রবিবার ২১ জুন ২০২৬ - ১০:১৫
মহররমের ষষ্ঠ রজনীতে প্রজ্ঞার দীপ্তি: যখন বোধের পরিপক্বতা বয়সকে অতিক্রম করে

কিছু কিছু ইতিহাস কোনো নাম দিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় একটি প্রশ্ন দিয়ে। এমন এক প্রশ্ন, যার গভীর উত্তর একজন মানুষের ভাগ্য তো বটেই, কখনো কখনো ইতিহাসের গতিপথও বদলে দিতে পারে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: মহররমের ষষ্ঠ রজনী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় এক সচেতন ও ইতিহাস-নির্ধারক সিদ্ধান্তের কথা। উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার সেই ক্ষণে এক কিশোর তার বয়সের ওপর নয়, আস্থা রেখেছিল নিজের বিশ্বাসের ওপর। নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্যের গভীর তাৎপর্য অনুধাবন করে সে সত্যের পথকেই বেছে নিয়েছিল।

সেদিনের রাত ছিল শান্ত, কিন্তু সেই সমবেত মানুষের কেউই পরদিনের প্রশান্ত ভবিষ্যতের অপেক্ষায় ছিল না। সবাই জানত, এক মহৎ ও ভাগ্যনির্ধারক ঘটনার দ্বারপ্রান্তে তারা দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যেকে নিজের উপলব্ধি, ঈমান ও চরিত্রের দৃঢ়তা অনুযায়ী আগামী দিনের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

সেই সমাবেশে উপস্থিত ছিল এক কিশোর, যার জীবনের বয়স খুব বেশি হয়নি। অথচ তার দৃষ্টির ব্যাপ্তি ও উপলব্ধির গভীরতা অনেক প্রবীণ ও অভিজ্ঞ মানুষের সীমাকেও অতিক্রম করেছিল। সে কোনো সেনাপতি ছিল না, ছিল না দীর্ঘ যুদ্ধ-অভিজ্ঞতার অধিকারী। তার সামনে পড়ে ছিল জীবনের অফুরন্ত সম্ভাবনা এবং পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগের অসংখ্য সুযোগ। কিন্তু মনে হচ্ছিল, সে যেন তার সময়ের আগেই সত্যকে চিনে নিয়েছে।

যখন সেই অন্ধকার তাঁবুর ভেতরে থাকা কিংবা চলে যাওয়ার প্রসঙ্গ উঠল, তখন তার ভাবনা ছিল না ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, আরাম-আয়েশ কিংবা আত্মরক্ষাকে ঘিরে। তার একমাত্র প্রশ্ন ছিল—সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে তার দায়িত্ব কী? তার করণীয় কোথায়?

সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে বয়স, বংশমর্যাদা কিংবা শারীরিক সক্ষমতার মতো সব বাহ্যিক মানদণ্ড অর্থহীন হয়ে পড়েছিল। মানুষকে পৃথক করছিল কেবল দায়িত্ববোধ, সত্য-উপলব্ধি এবং আত্মত্যাগের প্রস্তুতি।

সেই রাতে মানবসমাজ যেন দুটি বিপরীত চিত্র প্রত্যক্ষ করেছিল। কেউ কেউ দীর্ঘ জীবন পার করেও সত্য ও স্বার্থের সন্ধিক্ষণে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল; আবার কেউ কেউ অল্প বয়সেই সত্য সম্পর্কে এমন এক অবিচল প্রত্যয়ে পৌঁছেছিল, যা তাদের সিদ্ধান্তকে করেছিল দৃঢ় ও নির্ভীক।

ইতিহাসে এমন দৃশ্য বারবার ফিরে এসেছে। কখনো কখনো হৃদয় থেকে উৎসারিত একটি সচেতন সিদ্ধান্ত হাজারো বক্তৃতার চেয়েও অধিক শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে এবং অসত্যের মোকাবিলা করতে সবসময় বিপুল সামর্থ্য বা বাহ্যিক উপকরণের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় এমন এক নির্মল হৃদয়ের, যা বিভ্রান্তির ধুলিঝড়ের মাঝেও সত্যকে চিনে নিতে পারে এবং তার মূল্য দিতে ভয় পায় না।

এটি এক কিশোরের গল্প। সে চাইলে তার সমবয়সীদের মতো সময়ের ঘটনাবলির নীরব দর্শক হয়ে বলতে পারত, “এ লড়াই বড়দের।” কিন্তু সে তা করেনি। বরং সচেতনভাবে সত্যের অভিযাত্রার অংশ হয়ে উঠেছিল।

তার সিদ্ধান্ত আমাদের শেখায়, মানুষের মহত্ত্ব তার জীবনের বছরের সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় সে কত গভীর সত্যের পক্ষে অবিচল থাকতে পারে এবং সেই সত্যের জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকে, তার দ্বারা।

অবশেষে ইতিহাস তার নামকে চিরস্থায়ী অক্ষরে লিপিবদ্ধ করেছে আশুরার রক্তিম স্মৃতিপটে। সেই প্রজ্ঞাবান, দায়িত্বশীল ও কর্মমুখর কিশোর আর কেউ নন—হযরত কাসিম ইবনে হাসান (আ.)। তিনি ছিলেন ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর স্নেহধন্য পুত্র। তাঁর ঈমান, প্রজ্ঞা, আনুগত্য ও আত্মত্যাগ তাঁকে ইতিহাসের বুকে বীরত্ব, সত্যনিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য আদর্শে পরিণত করেছে।

সম্প্রতি ইসফাহানের বোজোর্গমেহর সড়কে আয়োজিত এক জনসমাবেশে ইরান ও হিজবুল্লাহর পতাকার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা একদল কিশোর বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল। কেউ পতাকা হাতে ছিল, কেউ সেবামূলক কার্যক্রমে ব্যস্ত, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে ছিল।

তাদের মধ্যে বয়সে অল্প এক কিশোরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “তুমি এখানে কেন এসেছ?”

সে উত্তর দিয়েছিল—

“আমি শুধু ঘরে বসে সবকিছু দেখে যেতে চাই না। আমার মনে হয়, আমারও একটি দায়িত্ব আছে। অন্যদের পাশে থাকা, বন্ধুদের সঙ্গে মানুষের ভিড়ে উপস্থিত থাকা—ঘরে বসে থাকার চেয়ে আমি এটিকেই বেশি অর্থবহ মনে করি।”

হয়তো এই সরল কয়েকটি বাক্যই শতাব্দী আগে আহলে বাইতের এক কিশোরের সেই মহান চেতনার কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যে চেতনা স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেয়, দূর থেকে দর্শক হয়ে থাকার বদলে সত্যের পাশে উপস্থিত থাকতে শেখায়।

আর সেই চেতনার নাম ইতিহাসে অমর হয়ে আছে—হযরত কাসিম ইবনে হাসান (আ.)।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha