হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার সকালে সুপ্রিম কোর্টের সাধারণ অধিবেশনে উপস্থিত হয়ে মহসেনি এজেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিচারিক বিষয়ে একীভূত নজিরভিত্তিক রায় প্রদানের প্রক্রিয়া সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন।
‘শহীদদের রক্তের দাবি থেকে আমরা সরে আসব না’
বক্তব্যের শুরুতে তিনি পবিত্র মহররম মাসের আগমন উপলক্ষে শোক ও সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে তিনি সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, যারা তার ভাষায়, ‘তৃতীয় আরোপিত যুদ্ধ’-এর সময়েও দায়িত্ব পালনে কোনো শৈথিল্য দেখাননি।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা জানি, শত্রু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। তাই আমাদের কর্মকর্তারা পূর্ণ সতর্কতা ও সচেতনতার সঙ্গে আলোচনা করবেন। আমাদের কূটনীতি ‘রাস্তা’ ও ‘ময়দানের জিহাদের’ই ধারাবাহিকতা।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের আলোচকরা ইরানি জনগণের ন্যায্য অধিকার, লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন এবং প্রতিরোধ অক্ষের অন্যান্য ক্ষেত্রের অধিকার, শহীদদের রক্তের দাবি এবং সর্বোপরি আমাদের শহীদ ইমামের আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্রও পিছিয়ে আসবেন না।”
‘আজকের আলোচনা অধিকার আদায়ের জন্য’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘ময়দান’ ও ‘কূটনীতি’ একই লক্ষ্যে অগ্রসর হয়। তার ভাষায়, “আলোচনার প্রক্রিয়ায় শত্রুপক্ষ যদি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তাহলে আমরা ময়দানে আমাদের প্রতিরোধ ও সংগ্রাম অব্যাহত রাখব। এই প্রতিশ্রুতিভঙ্গকারী, অসাধু ও অপরাধী শত্রুর ওপর কোনোভাবেই আস্থা রাখা যায় না। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে এবং আমরা সতর্ক আছি। শত্রুও জানে, তারা কার মুখোমুখি হয়েছে।”
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের আলোচনার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আলোচনার নামে ইরানি জনগণের অধিকার থেকে একচুলও সরে আসতে চান না; বরং আলোচনার মাধ্যমে জনগণের অধিকার আদায় ও পুনরুদ্ধার করতে চান। অর্থাৎ, কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও যদি প্রতিপক্ষ তা ভঙ্গ করে, তাহলে আমরা উপযুক্ত জবাব দেব এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করব।”
‘জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট করাই শত্রুর লক্ষ্য’
হুজ্জাতুল ইসলাম মহসেনি এজেয়ী জাতীয় ঐক্যকে রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “আজ জাতীয় ঐক্য ও সংহতির গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। জনসচেতনতা সৃষ্টি ও সঠিক তথ্য তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে। শত্রু বিভিন্ন উপায়ে আমাদের জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট করতে এবং বাস্তবতাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করতে চায়। তাই শত্রুর কৌশল বুঝতে হবে এবং তাদের নির্ধারিত খেলায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।”
সমালোচনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সমালোচনা ও মতামত প্রকাশ করা স্বাভাবিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়। তবে সমালোচনা হতে হবে যুক্তিনির্ভর এবং সর্বোপরি আল্লাহভীরুতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ। আমরা যদি অসত্য কথা বলি বা অশোভন ভাষায় বক্তব্য দিই, তাহলে চাই বা না চাই, শত্রুর খেলায় অংশ নিচ্ছি। এখন আগের চেয়ে বেশি প্রয়োজন—যে কথা শুনছি, তা যাচাই-বাছাই ছাড়া পুনরাবৃত্তি না করা।”
‘জনগণের প্রতি আন্তরিক সেবাই শত্রুকে হতাশ করবে’
প্রধান বিচারপতি বলেন, “যুদ্ধকাল থেকে এ পর্যন্ত নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিচার বিভাগ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে। তবে এতে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। আজ জনগণের প্রতি আন্তরিক ও নিষ্ঠাপূর্ণ সেবা শত্রুকে হতাশ করার অন্যতম কার্যকর উপায়। জনগণের সমস্যা সমাধান এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে হবে।”
সুপ্রিম কোর্টের তদারকি-সংক্রান্ত দায়িত্বের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “দেশের বিচারিক আদালতগুলোর ওপর নজরদারি করতে গিয়ে আপনাদের বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে সমস্যাগুলোর কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। কোথাও আইন সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে, কোথাও কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে, আবার কোথাও প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা জরুরি হতে পারে। সমন্বিত মূল্যায়নের মাধ্যমেই এসব বিষয় চিহ্নিত করা সম্ভব।”
তিনি আরও বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের উচিত দেশের সব আদালতের তদারকির সময় জনগণ ও সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণকে বিচার বিভাগের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সে বিষয়ে উৎসাহিত করা।”
দ্রুত বিচার ও রায়ের দৃঢ়তার ওপর গুরুত্ব
হুজ্জাতুল ইসলাম মহসেনি এজেয়ী দণ্ডবিধির ৪৭৭ ধারার আওতায় দায়ের হওয়া আবেদনগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, এসব আবেদনের কারণে রায় কার্যকর হওয়া দীর্ঘ সময় স্থগিত থাকলে মামলার এক পক্ষ অযৌক্তিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা লাভবান হতে পারে। তাই এ ধরনের আবেদনের দ্রুত নিষ্পত্তি জরুরি।
রায়ের মান ও গ্রহণযোগ্যতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সব আদালতের রায়ই হতে হবে সুদৃঢ়, যুক্তিনির্ভর ও নির্ভুল। কারণ বিচার বিভাগের সিদ্ধান্ত জনগণের নজরদারির মধ্যেই থাকে। দেশের সর্বোচ্চ বিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও বেশি। এখানকার রায় যুক্তি, আইনগত ভিত্তি, ভাষাশৈলী ও উপস্থাপনার দিক থেকে অনুকরণীয় হওয়া উচিত।”
সবশেষে তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টে বিপুলসংখ্যক মামলা জমা পড়া সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্য হারে মামলার নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছে, যা এই প্রতিষ্ঠানের বিচারক ও কর্মীদের নিরলস পরিশ্রম ও আত্মনিবেদনের প্রমাণ বহন করে।
আপনার কমেন্ট