হাওজা নিউজ এজেন্সি’র সঙ্গে আলোচনায় পবিত্র মহররম মাস উপলক্ষে ইসলামী বিধান ও শোকপালনের আদব-কায়দা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন ইসলামী আইনবিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন ওয়াহিদ পুর।
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
السلام علیک یا اباعبدالله و علی الأرواح التی حلّت بفنائک
গুলু ও অবমূল্যায়ন—আহলে বাইত (আ.)-এর মর্যাদা বর্ণনায় দুটি বিপজ্জনক বিচ্যুতি
আহলে বাইত (আ.)-এর ফজিলত ও মর্যাদা বর্ণনার ক্ষেত্রে গুলু বা অতিরঞ্জন একটি গুরুতর বিচ্যুতি। দুঃখজনকভাবে কখনো কখনো কিছু মজলিসে এমন বক্তব্য উপস্থাপিত হয়, যা ইমামগণের প্রকৃত ও মহান মর্যাদাকে অতিক্রম করে তাঁদেরকে প্রায় ঐশী পর্যায়ের সঙ্গে তুলনা করার দিকে নিয়ে যায়। অথচ ইসলামী আকীদার দৃষ্টিতে এটি সম্পূর্ণরূপে হারাম ও অগ্রহণযোগ্য।
মারজায়ে তাকলিদগণের ফতোয়া অনুযায়ী, যেসব মজলিসে এ ধরনের বিচ্যুতিপূর্ণ বক্তব্য প্রচার করা হয়, সেখানে অংশগ্রহণ করা বৈধ নয়; বরং এ ধরনের প্রবণতার বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, আহলে বাইত (আ.)-এর মর্যাদাকে খাটো করে দেখা বা তাঁদের অবস্থানকে সাধারণ মানুষের পর্যায়ে নামিয়ে আনাও সমানভাবে ভুল ও নিন্দনীয়।
উদাহরণস্বরূপ, হযরত যায়নাব কুবরা (সা.আ.)-এর মতো মহান ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে এমন শব্দ বা উপমা ব্যবহার করা সমীচীন নয়, যা তাঁর মর্যাদা ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি ছিলেন বনু হাশিমের জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান নারী, কারবালার বিপ্লবের অন্যতম বার্তাবাহক এবং আশুরার মহান আদর্শ বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রধান ব্যক্তিত্বদের একজন।
একইভাবে, ইমাম সাজ্জাদ (আ.) এবং অন্যান্য নিষ্পাপ ইমামদের মর্যাদাও যথাযথভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তাঁরা আল্লাহর হুজ্জাত ও তাঁর মনোনীত ওলি; তাই তাঁদের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে অবহেলা কিংবা ভুল উপস্থাপনাও সমানভাবে অগ্রহণযোগ্য।
আহলে বাইত (আ.)-এর মর্যাদা তুলনাহীন ও অনন্য
আল্লাহর অনেক নেক বান্দাই উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন—যেমন সালমান ফারসি (রা.), মিকদাদ (রা.) এবং অন্যান্য মহান ব্যক্তিত্ব। কিন্তু তাঁদের কাউকেই আহলে বাইত (আ.)-এর সঙ্গে তুলনা করা সমীচীন নয়।
একইভাবে, মুসলিম উম্মাহর অসংখ্য শহীদ আমাদের গৌরবের প্রতীক এবং আমরা তাঁদের আত্মত্যাগের কাছে ঋণী। কিন্তু কোনো শহীদকে হযরত আবুল ফযল আল-আব্বাস (আ.) অথবা হযরত আলী আকবর (আ.)-এর সমমর্যাদার বলে আখ্যায়িত করা সঙ্গত নয়। কারণ আহলে বাইত (আ.)-এর অবস্থান স্বতন্ত্র, অনন্য এবং তুলনাহীন।
ইমাম রেজা (আ.)-এর বাণী অনুযায়ী, কারবালায় ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সঙ্গী শহীদদের মর্যাদা এমন যে, পৃথিবীতে তাঁদের সমতুল্য আর কাউকে পাওয়া যাবে না। সুতরাং যেমন গুলু ও অতিরঞ্জন নিন্দনীয়, তেমনি তাঁদের মর্যাদাকে খাটো করাও সমানভাবে অনুচিত।
হুসাইনি মজলিসের মর্যাদা রক্ষায় শোকপাঠের শুদ্ধ পরিবেশনাশৈলী প্রয়োজন
শোকগাথা, নওহা ও মার্সিয়া পাঠের ক্ষেত্রে কেবল বিষয়বস্তুর শুদ্ধতা যথেষ্ট নয়; এর পরিবেশনাশৈলীর প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
শোকপাঠের ধরণ এমন হওয়া উচিত নয়, যা মানুষের মনে বিনোদনমূলক গান বা অনুপযুক্ত সুরের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বরং তা হতে হবে গাম্ভীর্যপূর্ণ, সংযত এবং আহলে বাইত (আ.)-এর মজলিসের মর্যাদার উপযোগী।
ইসলামী পরিভাষায় গিনা বলতে এমন এক ধরনের সুর ও কণ্ঠভঙ্গিকে বোঝায়, যা সাধারণত আনন্দ-বিনোদন ও ভোগ-বিলাসের আসরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মারজায়ে তাকলিদগণ এ ধরনের গায়কীকে হারাম হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
কখনো কখনো এমনও হতে পারে যে, নোহা বা মারসিয়ার বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ ধর্মীয় ও শোকসংক্রান্ত; কিন্তু এর পরিবেশনাশৈলী মানুষের মনে গান-বাজনা বা পাশ্চাত্য বিনোদনমূলক সংস্কৃতির সুর ও আবহের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ ধরনের পদ্ধতি শোকানুষ্ঠানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এবং তা থেকে বিরত থাকা উচিত।
যদি কোনো পরিবেশনা মজলিসে উপস্থিত ব্যক্তিদের মনে গান বা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আবহ সৃষ্টি করে, তবে তা শোকানুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং তা পরিহার করা আবশ্যক।
অধিকাংশ শোকমজলিসই মর্যাদাপূর্ণ ও পবিত্র
এ কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, অধিকাংশ শোকমজলিস অত্যন্ত পবিত্র, পরিশীলিত এবং আহলে বাইত (আ.)-এর মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
এসব আলোচনা কোনোভাবেই প্রচলিত শোকানুষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য নয়; বরং কোথাও যদি সীমিত পরিসরে কোনো বিচ্যুতি দেখা যায়, তাহলে তা সংশোধনের মাধ্যমে মজলিসগুলোকে আরও পরিশুদ্ধ, সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলাই এর উদ্দেশ্য।
কারণ ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মজলিসকে সব ধরনের অনুপযুক্ততা, বিকৃতি ও বিচ্যুতি থেকে মুক্ত রাখা প্রত্যেক অনুরাগী ও অনুসারীর দায়িত্ব।
আপনার কমেন্ট