সোমবার ৬ জুলাই ২০২৬ - ১০:১২
শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী কেন সবসময় ঘরোয়া রওজা মাহফিলের ওপর গুরুত্ব দিতেন?

ঘরোয়া রওজা ও মজলিসকে কেবল ছোট পরিসরের শোকানুষ্ঠান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর রয়েছে সুদীর্ঘ ঐতিহ্য, যা একটি ঘরকে আহলুল বাইত (আ.)-এর স্মরণে সঞ্জীবিত ও বরকতময় করে তোলে। শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.)ও নিজ বাসভবনে নিয়মিত ছোট পরিসরের রওজা মাহফিলের আয়োজন করতেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: পবিত্র মহররম মাস উপলক্ষে শোকানুষ্ঠানের বিধান এবং সাইয়্যিদুশ শুহাদা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শোক পালনের আদব নিয়ে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন ওয়াহিদ পুরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক ধারাবাহিক সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিচে তুলে ধরা হলো:

بسم الله الرحمن الرحيم

السلام على الحسين، وعلى علي بن الحسين، وعلى أولاد الحسين، وعلى أصحاب الحسين

সালাম বর্ষিত হোক ইমাম হুসাইন (আ.)-এর প্রতি, আলী ইবনে হুসাইন (আ.)-এর প্রতি, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সন্তানদের প্রতি এবং তাঁর সাহাবিদের প্রতি।

আপনাদের সবাইকে জানাই সালাম, শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা। আশা করি, এ আলোচনা ইনশাআল্লাহ আপনাদের জন্য উপকারী ও ফলপ্রসূ হবে।

ইমাম সাইয়্যিদুশ শুহাদা হুসাইন (আ.)-এর শোকানুষ্ঠান প্রসঙ্গে আমাদের উচিত সব ধরনের পবিত্র, বৈধ ও কলুষমুক্ত উপায় ও মাধ্যমকে কাজে লাগানো। অর্থাৎ, এ উপলক্ষের প্রতিটি সুযোগ থেকে সর্বোচ্চ উপকার গ্রহণ করা। এসব মাধ্যমের অন্যতম হলো ঘরোয়া রওজা মাহফিল।

আমরা যেন এমনটি মনে না করি যে শোকানুষ্ঠান অবশ্যই বিশাল জনসমাগমেই হতে হবে। কখনো কখনো হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়—এটি অবশ্যই অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং আল্লাহর এক মহান নিয়ামত। বিশেষ করে যখন আমাদের তরুণরা এতে অংশগ্রহণ করে এবং আহলুল বাইত (আ.)-এর প্রতি আকৃষ্ট হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন শহরে এ ধরনের বৃহৎ শোকানুষ্ঠান আরও ব্যাপক হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে আমরা ছোট পরিসরের শোকসভাগুলোর গুরুত্ব ভুলে যাব।

সবচেয়ে ছোট পরিসরের সমাবেশ হতে পারে আমাদের নিজের ঘর। অবশ্য মসজিদও রয়েছে। অতীতকাল থেকেই মসজিদে জামাআতের নামাজের পাশাপাশি কুরআনের তাফসির, শরিয়তের বিধান শিক্ষা, ইসলামী জ্ঞানচর্চা, ওয়াজ-নসিহত এবং মুহাররম ও সফর মাসে রওজা ও শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এটি তুলনামূলক ছোট পরিসরের একটি পরিবেশ। তবে এর চেয়েও ছোট ও অন্তরঙ্গ হলো ঘরোয়া রওজা মাহফিল, যার ইতিহাস বহু প্রাচীন।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুমিন ও শিয়ারা নিজেদের ঘরে রওজা ও মজলিস আয়োজন করে আসছেন এবং আজও এ ঐতিহ্য অব্যাহত রয়েছে। কেউ মাসিক, কেউ বার্ষিক, আবার কারও কারও সাপ্তাহিক রওজা মাহফিল ছিল। অর্থাৎ, প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট একটি দিনে তাঁরা রওজার আয়োজন করতেন। সেখানে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি প্রতিবেশী, বন্ধু এবং কখনো কখনো আত্মীয়স্বজনও অংশগ্রহণ করতেন।

*ঘরোয়া রওজা মাহফিলের উপকারিতা কী?*
এর অন্যতম বড় উপকার হলো—যে পরিবেশে আহলুল বাইত (আ.)-এর স্মরণ করা হয়, সে পরিবেশ তাঁদের স্মরণে সুরভিত হয়ে ওঠে। ফলে যে ঘরে তাঁদের স্মরণ করা হয়, সেই ঘর আর যে ঘরে কখনো তাঁদের স্মরণ করা হয় না—উভয়ের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য সৃষ্টি হয়।

উদাহরণস্বরূপ, আমাদের ঘরে কুরআন তিলাওয়াত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—

> نوّروا بيوتكم بتلاوة القرآن.

তোমরা কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে নিজেদের ঘরকে আলোকিত করো।

এ আলো বাহ্যিক আলোর মতো নয়; এটি এক আধ্যাত্মিক নূর, যা ঘরের পরিবেশকে বদলে দেয়। এমন ঘরে বসবাস ও জীবনযাপন সম্পূর্ণ ভিন্ন অনুভূতি সৃষ্টি করে এবং নিঃসন্দেহে বহু বরকত বয়ে আনে।

এ বিষয়ে আহলুল বাইত (আ.)-এর পক্ষ থেকেও আমাদের জন্য নির্দেশনা রয়েছে। ইমাম (আ.) জিজ্ঞেস করেছেন—

> أتجلسون وتتحدثون؟

তোমরা কি একত্রে বসো এবং আমাদের সম্পর্কে আলোচনা করো?

এরপর তিনি বলেছেন—
رحم الله من أحيا أمرنا.
আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন, যে আমাদের আদর্শ ও শিক্ষাকে জীবন্ত রাখে।

এটি ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর দোয়া। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি তাঁদের আদর্শ ও শিক্ষাকে জীবন্ত রাখবে, সে আল্লাহর রহমতের অধিকারী হবে।

ঘরোয়া রওজা মাহফিলের অসংখ্য আধ্যাত্মিক ও সামাজিক প্রভাব রয়েছে। আমাদের বরেণ্য আলেমরাও সবসময় এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের শহীদ নেতার রূহের ওপর তাঁর রহমত ও সন্তুষ্টি বর্ষণ করুন।

তিনি শুধু বক্তব্যেই ঘরোয়া রওজা ও মজলিসের গুরুত্ব তুলে ধরতেন না; বরং নিজ জীবনেও এর বাস্তব অনুশীলন করতেন। অনেকেই জানতেন না যে তিনি নিজের বাসভবনের অভ্যন্তরে নিয়মিত ছোট পরিসরে রওজা মাহফিল আয়োজন করতেন। সেখানে সাত-আটজনের একটি ছোট সমাবেশ হতো। একজন খতিব এসে মিম্বারে বক্তব্য দিতেন এবং রওজা পাঠ করতেন। তিনি নিজেও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সেই মাহফিলে অংশগ্রহণ করতেন এবং নিজের আহ্বানকে বাস্তবে রূপ দিতেন।

আরও বলা হয়, 'রওজা' শব্দটি 'রওযাহ' অর্থাৎ 'উদ্যান' বা 'বাগান' শব্দ থেকে উদ্ভূত। অর্থাৎ, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর রওজা মাহফিল এক আধ্যাত্মিক ফুলেল উদ্যান, জান্নাতের বাগানসম। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এর বরকত থেকে উপকৃত হওয়ার তাওফিক দান করুন।

والسلام عليكم ورحمة الله

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha