার বিষয়ে ট্রাম্পের হুমকি এখন অনেকটাই কৌতুকের মতো শোনায়, কারণ কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের অল্প কিছুদিন আগে এবং যখন জনমত ও আন্তর্জাতিক বাজার যুদ্ধবিরোধী অবস্থানে রয়েছে, তখন ট্রাম্প নতুন কোনো বড় সংঘাত শুরু করার ঝুঁকি নিতে পারবেন না।
প্রতিবেদনটির উপসংহারে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি “ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” করানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই তেহরানের কাছে পরাজিত হয়েছেন।
আপনার কমেন্ট