শনিবার ২০ জুন ২০২৬ - ১৩:৫৯
জিয়ারতে আশুরা: “সালম” ও “হারব” কিয়ামত পর্যন্ত বেলায়েত ও বারাআতের সীমারেখা নির্ধারণ করে

জিয়ারতে আশুরার “সিলমুন লিমান সালামাকুম ওয়া হারবুন লিমান হারাবাকুম” — এই অংশের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: জিয়ারতে আশুরা কেবল একটি ঐতিহাসিক শোকগাথা নয়, বরং এটি বিশ্বাসীর চিরস্থায়ী অবস্থান নির্ধারণকারী একটি পরিচয়পত্র; যা সত্য ও মিথ্যার সংঘাতে তার অবস্থানকে স্পষ্ট করে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: এখানে “সিলম” অর্থ হলো আহলে বাইতের সাথে পূর্ণ শান্তি, একাত্মতা ও আনুগত্য; আর “হারব” অর্থ হলো তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে স্থায়ী বিরোধিতা ও অবস্থান গ্রহণ। এই দুটি বিষয়ই ইসলামী ঈমানের মৌলিক স্তম্ভ—বেলায়েত (আল্লাহ ও তাঁর প্রিয়জনদের সাথে সম্পর্ক) এবং বারাআত (শত্রুদের থেকে বিচ্ছিন্নতা)-এর অংশ।

ইসলাম একদিকে ভালো মানুষ ও আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের প্রতি ভালোবাসার ধর্ম, আবার অন্যদিকে এটি জুলুমকারী, পথভ্রষ্ট, ফাসাদকারী ও আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারীদের থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেয়। এই দুই দিক পরস্পরের পরিপূরক; একটির অভাবে ঈমান পূর্ণতা লাভ করে না।

কুরআনের দলিল
কুরআন কারিমে বলা হয়েছে:

الَّذِينَ آمَنُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ.

“যারা ঈমান আনে তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, আর যারা কুফর করে তারা তাগুতের পথে যুদ্ধ করে।”
(সূরা আন-নিসা: ৭৬)

হাদিসসমূহ
এ প্রসঙ্গে বহু রেওয়ায়েতে এসেছে:

هَلِ الدِّينُ إِلَّا الْحُبُّ؟

“কি দ্বীন শুধু ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু?”

অর্থাৎ দ্বীনের ভিত্তি হলো ভালোবাসা, তবে এই ভালোবাসা এমন হতে হবে যা আল্লাহর ওলীদের অনুসরণে বাস্তব রূপ লাভ করে।

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে:

هَلِ الدِّينُ إِلَّا الْحُبُّ وَالْبُغْضُ؟

“কি দ্বীন শুধু ভালোবাসা ও ঘৃণার নাম নয়?”

অর্থাৎ প্রকৃত দ্বীন হলো সৎ ও ন্যায়ের অনুসারীদের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং অসৎ ও অন্যায়ের অনুসারীদের প্রতি দৃঢ় ঘৃণা ও বিরোধিতা।

জিয়ারতের দলিল
এই শিক্ষা বিভিন্ন দোয়া ও জিয়ারতে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন জিয়ারতে জামে কাবিরায় বলা হয়েছে:

فَمَعَكُمْ مَعَكُمْ لَا مَعَ عَدُوِّكُمْ

“আমি আপনাদের সাথেই, আপনাদের সাথেই; আপনাদের শত্রুদের সাথে নই।”

অতএব, আমরা ইমাম আবা আবদিল্লাহ আল-হুসাইন (আ.)-কে উদ্দেশ করে বলি: হে আবা আবদিল্লাহ! যে আপনার সাথে শান্তিতে আছে, আমি তার সাথে শান্তিতে; আর যে আপনার সাথে যুদ্ধে আছে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে আছি।

“সালম” ও “হারব”: সাময়িক নয়, বরং পরিচয়ের অংশ
এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, “সালম” ও “হারব” শব্দ দুটি গভীর অর্থ বহন করে। এখানে কেবল “সালিম” বা “মুহারিব” বলা হয়নি; বরং বলা হয়েছে—আমি সম্পূর্ণভাবে শান্তি সেই সকলের সাথে যারা আপনাদের সাথে শান্তিতে আছে, এবং সম্পূর্ণভাবে যুদ্ধ সেই সকলের সাথে যারা আপনাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত।

এটি কোনো সাময়িক অবস্থান বা আবেগপ্রসূত প্রতিক্রিয়া নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রিক পরিচয়, যা বেলায়েত-এর রঙে রঞ্জিত।

চিরস্থায়িত্বের ঘোষণা
এই অবস্থান কেবল একটি নির্দিষ্ট সময় বা অঞ্চলের জন্য নয়, বরং:

إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ

“কিয়ামত পর্যন্ত।”

অতএব, আহলে বাইতের সাথে সালম এবং তাদের শত্রুদের সাথে হারব—এই নীতি চিরকালীন, অবিচল ও অপরিবর্তনীয়।

জিয়ারতে আশুরার দৃষ্টিতে সত্য ও মিথ্যার ধারা (জারিয়ান)
জিয়ারতে আশুরার বিভিন্ন অংশে আমরা একটি মৌলিক সত্যের মুখোমুখি হই, যাকে “ধারা” বা “জারিয়ান” বলা যেতে পারে—অর্থাৎ সত্যের ধারা বনাম মিথ্যার ধারা।

এই কারণে কেবল সেইসব ব্যক্তিদেরই নয় যারা আহলে বাইতের বিরোধিতার সূচনা করেছিল, বরং তাদেরও অভিশাপ করা হয়েছে যারা এই পথকে পরবর্তীতে অব্যাহত রেখেছে—চাই তারা বাহ্যত ধার্মিক হোক, বা সরাসরি অংশগ্রহণকারী, সহায়ক, প্রচারক, কিংবা সমর্থনকারী হোক।

এমনকি যারা কেবল শুনে সন্তুষ্ট থেকেছে বা অন্যায়ের প্রতি নীরব সমর্থন দিয়েছে—তারাও এই মিথ্যা ধারার অন্তর্ভুক্ত।

এটি কোনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নয়; বরং একটি দীনী ও আদর্শিক অবস্থান, যা চিরকালীন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
ইতিহাসে দেখা যায়, ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে আহলে বাইতের বিরোধী শক্তিগুলো রাজনৈতিক কৌশল, ষড়যন্ত্র এবং জটিল পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে নেয় এবং সত্যপথের নেতৃত্বকে পাশ কাটিয়ে দেয়। এই ধারাটি পরবর্তী যুগেও বিভিন্ন রূপে অব্যাহত থেকেছে।

যতক্ষণ সত্য তার প্রকৃত কেন্দ্র থেকে বিচ্যুত থাকবে এবং মিথ্যা শক্তির হাতে থাকবে, ততক্ষণ বিভ্রান্তি অব্যাহত থাকতে পারে—যেখানে অনেকেই নিজেদের সত্যপন্থী মনে করলেও বাস্তবে তারা ভিন্ন অবস্থানে থাকে।

বাহ্যিক সাদৃশ্য দ্বারা বিভ্রান্তি
তাই কেবল স্লোগান বা বাহ্যিক অবস্থান দেখে প্রকৃত সত্য নির্ধারণ করা যায় না। অনেক সময় ধর্মীয় বা নৈতিক স্লোগান ব্যবহৃত হলেও তা ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।

অতএব প্রকৃত ও নকল অবস্থান চিহ্নিত করতে হলে কেবল কথার ওপর নয়, বরং বাস্তব কর্ম ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করতে হবে।

এই প্রেক্ষিতে আলে যিয়াদ, আলে মারওয়ান এবং বনি উমাইয়ার লানত উল্লেখ করা হয়েছে, যা সত্যের শত্রুদের সুস্পষ্ট পরিচয় বহন করে।

সহযোগী ও সহায়ক শক্তির দায়
যারা সরাসরি অন্যায় করে না, কিন্তু অর্থ, প্রচারণা, মিডিয়া, রাজনৈতিক সমর্থন বা সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে অন্যায়কে শক্তিশালী করে—তারাও সেই অপরাধের অংশীদার।

এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো:

لَعَنَ اللهُ أُمَّةً أَسْرَجَتْ وَأَلْجَمَتْ وَتَنَقَّبَتْ لِقِتَالِكَ

“আল্লাহ সেই জাতিকে লানত করেছেন যারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে, অস্ত্র সজ্জিত করেছে এবং তোমার বিরুদ্ধে বেরিয়েছে।”

অর্থাৎ ফিতনা শুধু সূচনাকারীর নয়; বরং যারা তাকে শক্তিশালী করে তারাও এর অংশ।

ফিতনার মূল চেতনা ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর অবস্থান
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, যেমন ইয়াজিদের শাসনামলে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করা হয়েছিল, তেমনি প্রতিটি যুগেই সত্য ও মিথ্যার সংঘাত অব্যাহত রয়েছে।

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বিপ্লবের মূল চেতনা হলো—সত্যকে রক্ষা করা এবং বিকৃত নেতৃত্ব ও ফিতনাকে প্রত্যাখ্যান করা।

অতএব, জিয়ারতে আশুরা কেবল একটি আবেগময় দোয়া নয়; বরং এটি একটি আদর্শিক ঘোষণা:

সত্যের সাথে পূর্ণ ও স্থায়ী সম্পর্ক (বেলায়েত) এবং মিথ্যার সাথে পূর্ণ ও স্থায়ী বিচ্ছিন্নতা (বারাআত)—এই দুই নীতি ঈমানের অপরিহার্য অংশ।

এই অবস্থান কোনো সাময়িক আবেগ নয়, বরং একটি সচেতন, দৃঢ় ও চিরস্থায়ী আদর্শিক অঙ্গীকার, যা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha