বুধবার ১৭ জুন ২০২৬ - ১৩:৪০
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শোকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ক্রন্দন

শোক পালন ও ক্রন্দন সৃষ্টিগত ঐতিহ্যগুলোর অন্তর্ভুক্ত; শিয়া ও সুন্নি উভয় উৎসেই নবী করীম (সা.)-এর কান্নার দলিল বিদ্যমান।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শোকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ক্রন্দন:

يَا فَاطِمَةُ كُلُّ عَيْنٍ بَاكِيَةٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَّا عَيْنٌ بَكَتْ عَلَي مُصَابِ الْحُسَيْنِ فَإِنَّهَا ضاحِكَةٌ مُسْتَبْشِرَةٌ بِنَعِيمِ الْجَنَّة .

(বিহারুল আনওয়ার আল-জামে' লি দুরারি আখবারিল আ'ই্মাতিল আতহার, খণ্ড ৪৪, পৃষ্ঠা ২৯৩:)

হে ফাতিমা! কিয়ামতের দিন প্রতিটি চক্ষুই ক্রন্দনরত হবে, কিন্তু সেই চক্ষু ছাড়া যে চক্ষু হোসাইনের শোকে কেঁদেছে; সেই চক্ষুর অধিকারী হবে হাস্যময় এবং তাকে জান্নাতের নেয়ামতসমূহের সুসংবাদ দেওয়া হবে।

শোক পালন ও ক্রন্দন: সৃষ্টির একটি ঐতিহ্য

মানুষের মধ্যে আল্লাহর অন্যতম একটি রীতি, যা ফিতরাতি ও স্বভাবগত দিকও রাখে, তা হলো আনন্দদায়ক বা দুঃখজনক ঘটনার সম্মুখীন হলে তার আত্মিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা। যখন সে কোনো সংবাদ শোনে বা অপ্রত্যাশিত কোনো বিষয়ের মুখোমুখি হয়, তখন তার অন্তরের অনুভূতি উদ্দীপ্ত হয় এবং সে অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়।

তিক্ত ঘটনার ক্ষেত্রে এই অবস্থাকে মুসিবত ও কষ্ট নামে অভিহিত করা হয় এবং মানুষ অশ্রু, ক্রন্দন ও আফসোসের মাধ্যমে তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে।

ঠিক তেমনি সুখকর ঘটনা, দৃশ্য ও আনন্দদায়ক সংবাদের সম্মুখীন হলে মানুষ তার অন্তর্নিহিত অবস্থাকে আনন্দ ও খুশির মাধ্যমে প্রকাশ করে।

যে মা তার সন্তান বা প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, তাঁর অশ্রুবিন্দু যেখানে তার অন্তরের ও আত্মার কষ্টের সাক্ষ্য দেয়, এবং প্রিয়জনের মৃত্যুতে তিনি অধৈর্য হন-এটি মাতৃত্বের ফিতরাতি অনুভূতির একটি স্পষ্ট উদাহরণ, যা কেবল নিন্দিত বা তিরস্কৃত হয় না, বরং প্রশংসনীয় ও গৌরবময়ও বটে।

সুতরাং, বিলাপ, শোক পালন ও মাতম গাওয়ার মূল উৎস হলো মানুষের ফিতরাত ও অন্তর্নিহিত প্রকৃতি। আর এগুলোকে অস্বীকার করা মানেই ফিতরাতি বিষয়গুলোকে অস্বীকার করা।

প্রত্যেক মাসুম ইমাম (আ.) এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, যা অন্যদের মধ্যে ছিল না। হযরত সাইয়্যিদুশ শুহাদা ইমাম হোসাইন (আ.)-ও এমন কিছু বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, যা অন্যান্য মাসুমদের মধ্যে কেউই অনুভাব করেননি। তার মধ্যে একটি হলো, সকল নবী ও ওসী (অভিভাবক) তাঁর শোক-মুসিবতে অশ্রুপাত করেছেন-তাঁর জন্মের আগেও এবং পর-এবং এই অশ্রুপাতকে তারা নিজেদের গর্ব ও অহংকারের কারণ হিসেবে গণ্য করেন।

আমরা এখানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ক্রন্দনের কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করছি। এই বিষয়ে রেওয়ায়েত এত বেশি যে এত অল্প পরিসরে সেগুলো একত্র করা সম্ভব নয়। আমরা "এক মুঠমুনা, এক মণ ধানের" ন্যায় কয়েকটি শিয়া সূত্রের হাদিস আরও কয়েকটি সহিহ্ আহলে সুন্নতের কিতাব থেকে রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করছি।

শিয়া রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ক্রন্দন:

এই বিষয়ে শিয়া সূত্রে অসংখ্য রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে, আমরা এখানে কয়েকটি রেওয়ায়েত উল্লেখ করছি। মরহুম শেখ সাদূক তাঁর পবিত্র গ্রন্থ 'উয়ুনু আখবারির রেজা (আ.)'-এ লিখেছেন:

... فَلَمَّا كَانَ بَعْدَ حَوْلٍ وُلِدَ الْحُسَيْنُ (عليه السلام) وَ جَاءَ النَّبِيُّ (صلي الله عليه و آله و سلم) فَقَالَ يَا أَسْمَاءُ هَلُمِّي ابْنِي فَدَفَعْتُهُ إِلَيْهِ فِي خِرْقَةٍ بَيْضَاءَ فَأَذَّنَ فِي أُذُنِهِ الْيُمْنَي وَ أَقَامَ فِي الْيُسْرَي وَ وَضَعَهُ فِي حَجْرِهِ فَبَكَي فَقَالَتْ أَسْمَاءُ بِأَبِي أَنْتَ وَ أُمِّي مِمَّ بُكَاؤُكَ قَالَ عَلَي ابْنِي هَذَا قُلْتُ إِنَّهُ وُلِدَ السَّاعَةَ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَقَالَ تَقْتُلُهُ الْفِئَةُ الْبَاغِيَةُ مِنْ بَعْدِي لَا أَنَالَهُمُ اللَّهُ شَفَاعَتِي ثُمَّ قَالَ يَا أَسْمَاءُ لَا تُخْبِرِي فَاطِمَةَ بِهَذَا فَإِنَّهَا قَرِيبَةُ عَهْدٍ بِوِلَادَتِه ...

('উয়ুনু আখবারির রেজা (আ.)' খণ্ড ২ পৃষ্টা ২৬)

আসমা বর্ণনা করেন: পরের বছর হুসাইন (আ.) জন্মগ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর কাছে এলেন এবং বললেন: হে আসমা! আমার সন্তানকে নিয়ে এসো। আসমা বললেন, তখন হুসাইনকে সাদা কাপড়ে পেঁচানো অবস্থায় আমি তাঁর হাতে দিলাম। তিনি (সা.) তাঁর (হুসাইনের) ডান কানে আজান এবং বাম কানে ইকামত পড়লেন। তারপর তাঁকে কোলে নিয়ে কাঁদলেন। আসমা বললেন: আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক! এই কান্না কিসের জন্য? আর কেন আপনি কাঁদছেন? নবী (সা.) বললেন: আমি এই আমার সন্তানের অবস্থার জন্য কাঁদছি। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসুল! সে তো এখনই জন্মগ্রহণ করল! নবী (সা.) বললেন: আমার পরে জালিমরা তাকে শহীদ করবে। আল্লাহ তাদেরকে আমার সুপারিশ দান করবেন না। তারপর তিনি বললেন: হে আসমা! এই খবর (যে তাকে হত্যা করা হবে) ফাতিমাকে জানিও না, কারণ সে সদ্য প্রসবা হয়েছে।

মরহুম শেখ মুফিদ তাঁর 'আল-ইরশাদ' গ্রন্থে লিখেছেন:

عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ خَرَجَ مِنْ عِنْدِنَا ذَاتَ لَيْلَةٍ فَغَابَ عَنَّا طَوِيلًا ثُمَّ جَاءَنَا وَ هُوَ أَشْعَثُ أَغْبَرُ وَيَدُهُ مَضْمُومَةٌ فَقُلْتُ لَهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا لِي أَرَاكَ أَشْعَثَ مُغْبَرّاً فَقَالَ أُسْرِيَ بِي فِي هَذِهِ اللَّيْلَةِ إِلَي مَوْضِعٍ مِنَ الْعِرَاقِ يُقَالُ لَهُ كَرْبَلَاءُ فَرَأَيْتُ فِيهِ مَصْرَعَ الْحُسَيْنِ وَ جَمَاعَةٍ مِنْ وُلْدِي وَ أَهْلِ بَيْتِي فَلَمْ أَزَلْ أَلْتَقِطُ دِمَاءَهُمْ فِيهَا هِيَ فِي يَدِي وَ بَسَطَهَا فَقَالَ خُذِيهِ وَ احْتَفِظِي بِهِ فَأَخَذْتُهُ فَإِذَا هِيَ شِبْهُ تُرَابٍ أَحْمَرَ فَوَضَعْتُهُ فِي قَارُورَةٍ وَ شَدَدْتُ رَأْسَهَا وَ احْتَفَظْتُ بِهَا فَلَمَّا خَرَجَ الْحُسَيْنُ (عليه السلام) مُتَوَجِّهاً نَحْوَ أَهْلِ الْعِرَاقِ كُنْتُ أُخْرِجُ تِلْكَ الْقَارُورَةَ فِي كُلِّ يَوْمٍ وَ لَيْلَةٍ فَأَشَمُّهَا وَ أَنْظُرُ إِلَيْهَا ثُمَّ أَبْكِي لِمُصَابِهَا فَلَمَّا كَانَ يَوْمُ الْعَاشِرِ مِنَ الْمُحَرَّمِ وَ هُوَ الْيَوْمُ الَّذِي قُتِلَ فِيهِ أَخْرَجْتُهَا فِي أَوَّلِ النَّهَارِ وَ هِيَ بِحَالِهَا ثُمَّ عُدْتُ إِلَيْهَا آخِرَ النَّهَارِ فَإِذَا هِيَ دَمٌ عَبِيطٌ فَضَجِجْتُ فِي بَيْتِي وَ كَظَمْتُ غَيْظِي مَخَافَةَ أَنْ يَسْمَعَ أَعْدَاؤُهُمْ بِالْمَدِينَةِ فَيُسْرِعُوا بِالشَّمَاتَةِ فَلَمْ أَزَلْ حَافِظَةً لِلْوَقْتِ وَ الْيَوْمِ حَتَّي جَاءَ النَّاعِي يَنْعَاهُ فَحُقِّقَ مَا رَأَيْتُ .

(আল-ইরশাদ ফি মারিফাতি হুজাজিল্লাহি আলাল ইবাদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৩০, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ফযিলত ও মর্যাদা অধ্যায়। এবং ই’লামুল ওয়ারা বি আ’লামিল হুদা, পৃষ্ঠা ২১৯, তৃতীয় অধ্যায়: الفصل الثالث في ذكر بعض خصائصه و مناقبه و فضائله)

উম্মে সালামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: এক রাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের কাছ থেকে দূরে চলে গেলেন এবং এই অনুপস্থিতি কিছু দীর্ঘস্থায়ী হলো। কিছুক্ষণ পর তিনি ফিরে এলেন, তখন তাঁকে ধুলিমলিন ও অবসন্ন দেখাচ্ছিল এবং তিনি তাঁর দু'হাত একত্র করে রেখেছিলেন। আমি বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনাকে ধুলিময় দেখছি। তিনি বললেন: আমাকে এই রাতে ইরাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং 'কারবালা' নামক একটি স্থানে নামানো হয়েছিল। সেখানে আমি হুসাইনের শহীদ হওয়ার স্থান দেখেছি-সেখানে সে আমার সন্তান ও পরিবারের একটি দলের সাথে শহীদ হবে। আর আমি তাদের রক্ত সংগ্রহ করছিলাম এবং এই মুহূর্তে আমার হাতে সেই রক্তের কিছু অংশ রয়েছে।

এই সময় নবী (সা.) রক্তগুলো আমাকে দিয়ে বললেন: এই রক্ত সংরক্ষণ করে রাখো। আমি তাঁর কাছ থেকে রক্ত নিলাম, যা ছিল লাল মাটির মতো। আমি রক্ত একটি শিশিতে রেখে সংরক্ষণ করলাম। যখন হুসাইন (আ.) ইরাকের দিকে রওনা হলেন, আমি প্রতিদিন ওই শিশিটি দেখতাম, তা শুঁকতাম এবং তার শোকে কাঁদতাম।

মুহররমের দশম দিন যখন উপস্থিত হলো, দিনের প্রথম ভাগে আমি শিশিটি দেখলাম, তখন তা আগের অবস্থায়ই ছিল। কিন্তু দিনের শেষভাগে আবার তা দেখলাম, লক্ষ্য করলাম তা ঘন রক্তে পরিণত হয়েছে। আমি হঠাৎ চিৎকার করে উঠলাম, কিন্তু তার শত্রুদের ভয়ের কারণে তা চেপে রাখলাম। আমি সর্বদা অপেক্ষায় ছিলাম, হঠাৎ মদিনায় হুসাইন ইবনে আলী (আ.)-এর হত্যার সংবাদ ঘোষণা করা হলো।

এবং আরও লিখেছেন:

وَ رَوَي السَّمَّاكُ عَنِ ابْنِ الْمُخَارِقِ عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ بَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ (صلي الله عليه و آله و سلم) ذَاتَ يَوْمٍ جَالِسٌ وَ الْحُسَيْنُ (عليه السلام) فِي حَجْرِهِ إِذْ هَمَلَتْ عَيْنَاهُ بِالدُّمُوعِ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَاكَ تَبْكِي جُعِلْتُ فِدَاكَ قَالَ جَاءَنِي جَبْرَئِيلُ (عليه السلام) فَعَزَّانِي بِابْنِيَ الْحُسَيْنِ وَ أَخْبَرَنِي أَنَّ طَائِفَةً مِنْ أُمَّتِي سَتَقْتُلُهُ لَا أَنَالَهُمُ اللَّهُ شَفَاعَتِي .

(আল-ইরশাদ ফি মারিফাতি হুজাজিল্লাহি আলাল ইবাদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৩০, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ফযিলত ও মর্যাদা অধ্যায়। এবং ই'লামুল ওয়ারা বি আ'লামিল হুদা, পৃষ্ঠা ২১৯)

উম্মে সালামা বলেন: একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) বসেছিলেন এবং হুসাইন (আ.) তাঁর কোলে ছিলেন। এমন সময় হঠাৎ তাঁর চোখ অশ্রুতে ভরে গেল। আমি বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনাকে ক্রন্দনরত দেখছি। তিনি বললেন: জিবরাইল আমার কাছে এসে আমাকে হুসাইনের ব্যাপারে সান্ত্বনা দিয়েছেন এবং আমাকে অবহিত করেছেন যে আমার উম্মতের একটি দল তাকে হত্যা করবে। আল্লাহ তাদেরকে আমার শাফায়াত (সুপারিশ) থেকে বঞ্চিত করবেন।

(আল-ইরশাদ ফি মারিফাতি হুজাজিল্লাহি আলাল ইবাদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১২৯, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ফযিলত ও মর্যাদা অধ্যায়)

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha