হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা মানবজীবনের মূল্য, বিশেষত শিশুদের জীবনের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেন যে, শিশুদের কখনোই রাজনৈতিক স্বার্থ ও ভৌগোলিক সংঘাতের বলি হওয়া উচিত নয়। তারা আরও বলেন, বিশ্বসমাজের উচিত নয় জুলুম, সহিংসতা ও অবিচারের বিরুদ্ধে নীরব থাকা।
অনুষ্ঠানে ভারতের জন্য ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন আব্দুল মাজিদ হাকিম ইলাহি-এর একটি ভিডিও বার্তা প্রদর্শন করা হয়।
তিনি তার বার্তায় মিনাবের ঘটনায় নিহতদের প্রতি ভারতের জনগণের সমবেদনার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, ভারতীয় জনগণের শোকবার্তা, দোয়া ও ভালোবাসার প্রকাশ ইরান ও ভারতের মধ্যকার ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রতিফলন।
তিনি আরও বলেন, কঠিন সময় ও শোকের মুহূর্তে এ ধরনের সংহতি জাতিগুলোর মধ্যে মানবিক সম্পর্ক, ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যকে আরও সুদৃঢ় করতে পারে।
ভারতের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট আইনজীবী মজিদ মেমন মিনাবের ঘটনাকে “মানবজাতির বিবেককে নাড়া দেওয়া এক মর্মান্তিক বিপর্যয়” বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে স্কুলে যাওয়া শিশুরা সহিংসতা ও যুদ্ধের শিকার হয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুদ্ধ কখনোই সমস্যার সমাধান নয়; বরং এটি ধ্বংস, দুর্ভোগ ও মানবিক বিপর্যয় বাড়িয়ে তোলে। একই সঙ্গে তিনি এ ঘটনার প্রতি কার্যকর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার অভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং এ ধরনের বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক সংহতির আহ্বান জানান।
বেঙ্গালুরুর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও সমাজকর্মী আগা সুলতান নিরীহ শিশুদের নিহত হওয়াকে মানবতার বিবেকের ওপর গভীর আঘাত বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ১৬৮ শিশুর মৃত্যু বিশ্বের স্বাধীনচেতা ও ন্যায়বিচারপ্রত্যাশী মানুষকে শোকাহত করেছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, নানা প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও এসব অপরাধের ক্ষেত্রে এখনো প্রকৃত বিচার ও জবাবদিহিতা দেখা যায়নি। তিনি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শিক্ষা অনুসরণ করে জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোকে নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন।
ব্রিগেডিয়ার ড. জি. ডি. হিন্দি তার বক্তব্যে ইরান ও ভারতের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দুই দেশই ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বহিরাগত চাপ ও চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করেছে এবং দুই জাতির মধ্যে গভীর মানবিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন বিদ্যমান।
তিনি মিনাবের ঘটনায় ১৬৮ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং এটিকে মানবতার জন্য এক বড় ট্র্যাজেডি বলে আখ্যায়িত করেন। পাশাপাশি তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং বলেন, ধৈর্য, ঐক্য ও আত্মত্যাগের মনোভাবের মাধ্যমে জাতিগুলো সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিও অতিক্রম করতে সক্ষম।
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী-এর সাবেক উপদেষ্টা সুধীন্দ্র কুলকার্নি যুদ্ধের মানবিক পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, বেসামরিক মানুষ, বিশেষ করে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণকে বৈশ্বিক অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত নিরীহ মানুষের কষ্টের প্রতি উদাসীন না থাকা।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ভারতের জন্য ইসলামী বিপ্লবের নেতার প্রতিনিধির উপপ্রতিনিধি ড. মোহাম্মদ হোসেইন জিয়াই-নিয়া এবং ভারতের অভিজ্ঞ সাংবাদিক ও সাবেক রাজ্যসভা সদস্য কুমার কেতকার-সহ বিভিন্ন শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও গণমাধ্যমকর্মী।
মিনাবের শিক্ষার্থীদের প্রতি ভারতীয় শিশুদের সহমর্মিতার বার্তা
অনুষ্ঠানের শেষে মুম্বাইয়ে অবস্থিত ইরান কালচারাল হাউস-এর প্রধান ড. মোহাম্মদ রেজা ফাজেল আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জানান। তিনি জানান, ভারতীয় শিক্ষার্থীদের আঁকা ছবি ও শিল্পকর্ম মিনাবের স্কুলে পাঠানো হবে, যাতে ভারতের শিশুদের ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সংহতির বার্তা ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছে যায়।
শান্তি ও মানবতার বিষয়ভিত্তিক চিত্রপ্রদর্শনী
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং শান্তি, বন্ধুত্ব ও মানবিক সহমর্মিতা বিষয়ক একটি চিত্রপ্রদর্শনী।
অংশগ্রহণকারী শিশুরা শিল্পকলার মাধ্যমে যুদ্ধ ও সহিংসতার প্রতি তাদের বিরোধিতা প্রকাশ করে এবং বিশ্বজুড়ে শিশুদের সুরক্ষা, শান্তি ও বন্ধুত্বের গুরুত্বের ওপর জোর দেয়।
অনুষ্ঠানের সমাপনীতে উপস্থিত সবাই যুদ্ধ ও সহিংসতার প্রভাব থেকে শিশুদের রক্ষার লক্ষ্যে যৌথ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন এবং মানবিক মূল্যবোধ, শান্তি ও জাতিগুলোর মধ্যে সহাবস্থানের সংস্কৃতি জোরদারের আহ্বান জানান।
আপনার কমেন্ট