হাওজা নিউজ এজেন্সি: বুধবার (৮ জুলাই, ২০২৬) অনুষ্ঠিত জানাজার অনুষ্ঠানে ইরাকের বিভিন্ন গোত্র, জাতিগোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তাঁরা ইসলামী বিপ্লবের প্রয়াত নেতা এবং তাঁর শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
শোকাহত জনতা পতাকা হাতে ধর্মীয় ও মহাকাব্যিক স্লোগান দিতে দিতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তাঁরা প্রতিরোধের পথ, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য এবং প্রতিরোধ অক্ষের প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। অশ্রু, দোয়া ও আবেগে পরিপূর্ণ পরিবেশে উপস্থিত অনেকেই বলেন, এই জানাজায় অংশগ্রহণ তাঁদের জন্য ইসলাম, মারজাইয়্যাত এবং প্রতিরোধের আদর্শের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্নবায়নের প্রতীক।
পর্যবেক্ষকদের মতে, নাজাফে এই নজিরবিহীন জনসমাগম ইরাকি জনগণ, শিয়া মারজাইয়্যাত, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এবং প্রতিরোধ ফ্রন্টের মধ্যকার গভীর ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রতীক। অভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস, যৌথ ইতিহাস এবং অভিন্ন আদর্শের ভিত্তিতেই এই বন্ধন গড়ে উঠেছে।
অংশগ্রহণকারীরা জোর দিয়ে বলেন, এই বিশাল জনসমাগম একটি সুস্পষ্ট বার্তা বহন করছে— প্রতিরোধ ফ্রন্ট এখনো ব্যাপক জনসমর্থন উপভোগ করছে এবং এর বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকি বা চাপ মুসলিম জাতিগুলোর ঐক্য ও অবিচল অবস্থানের মুখোমুখি হবে।

সরকারি অভ্যর্থনা
বুধবার ভোররাতেই বিমানবন্দরে উচ্চপদস্থ ইরাকি ও ইরানি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে শহীদ নেতার মরদেহকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সূচনা হয়।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী ফালিহ আল-জায়েদি নাজাফ প্রদেশে পৌঁছে শহীদ নেতার মরদেহ গ্রহণের সরকারি অনুষ্ঠানে অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক বিবৃতিতে তাঁকে “সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ” হিসেবে উল্লেখ করে।
ইরাকে জানাজা আয়োজনবিষয়ক সর্বোচ্চ কমিটির মুখপাত্র মেজর জেনারেল সা'দ মান নাজাফের গভর্নর ইউসুফ কানাওয়ির সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানান, নাজাফ ও কারবালায় জানাজার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, এ অনুষ্ঠান কভার করতে তিন হাজারেরও বেশি সাংবাদিক উপস্থিত রয়েছেন।
কমিটির মুখপাত্রের তথ্য অনুযায়ী, শুধু নাজাফেই প্রায় ৩৮ লাখ শোকাহত মানুষ শহীদ নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে সমবেত হন। আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুহাম্মদ তাকী হাকিমের ইমামতিতে জানাজার নামাজ আদায় এবং ইমাম আলী (আ.)-এর পবিত্র রওজাকে কেন্দ্র করে প্রতীকী তাওয়াফের পর শহীদ নেতার মরদেহ পবিত্র নগরী কারবালার উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়।
কারবালায় ঐতিহাসিক অভ্যর্থনা
স্থানীয় সময় বিকেল প্রায় ৫টায় শহীদ ইমামের মরদেহ কারবালায় পৌঁছায়। কর্মকর্তাদের অনুমান অনুযায়ী, সেখানে উপস্থিত জনতার সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। বিপুল জনসমাগমের কারণে মরদেহবাহী যানটি অত্যন্ত ধীরগতিতে দুই পবিত্র রওজার মধ্যবর্তী এলাকা বাইনুল হারামাইন-এর দিকে অগ্রসর হয়।
লাখো শোকাহত মানুষ পবিত্র এ প্রাঙ্গণে মরদেহ গ্রহণের অপেক্ষায় সমবেত ছিলেন। এ সময় আয়োজকেরা শহীদ নেতার নিজের কণ্ঠে পাঠ করা “লাব্বাইক ইয়া হুসাইন” এবং “আস-সালামু আলাইকা, ইয়া আবা আবদিল্লাহ” সম্প্রচার করেন। উপস্থিত জনতা সমস্বরে সেই ধ্বনিতে কণ্ঠ মিলিয়ে শোক, ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রকাশ ঘটান।
শোকযাত্রা চলাকালে কারবালার আকাশ মুখরিত হয়ে ওঠে “আমেরিকা ধ্বংস হোক” এবং “ইসরায়েলের ধ্বংস হোক” স্লোগানে। শোকাহত জনতা এভাবেই তাঁদের শহীদ নেতাকে শেষ বিদায় জানান।
শত্রুর উদ্দেশে বার্তা
লাখো মানুষের এই মহাকাব্যিক উপস্থিতি এমন এক বাস্তবতা, যা ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠী তাদের সব ধরনের উপায়-উপকরণ থাকা সত্ত্বেও উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই কোটি মানুষের উপস্থিতিকে কেবল একটি জানাজার আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নয়; বরং মুসলিম উম্মাহর অব্যাহত ঐক্য এবং প্রতিরোধ ফ্রন্টের শক্তিমত্তার এক সুস্পষ্ট ঘোষণা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ উপস্থিতি আরও প্রমাণ করে যে, অঞ্চলের জাতিগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির লক্ষ্যে শত্রুপক্ষের সব পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও মুসলিম জাতিগুলোর সংহতি ও অবিচল অবস্থানের মুখে তা ব্যর্থই হবে।
শেষ বিদায়
কারবালায় জানাজার শোভাযাত্রা বিপুল জনসমাগমের কারণে চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে। শোকাহত মানুষের ঢল শোভাযাত্রার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে মন্থর করে দেয়।

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পবিত্র রওজার প্রশাসন ঘোষণা দেয়, শহীদ নেতার কফিন পবিত্র রওজার পতাকায় আবৃত করা হবে।
বাইনুল হারামাইনে পৌঁছানোর পর শহীদ নেতার মরদেহ হযরত আব্বাস (আ.)-এর পবিত্র রওজায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হযরত আব্বাস (আ.)-এর পবিত্র রওজার তত্ত্বাবধায়ক শাইখ আহমদ আল-সাফি উম্মাহর শহীদ নেতার জানাজার নামাজে ইমামতি করেন।
আপনার কমেন্ট