হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, পর্ব ২-
দ্বিতীয় অধ্যায়
«مِثْلَهُ» বলতে কাকে বোঝায়?
ইয়াজিদ একজন ব্যক্তি নয়, একটি চিন্তা, একটি ব্যবস্থা ও একটি শাসন-শৈলীর নাম
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ঐতিহাসিক নির্দেশনায় «مِثْلِي لَا يُبَايِعُ مِثْلَهُ» -তে যেমন «مِثْلِي» শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি «مِثْلَهُ» শব্দটিও গুরুত্বপূর্ণ ও চিন্তার বিষয়। কারণ যতক্ষণ «مِثْلَهُ»-এর বাস্তবতা স্পষ্ট না হবে, ততক্ষণ এই মহান ঘোষণার ব্যাপ্তি ও চিরন্তনতাও সম্পূর্ণরূপে উদ্ভাসিত হবে না।
বাহ্যিকভাবে «مِثْلَهُ»-এর উদাহরণ হলো ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া, কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর প্রত্যাখ্যান কি শুধু ইয়াজিদ নামক একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ছিল, নাকি তার চেয়েও বড় করে একটি চিন্তা, একটি ব্যবস্থা ও একটি মিথ্যা শাসন-শৈলীর বিরুদ্ধে ছিল?
ইমামের নিজস্ব বাণী এই প্রশ্নের উত্তর প্রদান করে। যখন ওয়ালিদ ইবনে উতবা ইয়াজিদের বাইয়াত দাবি করলেন, তখন ইমাম (আ.) বললেন:
"আর ইয়াজিদ একজন পাপাচারী ব্যক্তি, মদ্যপানকারী, নিষিদ্ধ প্রাণের হত্যাকারী ও প্রকাশ্যে পাপাচারী।"
এই উক্তিতে ইমাম (আ.) ইয়াজিদের বংশ, পরিবার বা ব্যক্তিগত শত্রুতাকে বিষয় করেননি, বরং তার গুণাবলী বর্ণনা করেছেন। যেন সমস্যাটি ইয়াজিদের ব্যক্তিত্ব নয়, বরং পাপাচার, অত্যাচার, জবরদস্তি, দ্বীনের বিকৃতি, অবৈধ হত্যা ও প্রকাশ্য পাপের সরকার।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে «مِثْلَهُ» কোনো ব্যক্তির নাম নয়, বরং একটি চিন্তার নাম।
ইয়াজিদিয়্যাত: একটি চিরন্তন বিচ্যুতি
যদি ইয়াজিদ শুধু একজন ব্যক্তির নাম হতো, তাহলে তার মৃত্যুর সাথে সাথে ইয়াজিদিয়্যাতও শেষ হয়ে যেত, কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী যে অত্যাচার, স্বৈরাচার, দ্বীনের বিকৃতি ও ক্ষমতাপিপাসা বিভিন্ন রূপে সর্বদা বিদ্যমান ছিল।
বনু উমাইয়ার পরে বনু আব্বাস ক্ষমতা গ্রহণ করে, নাম বদলে যায় কিন্তু অত্যাচারের স্বভাব বজায় থাকে। আহলে বায়তের (আ.) উপর অত্যাচারের ধারা চলতে থাকে, সত্যকে দমন করার এবং দ্বীনকে রাজনীতির হাতিয়ার বানানোর পদ্ধতি অব্যাহত থাকে।
এই কারণেই ইয়াজিদ, হিশাম, মানসুর, হারুন, মুতাওয়াক্কিল ও মামুনের মধ্যে যদিও সময়গত ব্যবধান রয়েছে, কিন্তু অত্যাচার, স্বৈরাচার ও ক্ষমতাপিপাসার দিক থেকে তাদের বাস্তবতা এক।
যেমন আহলে বায়তের (আ.) আলো এক, তেমনি মিথ্যার বাস্তবতাও এক, যদিও তার মুখ ও নাম পরিবর্তিত হতে থাকে।
সত্য ও মিথ্যার সংগ্রাম: ব্যক্তিদের নয়, দুটি সংস্কৃতির যুদ্ধ
কারবালা আসলে দুটি ব্যক্তির মধ্যে যুদ্ধ ছিল না, বরং দুটি সংস্কৃতি ও দুটি চিন্তাধারার মধ্যে নির্ণায়ক যুদ্ধ ছিল।
একদিকে সেই মতবাদ যা নবুয়ত, ন্যায়বিচার, নৈতিকতা, মানবিক মর্যাদা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতিনিধি ছিল, এবং অন্যদিকে সেই ক্ষমতা যা দ্বীনকে সরকারের সুরক্ষার মাধ্যম এবং উম্মতকে নিজের ইচ্ছার দাস বানাতে চেয়েছিল।
এই কারণে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বাইয়াত প্রত্যাখ্যান একটি রাজনৈতিক পার্থক্য ছিল না, বরং দ্বীন ও রাজত্ব, ন্যায়বিচার ও জবরদস্তি, সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যের রেখা স্থাপনের নাম ছিল।
বনু উমাইয়া ও বনু আব্বাস: দুটি নাম, এক বাস্তবতা
ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, অত্যাচার সবসময় একই পোশাকে প্রকাশ পায় না।
বনু উমাইয়া আহলে বায়তের (আ.) বিরুদ্ধে তলোয়ার উঁচিয়েছিল, অন্যদিকে বনু আব্বাস কখনও কখনও আহলে বায়তের প্রতি ভালোবাসার স্লোগানের মাধ্যমে ক্ষমতা লাভ করে, কিন্তু যখন সরকার তাদের হাতে আসে, তখন একই অত্যাচার, একই জবরদস্তি এবং একই স্বৈরাচার নতুন মুখে প্রকাশ পায়।
অতএব, অপরাধ ও অত্যাচারের দিক থেকে ইয়াজিদ ও মুতাওয়াক্কিল, হিশাম ও মানসুর, হারুন ও মামুনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য নেই, কারণ মিথ্যার মূল বাস্তবতা হলো ক্ষমতাপিপাসা ও সত্যের সাথে শত্রুতা, নিছক কোনো পরিবার বা যুগের নাম নয়।
বর্তমান যুগে «مِثْلَهُ»-এর উদাহরণ
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বার্তা শুধু প্রথম হিজরি শতকের জন্য ছিল না। প্রতিটি যুগে যখন দ্বীনকে ক্ষমতার হাতিয়ার বানানো হয়, যখন অত্যাচারকে আইনের নাম দেওয়া হয়, যখন সত্যের কণ্ঠ নীরব করার চেষ্টা করা হয়, যখন মানবিক মর্যাদা পদদলিত হয়, যখন স্বার্থকে নীতির উপর প্রাধান্য দেওয়া হয়, সেখানেই ইয়াজিদিয়্যাত তার নতুন রূপে বিদ্যমান থাকে।
একইভাবে প্রতিটি যুগে সেই কণ্ঠগুলিও বজায় থাকে যারা মর্যাদা, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও সত্যের সুরক্ষার জন্য কুরবানি দিতে প্রস্তুত, আর এটিই হুসাইনি চিন্তার ধারাবাহিকতা।
অতএব, «مِثْلِي لَا يُبَايِعُ مِثْلَهُ» নিছক একটি ঐতিহাসিক বাক্য নয়, বরং সরকারের বৈধতা, ধর্মীয় নেতৃত্ব, মানবিক মর্যাদা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি চিরন্তন মানদণ্ড।
এই ঘোষণা আসলে প্রতিটি যুগের মানুষকে এই বার্তা দেয় যে মিথ্যা শক্তিশালী হতে পারে, কিন্তু সত্য কখনো তার কাছে মাথা নত করে না; কারণ হুসাইন-সদৃশ কখনো ইয়াজিদ-সদৃশের বাইয়াত করতে পারে না।
আপনার কমেন্ট