মঙ্গলবার ২৩ জুন ২০২৬ - ২২:৩৬
ইনসাফ: মানবিক ও নৈতিক গুণাবলির অন্যতম শ্রেষ্ঠ মূল্যবোধ

ইরানের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও বক্তা হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন নাসের রাফিয়ি বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতকে তাঁর অবাধ্যতার পথে ব্যবহার করে, সে প্রকৃত অর্থে তার প্রতিপালকের সঙ্গে ইনসাফপূর্ণ আচরণ করে না।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: মহররম মাসের অষ্টম রাত উপলক্ষে দেশটির ধর্মীয় নগরী কোমের পবিত্র জামকারান মসজিদে অনুষ্ঠিত শোকসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি আশুরার দিনে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ঐতিহাসিক খুতবার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করেন।

তিনি বলেন, কারবালার প্রান্তরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে সাইয়্যিদুশ শুহাদা ইমাম হুসাইন (আ.) শত্রু বাহিনীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন, যেন তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাড়াহুড়ো না করে; বরং তাঁর বক্তব্য মনোযোগসহকারে শোনে এবং বিবেক ও ন্যায়বোধের আলোকে তা বিচার করে।

তিনি আরও বলেন, ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, যদি তারা ইনসাফের সঙ্গে তাঁর কথা শ্রবণ করে সত্যকে গ্রহণ করে, তবে তারা সৌভাগ্য ও মুক্তির পথ লাভ করবে; আর যদি তা প্রত্যাখ্যান করে, তবে তারা নিজেদের জন্য ভ্রান্ত ও ধ্বংসের পথই বেছে নেবে।

হুজ্জাতুল ইসলাম রাফিয়ি বলেন, সাইয়্যিদুশ শুহাদা (আ.) শত্রুদের অন্তর জাগ্রত করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। কখনো তিনি পবিত্র কুরআনের আয়াত স্মরণ করিয়ে দিতেন, কখনো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী উদ্ধৃত করতেন, আবার কখনো তাদের মানবিক বিবেক ও সহজাত ফিতরতের দিকে আহ্বান জানাতেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, আশুরার প্রান্তরে ইমাম হুসাইন (আ.) শত্রুদের উদ্দেশে এমনকি এ কথাও বলেছিলেন,

إِنْ لَمْ يَكُنْ لَكُمْ دِينٌ وَكُنْتُمْ لَا تَخَافُونَ الْمَعَادَ فَكُونُوا أَحْرَارًا فِي دُنْيَاكُمْ

“যদি তোমাদের কোনো ধর্ম না থাকে এবং পরকালকেও ভয় না করো, তবে অন্তত দুনিয়ার জীবনে স্বাধীন ও মর্যাদাবান মানুষ হও।”

তিনি বলেন, এই আহ্বান মানব ইতিহাসে ন্যায়বোধ, মানবিকতা ও মুক্তচেতনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

ইনসাফের অর্থ ও বাস্তব ধারণা
ইনসাফের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইনসাফ শুধু ন্যায়বিচার নয়; বরং এটি এমন একটি নৈতিক অবস্থান যেখানে মানুষ নিজের জন্য যা ভালোবাসে, অন্যের জন্যও তা ভালোবাসে; আর নিজের জন্য যা অপছন্দ করে, অন্যের জন্যও তা অপছন্দ করে।

তিনি বলেন, পারিবারিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক জীবনে ইনসাফের অনুশীলন দ্বন্দ্ব ও সংঘাত কমিয়ে পারস্পরিক ভালোবাসা ও আস্থা বৃদ্ধি করে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ইসলামী দৃষ্টিতে ইনসাফের মর্যাদা
তিনি বলেন, ইসলামী রেওয়ায়েতে ইনসাফকে কঠিনতম কিন্তু সর্বোত্তম নৈতিক গুণগুলোর অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মানুষের প্রতি সহমর্মিতা (মুওয়াসাত), আল্লাহর স্মরণ এবং ইনসাফ—এই তিনটি গুণকে একসঙ্গে উচ্চ মর্যাদায় বর্ণনা করা হয়েছে।

রেওয়ায়েত অনুযায়ী, ইনসাফ সমাজে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি করে, শত্রুতা কমায় এবং সামগ্রিক শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে।

আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর দৃষ্টিতে ইনসাফের ক্ষেত্রসমূহ
হুজ্জাতুল ইসলাম রাফিয়ি বলেন, হযরত আলী (আ.) তাঁর বিখ্যাত শাসননামা আহদনামা-এ মালিক আশতার-এ ইনসাফকে চারটি প্রধান ক্ষেত্রে বিভক্ত করে ব্যাখ্যা করেছেন:

১. আল্লাহর সঙ্গে ইনসাফ
এর অর্থ হলো, আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতকে পাপ ও অবাধ্যতার পথে ব্যবহার না করা। কারণ প্রত্যেক নিয়ামত মূলত মানুষের হেদায়াত, কল্যাণ ও উন্নতির জন্য প্রদান করা হয়েছে।

২. নিজের সঙ্গে ইনসাফ
নিজের আচরণ, সিদ্ধান্ত ও দায়িত্ব সম্পর্কে সততা বজায় রাখা এবং আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে দূরে থাকা।

৩. মানুষের সঙ্গে ইনসাফ
অন্যের অধিকার সংরক্ষণ করা, ন্যায্য আচরণ করা এবং নিজের জন্য যা চায়, অন্যের জন্যও তা কামনা করা।

৪. পরিবার ও অধীনস্থদের সঙ্গে ইনসাফ
পরিবার, কর্মচারী ও অধীনস্থদের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকা।

তিনি পুনরায় উল্লেখ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতকে তাঁরই অবাধ্যতার পথে ব্যবহার করে, সে আল্লাহর সঙ্গে ইনসাফ করেনি; কারণ আল্লাহ নিয়ামতকে মানুষের কল্যাণ ও উন্নতির জন্য দান করেছেন।

কুফাবাসীদের আচরণ: ইনসাফহীনতার ঐতিহাসিক উদাহরণ
তিনি বলেন, কুফাবাসীদের আচরণ ছিল ইনসাফহীনতার স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। তারা প্রথমে ইমাম হুসাইন (আ.)-কে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধেই অস্ত্র ধারণ করে তাঁকে অবরুদ্ধ করে ফেলে।

আশুরার দিনে ইমাম (আ.) তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন করেছিলেন—তাঁর অপরাধ কী? কেন তাঁকে হত্যা করা হবে? এবং তারা যেন ন্যায়ের সঙ্গে এর উত্তর দেয়।

তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে উমর ইবনে সা’দের বাহিনীতে এমন অনেকেই ছিল, যারা পূর্বে ইমামকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। এটি তাদের দ্বৈতনীতি ও ইনসাফহীনতার প্রমাণ।

হুর ইবনে ইয়াযিদ রিয়াহীর তওবা-পরবর্তী অবস্থান
তিনি বলেন, তওবার পর হুর ইবনে ইয়াযিদ রিয়াহী কুফাবাসীদের সমালোচনা করেন এবং স্মরণ করিয়ে দেন যে, তারাই প্রথমে ইমামকে আমন্ত্রণ জানিয়ে পরে তাঁর বিরোধিতা করেছে। তিনি এই আচরণকে বিশ্বাসঘাতকতা ও ইনসাফের পরিপন্থী বলে আখ্যায়িত করেন।

সিফফিনের যুদ্ধে আমীরুল মুমিনীন (আ.)-এর ইনসাফ
তিনি বলেন, সিফফিনের যুদ্ধে মুয়াবিয়ার বাহিনী যখন ফোরাত নদীর পানি বন্ধ করে দেয়, তখন যুদ্ধের মাধ্যমে পানি পুনরুদ্ধারের পর ইমাম আলী (আ.)-এর বাহিনী প্রতিশোধমূলকভাবে পানি বন্ধ করেনি; বরং শত্রুদের জন্যও পানি ব্যবহার উন্মুক্ত রেখেছিল।

এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামী নৈতিকতায় শত্রুর ক্ষেত্রেও ইনসাফ পরিত্যাজ্য নয়।

কুরআনের নির্দেশ: খিয়ানতকারীর পক্ষে অবস্থান নয়
তিনি কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন:

وَلَا تَكُنْ لِلْخَائِنِينَ خَصِيمًا

“আর তুমি কখনো বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করো না।” (সূরা নিসা: ১০৫)

তিনি ব্যাখ্যা করেন, কুরআন সত্য ও ইনসাফকে জাতি, ধর্ম ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছে।

সমকালীন বাস্তবতা ও নৈতিক দায়িত্ব
তিনি বলেন, নিরীহ মানুষ, শিক্ষার্থী, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা মানবিক ও নৈতিকতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ইতিহাস এসব অন্যায়কে কখনো ক্ষমা করে না; বরং চিরকাল তা নিন্দিত হয়ে থাকে।

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইনসাফের প্রয়োজন
তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিচার, বক্তব্য, লেখালেখি, মিডিয়া এবং এমনকি দোয়ার ক্ষেত্রেও ইনসাফ বজায় রাখা অপরিহার্য। একজন মুমিনের জীবন সর্বক্ষেত্রে ন্যায়নিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া উচিত।

হযরত আলী আকবর (আ.) স্মরণ
মহররমের অষ্টম রাত উপলক্ষে তিনি হযরত আলী আকবর (আ.)-এর স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, আলী আকবর (আ.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সর্বাধিক সাদৃশ্যপূর্ণ ব্যক্তি চরিত্র ও আচার-আচরণের দিক থেকে।

তিনি ছিলেন ঈমানদার, ভদ্র, সাহসী ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর অত্যন্ত প্রিয় সন্তান। আশুরার দিনে তিনি অসীম বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন এবং শেষ পর্যন্ত শাহাদাত বরণ করেন।

তার বিদায়ের হৃদয়বিদারক দৃশ্য ইসলামের ইতিহাসে কারবালার অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha