হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, খোরাসান রাযাভি প্রদেশে বিশ্ব আহলে বাইত (আ.) পরিষদের দায়িত্বশীল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন আলিরেজা ইমানি-মোকাদ্দাম, হাওজা সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আয়াতুল্লাহ আল-উজমা ইমাম খামেনেয়ীর শাহাদাতে শোক প্রকাশ করে বলেন, রেজা শাহ একসময় প্রয়াত আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ জাওয়াদ হোসেইনি খামেনেয়ীকে আজারবাইজানের খামেনেহ অঞ্চল থেকে মাশহাদে নির্বাসিত করেছিলেন।
কিন্তু তিনি কখনোই ভাবতে পারেননি যে এই নির্বাসন খোরাসানের জন্য এক মহান কল্যাণ ও বরকতের উৎস হয়ে উঠবে। শহীদ বিপ্লবী নেতার জন্ম মাশহাদের খসরভি সড়কে, বাবুল জাওয়াদ (আ.)-এর প্রবেশপথের বিপরীতে, এবং তিনি তাঁর অসাধারণ প্রতিভা ও আল্লাহপ্রদত্ত মেধার কারণে অল্প সময়েই বিকশিত হন।
তিনি আরও বলেন, রেজা শাহ যেসব ব্যক্তিকে খোরাসানে নির্বাসিত করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই পরবর্তীতে এই শহীদ-লালিত অঞ্চলের জন্য কল্যাণ ও বরকতের উৎসে পরিণত হন।
ইমানি-মোকাদ্দাম বলেন, পবিত্র কুরআনে দুটি সুস্পষ্ট আয়াতে শহীদদের জীবিত থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এক স্থানে বলা হয়েছে: “আল্লাহর পথে যারা নিহত হয়েছে, তাদের মৃত মনে করো না; বরং তারা তাদের প্রতিপালকের কাছে জীবিত এবং রিযিকপ্রাপ্ত।” অন্যত্র বলা হয়েছে: “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদের মৃত বলো না।” তিনি বলেন, কুরআনের এই জোরালো বক্তব্যের উদ্দেশ্য হলো বোঝানো যে, শহীদের শাহাদাত তাঁর আন্দোলনকে আরও গতিশীল ও স্থায়ী করে তোলে।
তিনি প্রতিরোধ অক্ষের উদাহরণ টেনে বলেন, শায়খ আহমদ ইয়াসিন, আবদুল আজিজ রানতিসি, ইসমাইল হানিয়া এবং ইয়াহইয়া সিনওয়ারের শাহাদাতের পরও প্রতিরোধ আন্দোলন থেমে যায়নি; বরং তা আরও এগিয়ে চলেছে। বিপরীতে, মাহমুদ আব্বাসের মতো আপসকামী নেতৃত্ব, যারা ইসরায়েলি শাসনের সঙ্গে সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছে, তারা ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে কোনো গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।
এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক লেবাননের হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার কথাও উল্লেখ করে বলেন, সাইয়্যেদ আব্বাস মুসাভীর শাহাদাতের পর সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ ৩১ বছর হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব দেন এবং এই সংগঠনকে একটি ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেন। তাঁর এবং সাইয়্যেদ হাশেম সাফিউদ্দীনের শাহাদাতের পর শত্রুরা মনে করেছিল হিজবুল্লাহর সমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু আজ শায়খ নাঈম কাসেম একই পথ দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, আল্লাহর পথে নেতাদের শাহাদাত আন্দোলনের প্রাণশক্তির প্রমাণ। যদিও শহীদ বিপ্লবী নেতার মতো ব্যক্তিত্বের অনুপস্থিতি এক বিশাল ও অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করে, তবে মহান আল্লাহই সর্বোত্তম প্রতিদানদাতা এবং তিনি প্রয়োজনে তার সমতুল্য বা আরও উত্তম বিকল্প দান করেন।
ইমানি-মোকাদ্দাম আরও বলেন, আজ আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা খামেনেয়ী তাঁর শহীদ পিতা ও মহান নেতার পথের যোগ্য উত্তরসূরি হতে পারেন। তিনি বলেন, জানাজা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা শুধু শোক প্রকাশ করতে নয়, বরং তাঁদের শহীদ নেতার রক্তের ন্যায়বিচারের দাবিও বহন করবেন; যেমন কারবালার ঘটনায় ইমাম হুসাইন (আ.)-এর রক্তের প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে লাল পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল।
তিনি বলেন, কুরআনে হযরত ইবরাহিম (আ.)-কে উত্তম আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য আদর্শ। আহলে বাইত (আ.)-কেও মহানবী (সা.) পথপ্রদর্শক নক্ষত্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
খোরাসান রাযাভির বিশ্ব আহলে বাইত (আ.) পরিষদের এই কর্মকর্তা বলেন, ইমাম খোমেনী শহীদ বেহেশতিকে “একটি উম্মাহ” বলে অভিহিত করেছিলেন। শহীদ বিপ্লবী নেতাও শহীদ হাজী কাসেম সোলেইমানী সম্পর্কে বলেছিলেন, “তিনি একটি মাদরাসা বা আদর্শধারা ছিলেন” এবং সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ সম্পর্কে “তিনি একটি পথ” বলে উল্লেখ করেছিলেন।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ ধরনের আদর্শ ও প্রতীক কখনো বিলীন হয় না; বরং ইতিহাসের বুকে তারা জীবন্ত আত্মা হয়ে থাকেন। এমনকি যারা তাঁদের প্রত্যক্ষভাবে দেখেনি, তারাও তাঁদের চিন্তা ও আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়। যেমন, আজকের বহু তরুণ ইমাম খোমেনীকে কখনো দেখেনি, তবুও তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে।
ইমানি-মোকাদ্দাম বলেন, শহীদ বিপ্লবী নেতার জানাজা অনুষ্ঠান প্রতিরোধ ফ্রন্টের শক্তিরই ধারাবাহিকতা। তিনি উল্লেখ করেন, ৩৩ দিনের যুদ্ধে হিজবুল্লাহর বিজয়ের পর সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ আরব বিশ্বের অন্যতম নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এবং গর্বের সঙ্গে বিপ্লবী নেতার হাত চুম্বন করে তাঁর নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছিলেন। আজও শহীদ নেতার শেষকৃত্যানুষ্ঠান প্রতিরোধ ফ্রন্টের ঐক্য ও শক্তির প্রতীক হয়ে উঠবে।
তিনি লেবাননে সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর শেষকৃত্যানুষ্ঠানের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান জনসমাবেশের ওপর দিয়ে উড়ে গেলেও মানুষ মুষ্টিবদ্ধ হাতে “আমেরিকার মৃত্যু” এবং “ইসরায়েলের মৃত্যু” স্লোগান দিয়েছিল এবং এক ধাপও পিছিয়ে যায়নি।
তিনি বলেন, শহীদ বিপ্লবী নেতার জাঁকজমকপূর্ণ জানাজা অনুষ্ঠান প্রতিরোধের সেই সফট পাওয়ারেরই ধারাবাহিকতা এবং এটি প্রমাণ করবে যে, আল্লাহর পথে নেতাদের শাহাদাত কোনো আন্দোলনকে থামিয়ে দেয় না; বরং আরও সুদৃঢ় করে।
সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, শহীদ নেতার জানাজা অনুষ্ঠানে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ শত্রুদের কাছে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেবে যে, প্রতিরোধ ফ্রন্ট এখনও জীবন্ত, ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী এবং শহীদদের রক্তই এই পথচলার ধারাবাহিকতার নিশ্চয়তা।
শেষে ইমানি-মোকাদ্দাম বলেন, লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক এবং প্রতিরোধ ফ্রন্টের অন্যান্য দেশের জনগণ তাঁদের উপস্থিতির মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, বিপ্লবী নেতার শাহাদাত দুর্বলতার নয়, বরং ইসলামী উম্মাহর ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করার কারণ। তাঁর জাঁকজমকপূর্ণ জানাজা অনুষ্ঠানও সেই সংহতি ও ইসলামী বিপ্লবের ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন।
আপনার কমেন্ট