শনিবার ২৭ জুন ২০২৬ - ১৭:৪৩
আশুরার দিনে উমাইয়াদের উৎসবের অন্তরালের ইতিহাস এবং আশুরার বিকৃতির চাঞ্চল্যকর বর্ণনা

সাইয়্যেদুশ শুহাদা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাত শিয়া মুসলমানদের কাছে ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাবিধুর দিন। কিন্তু বনি উমাইয়া সেই দিনটিকেই উৎসবে পরিণত করেছিল এবং জাল হাদিস রচনা করে একে বরকত ও কল্যাণের দিন হিসেবে প্রচার করেছিল। জিয়ারতে আশুরা এই বংশের বিরুদ্ধে অভিশাপ উচ্চারণের পাশাপাশি ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে বর্তমান পর্যন্ত তাদের মুনাফিকির ধারাকে চিহ্নিত করে এবং দেখায়, কীভাবে আহলুল বাইত (আ.)-এর শত্রুরা আশুরার চেহারা বিকৃত করে নিজেদের অপরাধকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা

পবিত্র মহররম মাস উপলক্ষে হাওজা নিউজ এজেন্সি ‘জিয়ারতে আশুরা’ শীর্ষক একটি বিশেষ ধারাবাহিক প্রকাশ করছে। এতে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন জাওয়াদ মুহাদ্দিসীর উপস্থিতিতে জিয়ারতে আশুরার ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হচ্ছে, যাতে আহলুল বাইত (আ.)-এর জ্ঞান ও শিক্ষার দিকে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। এই বিশেষ ধারাবাহিকটি সম্মানিত পাঠকবৃন্দ এবং সাইয়্যিদুশ শুহাদার প্রতি অনুগত শোকপালনকারীদের প্রতি নিবেদন করা হলো:

জিয়ারতে আশুরার বিভিন্ন অংশ নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে আলোচনা করেছি। এখন আমরা নিম্নোক্ত অংশে এসে পৌঁছেছি—

 اللهمَّ إنَّ هذا یومٌ تبرَّکتَ بهِ بنو أُمَیَّةَ و ابنِ آکلهِ الأکبادِ العینِ بنِ اللعینِ علی لسانِکَ و لسانِ نبیِّکَ صلّی الله علیه و آلهِ فی کلِّ موطنٍ و موقفٍ وقف فیه نبیُّکَ...

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আশুরা এবং মহররমের দিনগুলো আমাদের কাছে শোক, বেদনা এবং হৃদয়বিদারক স্মৃতির দিন। এটি এমন এক বিপর্যয়, যার মর্যাদা ও গুরুত্ব আসমান ও জমিন উভয়ের কাছেই অত্যন্ত মহান। কিন্তু এই জিয়ারতের অংশে বলা হয়েছে যে, বনি উমাইয়া আশুরার দিনটিকে একটি বরকতময় দিন মনে করত এবং এ দিনের মাধ্যমে বরকত লাভের চেষ্টা করত।

বনি উমাইয়া এবং বিশেষ করে মুয়াবিয়া—যিনি “ইবনু আকালাতিল আকবাদ” বা “জিগরভক্ষিণী নারীর পুত্র” নামে পরিচিত—তাদেরকে এমন ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের ওপর আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা.)-এর পক্ষ থেকে অভিশাপ উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু এই অভিশাপ কোথায় উল্লেখ করা হয়েছে?

পবিত্র কুরআনে “শাজারাতুল মালঊনা” বা “অভিশপ্ত বৃক্ষ”-এর উল্লেখ রয়েছে এবং শিয়া বর্ণনা অনুযায়ী, এর দ্বারা বনি উমাইয়া বংশকেই বোঝানো হয়েছে—একটি কুখ্যাত বংশ, যাদের ইসলাম গ্রহণ ছিল বাহ্যিক ও কৃত্রিম এবং যারা রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর আহলুল বাইতের অন্যতম প্রধান শত্রু ও বিরোধী ছিল। যদিও অষ্টম হিজরিতে আবু সুফিয়ান, মুয়াবিয়া এবং তাদের অনুগামীরা প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তবুও তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম সমাজের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে প্রবেশ করে নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা।

আশুরাকে আনন্দ-উৎসবের দিনে পরিণত করার ঐতিহাসিক উদাহরণ
এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করার জন্য ইতিহাসের কয়েকটি ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবি সাহল ইবনে সা'দ বলেন— “আমি যখন শামে প্রবেশ করলাম, তখন দেখলাম মানুষ তাদের চারপাশে সুন্দর পর্দা ও রেশমি কাপড় ঝুলিয়ে রেখেছে এবং আনন্দ-উল্লাসে মেতে আছে। তারা একে অপরকে শুভ সংবাদ দিচ্ছে এবং নারীরা দফ বাজাচ্ছে ও নৃত্য করছে। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করলাম—তোমাদের কি এমন কোনো ঈদ এসেছে, যার কথা আমরা জানি না? তারা বলল—এই আনন্দ ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পবিত্র শির শামে আগমনের উপলক্ষে; কারণ তাঁকে হত্যা করা হয়েছে এবং তাঁর পবিত্র মস্তক ইরাক থেকে শামে আনা হয়েছে।”

এছাড়া আবু রাইহান আল-বিরুনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আসারুল বাকিয়া’-তে উল্লেখ করেছেন যে, উমাইয়ারা আশুরার দিনে নতুন পোশাক পরত, নিজেদের সাজাত, সুরমা ব্যবহার করত এবং দিনটিকে ঈদের মতো উদযাপন করত। তারা এদিন ভোজের আয়োজন করত এবং মিষ্টি বিতরণ করত।

এছাড়াও ওয়ালায়াতের পথে শহীদ, ‘ইলমে মানায়া ও বালায়া’-এর অধিকারী এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অবগত মাইসাম তাম্মারের একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে—তিনি আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.) অথবা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের আলোকে বলেছিলেন— “আল্লাহর শপথ! এই উম্মত তাদের নবীর সন্তানকে মহররমের দশম দিনে হত্যা করবে এবং আল্লাহর শত্রুরা এই দিনটিকে বরকতের দিন হিসেবে গ্রহণ করবে। আর এটি এমন একটি বিষয়, যা আল্লাহর জ্ঞানে পূর্ব থেকেই নির্ধারিত রয়েছে।”

মাইসাম তাম্মারের উত্তর: আশুরার চেহারা পরিবর্তনের জন্য হাদিস জালিয়াতি
শেষে প্রশ্ন ওঠে—রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দৌহিত্র এবং তাঁর প্রিয় সন্তান ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের দিন কীভাবে বরকত ও আনন্দের দিনে পরিণত হতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তরে মাইসাম তাম্মার বলেন— “তারা জাল হাদিস তৈরি করবে এবং প্রচার করবে যে, আশুরার দিনই তাওবা কবুল হয়েছিল, ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, নূহ (আ.)-এর প্লাবনের সমাপ্তি ঘটেছিল, নূহ (আ.)-এর নৌকা স্থির হয়েছিল এবং মুসা (আ.)-এর জন্য সমুদ্র বিদীর্ণ হয়েছিল। এসব মনগড়া বর্ণনার মাধ্যমে তারা সাধারণ, সরল এবং সহজ-সরল মানুষদের প্রতারিত করবে—যারা তাদের ধর্মীয় জ্ঞান আহলুল বাইতের পরিবর্তে বনি উমাইয়ার প্রচারণা থেকে গ্রহণ করবে। এভাবেই তারা আশুরাকে নিজেদের জন্য কল্যাণ, আনন্দ ও বরকতের দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করবে।”

এই বর্ণনাটি ‘ইলালুশ শারায়ে’ গ্রন্থেও উদ্ধৃত হয়েছে।

আবদুল্লাহ ইবনে হানি, যিনি হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ সাকাফি—সেই রক্তপিপাসু জল্লাদের—ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন ছিলেন, তিনি বলেন— “আমি একবার আমার গোত্রের গৌরব ও মর্যাদার কথা হাজ্জাজের সামনে উল্লেখ করছিলাম। তখন সে বলল—আমাদের গোত্রে এমন নারীরাও ছিল, যারা মানত করেছিল যে, যদি হুসাইন (আ.) নিহত হন, তাহলে তারা প্রত্যেকে দশটি উট জবাই করবে। তারা সত্যিই তা করেছিল। এমনকি কেউ কেউ মানত করেছিল যে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর তারা একটি মসজিদ নির্মাণ করবে।”

আমরা আশুরাকে শোক, বেদনা এবং মাতমের দিন হিসেবে বিবেচনা করি এবং এমনকি এ দিনে রোজা রাখাকেও মাকরুহ বলে গণ্য করি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা এখনও সেই পথের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। বর্তমান সময়েও কিছু আরব দেশে আশুরার দিনকে বিবাহ-অনুষ্ঠানের জন্য নির্ধারণ করা হয়; সেখানে শুভেচ্ছা কার্ড মুদ্রণ করা হয়, মানুষ পরস্পরকে পাঠায় এবং আনন্দ-উৎসব উদযাপন করে।

জিয়ারতে আশুরায় বনি উমাইয়ার নেতাদের বিরুদ্ধে অভিশাপ
এই অংশে বলা হয়েছে— “হে আল্লাহ! আজ সেই দিন, যেদিন বনি উমাইয়া একে বরকতময় দিন বলে মনে করেছিল; সেই বংশ, যাদের কর্মকাণ্ড তোমার এবং তোমার রাসূলের ভাষায় সর্বত্র ও সর্বকালে অভিশপ্ত হয়েছে।”

এই ‘অভিশপ্ত বৃক্ষ’ বা ‘অভিশপ্ত বংশ’-এর বহু শাখা-প্রশাখা রয়েছে এবং তাদের কার্যক্রম ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে অব্যাহত থেকেছে। যেহেতু এই ‘অভিশপ্ত বৃক্ষ’-এর শাখা-প্রশাখা বহু বিস্তৃত এবং তাদের কর্মপদ্ধতি এখনও অব্যাহত রয়েছে, তাই জিয়ারতে তাদের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে—

اَللّهُمَّ الْعَنْ اَباسُفْیانَ وَ مُعاوِیَةَ وَ یَزیدَ بْنَ مُعاوِیَةَ عَلَیْهِمْ مِنْکَ اللَّعْنَةُ اَبَدَ الابِدینَ

অর্থাৎ— “হে আল্লাহ! আবু সুফিয়ান, মুয়াবিয়া এবং ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার ওপর তোমার চিরস্থায়ী ও অনন্ত অভিশাপ বর্ষিত হোক।”

এরপর বলা হয়েছে—

وَ هذا یَوْمٌ فَرِحَتْ بِهِ آلُ زِیادٍ و آلُ مَرْوانَ بِقَتْلِ الْحُسَیْنِ


অর্থাৎ— “এটি সেই দিন, যেদিন আলে জিয়াদ এবং আলে মারওয়ান হুসাইন (আ.)-এর হত্যাকাণ্ডে আনন্দ প্রকাশ করেছিল।”

এরপর দোয়া করা হয়েছে—

اَللّهُمَّ فَضاعِفْ عَلَیْهِمُ اللَّعْنَ مِنْکَ وَ الْعَذابَ الاَْلیمَ

অর্থাৎ— “হে আল্লাহ! তাদের ওপর তোমার অভিশাপ এবং শাস্তিকে বহুগুণ বৃদ্ধি করে দাও।”

এরপর বলা হয়েছে— “হে আল্লাহ! আজকের এই দিন এবং এই অবস্থানে আমি আহলুল বাইতের একজন শোকাহত অনুসারী হিসেবে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর একজন জিয়ারতকারী হিসেবে এবং তাঁর ও তাঁর আহলুল বাইতের পথে চলার প্রত্যয়ী অনুসারী হিসেবে তোমার নৈকট্য কামনা করছি। আমি তোমার নৈকট্য লাভ করতে চাই তাদের শত্রুদের থেকে সম্পর্কচ্ছেদ এবং তোমার নবী ও তাঁর আহলুল বাইতের প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসার মাধ্যমে।”

তাওয়াল্লা ও তাবাররা: জিয়ারতে আশুরার মূল শিক্ষা
জিয়ারতে আশুরার শুরু থেকে এই অংশ পর্যন্ত তাকালে দেখা যায়, এখানে একটি ধারাবাহিক ও অবিচ্ছিন্ন নীতি বারবার পুনরাবৃত্ত হয়েছে—তাওয়াল্লা এবং তাবাররা।

আমরা আল্লাহর কাছে সেই প্রথম ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিশাপ প্রার্থনা করি, যে রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর পরিবারের ওপর অত্যাচার করেছিল। জিয়ারতে এসেছে—

وَ تابِعَ لَهُ عَلَى ذٰلِكَ


অর্থাৎ— “এবং যারা এ কাজে তাকে অনুসরণ করেছে, তাদের ওপরও (অভিশাপ বর্ষিত হোক)।”

আরও একটি অংশে বলা হয়েছে—

اللهمَّ الْعَنْ الْعِصَابَةَ الَّتی جاهَدَتِ الْحُسَیْنَ، وَ شایَعَتْ، وَ بایَعَتْ، وَ تابَعَتْ عَلٰی قَتْلِهِ

কারবালার ঘটনায় সংঘটিত অপরাধ কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, যারা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল, বর্শা নিক্ষেপ করেছিল, তলোয়ার চালিয়েছিল কিংবা শহীদদের দেহের ওপর ঘোড়া চালিয়েছিল। বরং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, তাদের সঙ্গে বায়আত করেছে অথবা তাদের কার্যকলাপকে সমর্থন করেছে, তারাও এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে বিবেচিত হয়েছে।

জিয়ারতে ওয়ারিসেও তাদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যারা এই ঘটনার কথা জেনেও এতে সন্তুষ্ট ছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, তাদের সবাই নিন্দা ও অভিশাপের উপযুক্ত।

আমরা মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, যেন আহলুল বাইতের প্রতি ভালোবাসা এবং অত্যাচারী ও জালিমদের প্রতি বিরাগ ও শত্রুতার মাধ্যমে তিনি আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে আহলুল বাইতের সান্নিধ্য দান করেন।

এই জিয়ারতের শেষ অংশের ব্যাখ্যা পরবর্তী পর্বে উপস্থাপন করা হবে।

ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha