বুধবার ১৭ জুন ২০২৬ - ১০:৩১
মুমিনদের পরস্পরের প্রতি কী কী অধিকার রয়েছে?

সামাজিক ও নৈতিক জীবন গঠনে মুমিনদের পারস্পরিক অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম)-এর একটি হাদিসে একজন মুমিনের ওপর অপর মুমিনের সাতটি অধিকার বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদা, অন্তরের ভালোবাসা, সম্পদে সহমর্মিতা, গীবত প্রতিরোধ, অসুস্থ অবস্থায় খোঁজখবর নেওয়া, জানাজায় অংশগ্রহণ এবং মৃত্যুর পরও তার সৎগুণের স্মরণ। শহীদ আয়াতুল্লাহ ইমাম খামেনেয়ী (রহ.) এসব অধিকারকে মুমিনদের মধ্যে সুস্থ নৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মৌলিক ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: শহীদ আয়াতুল্লাহ ইমাম খামেনেয়ী (রহ.) তাঁর দারসে খারিজে ফিকহের সূচনালগ্নে প্রায়ই নৈতিক হাদিসের ব্যাখ্যা প্রদান করতেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম)-এর একটি হাদিসের আলোকে তিনি ‘মুমিনদের পারস্পরিক অধিকার’ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম নিম্নরূপ—

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) তাঁর পিতা থেকে, তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের সূত্রে এবং তাঁরা আমিরুল মুমিনীন আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—

لِلْمُؤْمِنِ عَلَى الْمُؤْمِنِ سَبْعَةُ حُقُوقٍ وَاجِبَةٌ مِنَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ عَلَيْهِ

অর্থাৎ, “একজন মুমিনের ওপর অপর মুমিনের সাতটি অধিকার রয়েছে, যা মহান আল্লাহ তার ওপর অপরিহার্য করে দিয়েছেন।”

অতএব, এসব অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ ও পালন করা উচিত।

প্রথম অধিকার:

 الإجلال له في عينه

তুমি তোমার মুমিন ভাইকে শ্রদ্ধা ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখবে। তার ঈমানের কারণে তাকে সম্মানিত মনে করবে এবং কখনো তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের চোখে দেখবে না। এই হাদিসের শিক্ষা হলো—মুমিনদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে সম্মান ও শ্রদ্ধাপূর্ণ।

দ্বিতীয় অধিকার:

والوُدُّ له في صدره

তার প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা নিজের অন্তরে ধারণ করবে। ঈমানের বন্ধন কেবল বাহ্যিক সম্পর্ক নয়; তা হৃদয়ের গভীর অনুরাগ ও আন্তরিকতারও দাবি রাখে।

তৃতীয় অধিকার:

والمواساة له في ماله

নিজের সম্পদে তার সঙ্গে সহমর্মিতা প্রদর্শন করবে। তোমার সামর্থ্য থাকলে এবং সে অভাবগ্রস্ত হলে তাকে সাহায্য করবে। একজন মুমিন অন্য মুমিনের কষ্ট ও প্রয়োজনের প্রতি উদাসীন থাকতে পারে না।

চতুর্থ অধিকার:

وأن يُحرِّم غيبته

তার গীবতকে হারাম মনে করবে; নিজে তার গীবত করবে না এবং অন্যদেরও তা করতে দেবে না। অর্থাৎ, মুমিনের সম্মান রক্ষা করা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব।

পঞ্চম অধিকার:

وأن يعوده في مرضه

সে অসুস্থ হলে তার খোঁজখবর নেবে এবং তাকে দেখতে যাবে। অসুস্থতার সময় পাশে দাঁড়ানো ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিকতার গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ।

ষষ্ঠ অধিকার:

وأن يُشيِّع جنازته

তার মৃত্যুর পরও তার প্রতি দায়িত্বের অবসান ঘটে না। সে ইন্তেকাল করলে তার জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতায় অংশগ্রহণ করবে। ইসলামী ভ্রাতৃত্ব মৃত্যুর মাধ্যমেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না।

সপ্তম অধিকার:

وأن لا يقول فيه بعد موته إلا خيراً

তার মৃত্যুর পর তার সম্পর্কে কেবল ভালো কথাই বলবে। যদি তার কোনো ত্রুটি থেকেও থাকে, তা মানুষের কাছে প্রচার করবে না।

এ প্রসঙ্গে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) থেকে আরেকটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে—

اُذْكُرُوا مَحَاسِنَ مَوْتَاكُمْ وَكُفُّوا عَنْ مَسَاوِيهِمْ

অর্থাৎ, “তোমাদের মৃতদের ভালো গুণাবলি স্মরণ করো এবং তাদের দোষ-ত্রুটি আলোচনা করা থেকে বিরত থাকো।”

মানুষ মৃত্যুর পর নিজের পক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তাই ইসলামের শিক্ষা হলো—মৃত ব্যক্তির সৎগুণগুলো স্মরণ করা এবং তার ত্রুটিগুলো প্রচার না করা। কেননা, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই এমন কিছু ভালো গুণ থাকে, যা স্মরণ ও মূল্যায়নের যোগ্য।

তথ্যসূত্র:

১. আল-আমালী, শাইখ সাদূক, পৃষ্ঠা ৮৫।

২. নাহজুল ফাসাহাহ; রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত হাদিস: “তোমাদের মৃতদের ভালো দিকগুলো স্মরণ করো এবং তাদের অসঙ্গতিগুলো উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকো।”

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha