হাওজা নিউজ এজেন্সি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শহীদ ইমাম খামেনেয়ী (রহ.) দেশে ‘সফটওয়্যার আন্দোলন’ (جنبش نرمافزاری) বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কেবল একটি কারিগরি বিষয় ছিল না; বরং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিই ছিল জাতীয় শক্তির মেরুদণ্ড এবং প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
ড. ইয়াজদানি বলেন, শহীদ নেতার নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল জ্ঞানকে জাতীয় শক্তিতে রূপান্তরের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। বিজ্ঞান উৎপাদন এবং ‘সফটওয়্যার আন্দোলন’-কেন্দ্রিক নীতিমালার মাধ্যমে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, এই সময়ে ইরানকে জ্ঞানের ভোক্তা থেকে জ্ঞান উৎপাদনকারী রাষ্ট্রে পরিণত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে ন্যানোপ্রযুক্তি, পারমাণবিক প্রযুক্তি এবং স্টেম সেল গবেষণার মতো অত্যাধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা হয়, যাতে দেশের অগ্রগতির জন্য বিদেশি শক্তির অনুমতি বা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হতে না হয়।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, শহীদ ইমাম খামেনেয়ী (রহ.) দেশের বিজ্ঞানী, গবেষক ও মেধাবীদের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ও বৈজ্ঞানিক অঙ্গনের সঙ্গে তাঁর ধারাবাহিক সংযোগের ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার অগ্রাধিকার তালিকায় বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ স্থান লাভ করে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় সমালোচনা থাকলেও জাতীয় মেধাশক্তির বিকাশে তাঁর অব্যাহত সমর্থনের বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, গত এক দশকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর শহীদ নেতার বিশেষ জোরের লক্ষ্য ছিল তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতিতে উত্তরণ। এ লক্ষ্যে জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তায় প্রণীত আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এর ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ফলে দেশে ৯ হাজারেরও বেশি জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
ড. ইয়াজদানি বলেন, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে শহীদ নেতা অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাঁর মতে, নিরাপত্তা কেবল পণ্য মজুদ করে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের নিজস্ব উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্যেই প্রকৃত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিহিত।
তিনি আরও বলেন, গত কয়েক দশকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে ইরানের প্রতিরক্ষা শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং অঞ্চলে মিত্র শক্তিগুলোর প্রতি সমর্থনের মাধ্যমে এমন এক প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠেছে, যা ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সামরিক আগ্রাসনের মূল্য শত্রুদের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল করে তুলেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়েছে, যার কিছু দৃষ্টান্ত সাম্প্রতিক ১২ দিনের আরোপিত যুদ্ধ এবং ‘রমজান যুদ্ধ’-এ দেখা গেছে।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য স্থিতিস্থাপক অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়েও শহীদ নেতা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর প্রস্তাবিত ‘প্রতিরোধী অর্থনীতি’র মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা নিষেধাজ্ঞা ও বিদেশি চাপের মুখেও ভেঙে পড়বে না। দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্ঞানভিত্তিক শিল্পের প্রসার এবং তেলের পরিবর্তে অ-তেল রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।
ড. ইয়াজদানি আরও বলেন, শহীদ ইমাম খামেনেয়ী জাতীয়-ইসলামী পরিচয়ের পুনর্জাগরণের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তিনি পশ্চিমা জীবনধারার অন্ধ অনুসরণের পরিবর্তে দেশীয় ও ধর্মীয় মূল্যবোধে প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানান। এর লক্ষ্য ছিল এমন একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি গড়ে তোলা, যা উন্নয়নের মডেল পশ্চিম থেকে নয়, বরং নিজেদের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় শিকড় থেকে গ্রহণ করবে।
তিনি বলেন, শহীদ ইমাম খামেনেয়ী (রহ.)’র দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্ব জাতীয় আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে— এ বাস্তবতা বন্ধু ও শত্রু উভয়েই স্বীকার করে। তাই এ অর্জনের বিভিন্ন দিক বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে গভীরভাবে বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সাক্ষাৎকারের শেষাংশে ড. ইয়াজদানি বলেন, সংক্ষেপে এই সময়কালকে যদি এক বাক্যে তুলে ধরতে হয়, তবে এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো— “বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে স্বাধীন ও শক্তিশালী শক্তি হিসেবে ইরানের উত্থান।” তাঁর মতে, এই শাসনদর্শন দেখিয়েছে যে, পশ্চিম-নিয়ন্ত্রিত বৈশ্বিক ব্যবস্থায় একীভূত না হয়েও একটি দেশ উন্নত প্রযুক্তি অর্জন, নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং স্বাধীন উন্নয়নের পথ নির্মাণ করতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তরুণ প্রজন্ম, বিজ্ঞানী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এ পথ দৃঢ়তার সঙ্গে অব্যাহত রাখবেন, যাতে দেশ তার নির্ধারিত জাতীয় লক্ষ্যসমূহ অর্জনে সক্ষম হয়।
আপনার কমেন্ট